ছেলের চোখে মেয়র আনিসুল হক

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: ‘বাবা সবসময় চাইতেন তিনি যখন মেয়র থাকবেন না তখনও মানুষ যেন তাকে মনে রাখে’ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সদ্য প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের ছেলে নাভিদ হক বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে একথা বলেন। বৃহস্পতিবার ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে বলেন, আব্বু এখন তুমি জান্নাত থেকে দেখবে লাখো মানুষ তোমার কথা মনে রেখেছে।

হৃদয়ছোয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে নাভিদ হক লেখেন, আমার বাবা বৃহস্পতিবার লন্ডন সময় চারটা ৩৩ মিনিটে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি উন)। ব্যবসা, সুশীল সমাজের সক্রিয় সদস্য ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হিসেবে বাবার ব্যস্ততার কারণে তার সঙ্গে শৈশবে আমার খুব বেশি স্মৃতি নেই। কিন্তু যখন আমি বড় হয়েছি ততই তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তিনি আমার দিকনির্দেশক, আমার সহযোগী, আমার গুরু, আমার জীবনের পথপ্রদর্শক আলো।

বাবাকে মানুষ অনেক ভালোবাসতো উল্লেখ করে নাভিদ লেখেন, বাবাকে নিয়ে লেখা ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো পড়ে আমার চোখে পানি এসে গেছে।

নাভিদ লেখেন, বাবা যখন ডিএনসিসির মেয়র হলেন তখন আমি ছিলাম তার নির্ভরযোগ্য সহযোগী যার সঙ্গে তিনি তার সব কর্মকাণ্ড, পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা বলতেন। তিনি আমার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবোধ, সততা ও বিনম্রতার সঙ্গে জীবনযাপন শিখিয়ে গেছেন। যারা তার সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিরা যারা তার ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের সঙ্গে তার দরাজ কণ্ঠ, হাসি, জ্ঞান, কবিতা ও স্পর্শ সবসময় থাকবে। যখন মেয়র থাকবেন না তখনও মানুষ যেন তাকে মনে রাখে। আব্বু যখন তুমি জান্নাত থেকে দেখবে লাখো মানুষ তোমার কথা মনে রেখেছে। আমি তোমাকে প্রতিটি দিন অনেক মিস করব, তোমার মত কিংবদন্তিকে আমার বাবা হিসেবে পাওয়ায় আমি অনেক ভাগ্যবান।

তিনি যোগ করেন, যারা আমার বাবার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান প্রদর্শন করেছেন ও তার জন্য প্রার্থনা করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তার নামাজে জানাজা শুক্রবার বাদ জুম্মা রিজেন্ট পার্কে লন্ডন সেন্ট্রাল মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে বাদ আসর অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় জানাজা।

ফিরে দেখা মেয়র আনিসুল হকের জীবন
ঢাকা: আনিসুল হকের জন্ম চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালি জেলায় ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর। তার শৈশবের বেশ কিছু সময় কাটে তার নানাবাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে একই বিষয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন আনিসুল হক।

১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে দশকে টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিটিভিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মুখোমুখি একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনও করেছিলেন তিনি।

তবে পরে টেলিভিশনের পর্দায় মানুষ তাকে বেশি দেখেছিল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই। ২০০৫-০৬ সালে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সালে তিনি হন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতি।

মেয়র নির্বাচনে মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিসুল হক নিজের হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন, তার নিজের কোনো গাড়ি কিংবা বাড়ি নেই; যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার খোরাক যুগিয়েছিল।

টিভি উপস্থাপনা থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে ২০১৫ সালে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নগরকর্তার দায়িত্ব নেন আনিসুল হক।

মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে (তাকে মেয়র পদে সমর্থন) রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের এক সম্মিলন হল।

নিজের নির্বাচনী ইশতেহারে আনিসুল রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও ‘স্মার্ট’ নগরী হিসাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনেকটা সে পথেই এগুচ্ছিলেন তিনি।

হঠাৎ শরীরে মরণব্যাধি বাসা বাঁধে। দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

গত ৪ অগাস্ট অসুস্থ হয়ে পড়লে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ভর্তির পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল আনিসুল হককে।

অবস্থার উন্নতি ঘটার পর গত ৩১ অক্টোবর তাকে আইসিইউ থেকে রিহ্যাবিলিটেশনে স্থানান্তরের খবর জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

তার এক মাসের মধ্যে ফের আইসিইউতে নেওয়া হল ৬৫ বছর বয়সী আনিসুল হককে।

নাতির জন্ম উপলক্ষে গত ২৯ জুলাই সপরিবারে লন্ডনে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন আনিসুল হক।

অসুস্থ বোধ করায় আগস্টের মাঝামাঝিতে লন্ডনের একটি হাসপাতালে গেলে সেখানে পরীক্ষা চলার মধ্যেই সংজ্ঞা হারান তিনি। পরে তার মস্তিস্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত সেরিব্রাল ভাসকুলাইটিস শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা।

তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী আনিসুল হক ২০১৫ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তিনি এফবিসিসিআইর সভাপতি ছিলেন। তার আগে বিজিএমইএর সভাপতিও ছিলেন তিনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।