হরতালে এই প্রথম ‘সাউন্ড স্টিমুলেটর’ মরণাস্ত্র ব্যবহার করলো পুলিশ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে বাম দলগুলোর হরতালে আন্দোলনকারীদের দমাতে মরণাস্ত্র ব্যবহার করলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

সাউন্ড স্টিমুলেটর নামের এ অস্ত্রটি দেশে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হলো। প্রবল শব্দ সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের সমস্যা সৃষ্টি করাই এ যন্ত্রের কাজ। তবে চিকিৎসকরা একে মরণাস্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন।

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জিএম জিলানী শুভ অভিযোগ করে বলেন, শাহবাগে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করতে চাইলে পুলিশ তীব্র শব্দ সৃষ্টি করে আমাদের আক্রমণ করে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন রুখে দিতেই পুলিশ এই নতুন অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে। অথচ এই তীব্র শব্দ তৈরি করা পরিবেশ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, শব্দের কারণে অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এ বিষয়ে ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. সাজেদুল হক রুবেল জানান, শাহবাগ এলাকায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই এসব এলাকার বাইরে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ধরা হয়। সেখানে এতো বিকট শব্দ সৃষ্টি আইনের লঙ্ঘন।

তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে নীরব এলাকার জন্য শব্দসীমা ৪৫ ডেসিবেল, শব্দ দূষণ রোধ নীতিমালা অনুসারে সর্বোচ্চ শব্দসীমা ৫০ ডেসিবেল। এখানে যে মাত্রা ছিল তা ১০০ ডেসিবেলেরও বেশি বলে মনে হয়েছে। এতে হার্ট অ্যাটাক বা উচ্চ রক্তচাপে মৃত্যুর সম্ভাবনাও থাকে।

তবে এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা জোনের সহকারী কমিশনার এহসানুল ফেরদৌস জানান, এটা প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শব্দ সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলাকারীদের সহজেই ছত্রভঙ্গ করে দেয়া যায়।

তিনি বলেন, টিয়ার গ্যাস ছুড়লে সাধারণ মানুষের সমস্যা হয়। সেদিক দিয়ে এটি ভালো। যন্ত্রটি যেদিকে তাক করে দেয়া হবে সেদিকেই শব্দ বেশি হবে। অন্যদিকে তেমন কোনো সমস্যা হয় না।

২৩ নভেম্বর বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন এ দাম কার্যকর হবে ১ ডিসেম্বর থেকে।

বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল চলছে
ঢাকা: বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার ডাকা হরতাল ৬টা থেকে শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ডাকা এ হরতালে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে পাঁচ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দলটি।

বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে স্বাধীনতা ফোরাম আয়োজিত মানববন্ধনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ ঘোষণা দেন।

এর আগে গত ২৩ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সভায় এ হরতালের ডাক দেয় বামপন্থি দলগুলোর জোটটি।

সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হবে বলে চন্দন সিদ্ধার্থ স্বাক্ষরিত সিপিবির কেন্দ্রীয় দপ্তর বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিলো।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বাসদের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, মানস নন্দী ও ফখরুদ্দিন কবির আতিক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও সমন্বয়ক মনির উদ্দিন পাপ্পু, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বহ্নিশিখা জামালী।

বাম দলগুলোর হরতালের সমর্থনে ৩০ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সারা দেশে অর্ধদিবস হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। এ হরতালে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। এছাড়াও দেশের ৩০ বিশিষ্ট নাগরিক হরতাল সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন।

বুধবার রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাম মোর্চার সমন্বয়ক সাইফুল হক বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতালের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, সরকার এমন এক সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, যখন চাল, পিঁয়াজসহ নিত্য ব্যবহার্য্য পণ্যের দাম নিয়ে মানুষ দিশেহারা। বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির কারণে শ্রমজীবী মেহনতি, স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্দশা, দুর্গতি আরও বেড়ে যাবে।
এরই মধ্যে হরতালের সমর্থনে প্রচারে ঢাকা, চট্টগ্রাম, জয়পুরহাট, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশি বাধা এসেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, এখুণি জনগণের উপর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অত্যাচার-আঘাত প্রতিরোধ করতে না পারলে আগামী দিনগুলোতে জনগণের উপর আরও নতুন নতুন অত্যাচার নেমে আসবে।

সাইফুল হক সংবাদ সম্মেলনে বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুটা পর্যন্ত সভা, সমাবেশ, গণসংযোগ, পদযাত্রা ও প্রচার মিছিলের মাধ্যমে হরতাল পালন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

সেই সঙ্গে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাতিলের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হামিদুল হক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

বাম দলের হরতালে বিএনপির সমর্থন
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বামদলগুলোর ডাকা আগামীকালের হরতালে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন থেকে এ ঘোষণা দেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
খালেদা জিয়াকে হয়রানি করার প্রতিবাদে এ কর্মসূচির আয়োজন করে স্বাধীনতা ফোরাম নামের একটি সংগঠন।

রিজভী বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বামদলগুলোর জনস্বার্থের হরতাল যুক্তিযুক্ত। আগামীকাল সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুটা পর্যন্ত এই হরতালে বিএনপি পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এছাড়া গতকাল এ হরতালে সমর্থন দিয়েছে মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, আ স ম আব্দুল রবের জেএসডি।

হরতালে ৩০ বিশিষ্ট নাগরিকের সমর্থন
এদিকে বাম দলের ডাকা বৃহস্পতিবার হরতালে সমর্থন জানিয়েছেন দেশের ৩০ বিশিষ্ট নাগরিক। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তারা এ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

বিবৃতিদাতারা হলেন- ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, কামাল লোহানী, অধ্যাপক এম এম আকাশ, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক আকমল হোসেন, অধ্যাপক শফিকুজ্জামান, অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক রেহনুমা আহম্মেদ, শহীদুল আলম, অধ্যাপক এ এন রাশেদা, ডা. এম আখতারুজ্জামান, অধ্যাপক আবিদুর রেজা, অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন, অধ্যাপক মোসাহিতা সুলতানা, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক নাসিম আক্তার হোসাইন, আবু সাঈদ খান, ড. সাইদ ফেরদৌস, ড. রায়হান রাইন, অধ্যাপক আবু সাইদ, ড. গাজী এমএ জলিল, অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, ড. মীর্জা তাসলিমা, ড. জোবাঈদা নাসরিন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া, ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান, ড. মাহমুদুল আলম শুভ এবং অভিনু কিবরিয়া ইসলাম।

তারা বলেন, বিদ্যুতের দাম নিয়ে গণশুনানিতে এবার প্রমাণিত হয়- সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি, অপচয় পরিহার করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করলে অবশ্যই বিদ্যুতের দাম কমানো যায়। আশা করেছিলাম, বিদ্যুতের দাম না কমানো হলেও এবার অন্তত বাড়ানো হবে না। এই মূল্য বৃদ্ধিতে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হলো। বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব সর্বত্র পড়বে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। এর ওপরে বিদ্যুতের এই মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। তাই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৫ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। যা কার্যকর হবে আগামী ডিসেম্বরে। এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা বৃহস্পতিবারের আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।