সারাদেশের ভোটকেন্দ্র ক্ষমতাসীনদের দখলে, ধানের শীষের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: সারাদেশে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা। ভোটগ্রহণের আগেই সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরা, ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া এবং কোথাও কোথাও বের করে দেয়া হয়েছে। ভোটারদেরকে হুমকি দিয়ে সামলে নৌকায় সিল মারিয়ে নেয়ার বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা-১৫ আসনে ৭০ টি কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ ও নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা। এখন পর্যন্ত ২০ জন ধানের শীষ এজেন্টকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্তৃক অপহরণ ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

ধানের শীষ প্রতীকের মিডিয়া সমন্বয়ক মু. আতাউর রহমান সরকার এই অভিযোগ করে বলেন, মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ ব্রাঞ্চ-৩ কেন্দ্রে, ইব্রাহিমপুর সালাউদ্দিন শিক্ষালয়ে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের যুবলীগ নেতা আলমগীরের কার্যালয়ে আটকে রেখেছেন।

তাছাড়া মিরপুর আদর্শ স্কৃুল , রোটারী স্কুল এন্ড কলেজ, মমতাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কিন্ডার গার্ডেন, ইব্রাহিমপুর প্রাাথমিক বিদ্যালয়, চেরি গ্রামার স্কুল, হলি চাইল্ড কিন্ডার গার্ডেন, হাজী আলী ইউসুফ স্কুলে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন। এছাড়া শেরেবাংলা নগরের হালিম ফাউন্ডেশনের তিনটি কেন্দ্র আওয়ামীলীগ সভাপতি বেলাল হোসেন ধানের শীষের এজেন্টদের ঢুকতে দিচ্ছে না।

তিনি বলেন, বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্রে ঢাকা মেট্রো-১২২১৩৩ গাড়ি ব্যবহারকারী মেজিস্ট্র্যাট, ১১০০০৫ গাড়ির বিজিবিকে জানানো হলেও তার কোনো প্রকার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং আমাদের নেতাকর্মীদের সেখান থেকে চলে যেতে বলেছে।

এর আগে গতরাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী কামাল আহমেদ মজুমদারের কর্মীরা লাইট অফ করে ও কেন্দ্রের পাশে থাকা বাড়িগুলোর সিসি ক্যামেরা জোরপূর্বক খুলে নিয়ে সন্ধ্যা ৭ টা থেকে কেন্দ্রগুলো দখলে নিয়ে নৌকায় সিল মেরেছে। স্থানীয় পুলিশ ও সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ করেও এ বিষয়ে কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে জানান আতাউর রহমান সরকার।

রাতে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা কাফরুল এর ১৩ সেকশন আল জাহরা কেন্দ্র, আদর্শ স্কুল, মিরপুর-১০ এর পূর্ব দিকে ১৩নং হাজী আলী হোসেন স্কুল, পশ্চিম শেওড়াপাড়া ইস্ট ওয়েস্ট স্কুল, ইউনানী আইয়ুবেদী মেডিকেল কলেজ, আবুল হোসেন স্কুল, মনিপুর বালক স্কুল ও মনিপুর বালিকা স্কুল ভবনের মোট ৫০ টি কেন্দ্র দখল করে ভোট কেটে নেয় তারা।

এদিকে চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনের কিছু কেন্দ্রে নৌকা ছাড়া অন্য কোনো প্রতীকের এজেন্ট নেই। চট্টগ্রাম-৯, চট্টগ্রাম- ১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের ১০-১২ টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে নৌকা ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীর এজেন্ট নেই।

চট্টগ্রামের লালখান বাজারের একটি ভোটকেন্দ্রে (চট্টগ্রাম-১০) সকাল ৭ টা ৫০ মিনিটের দিকে বিবিসি সংবাদদাতা অধিকাংশ ব্যালট বাক্স পূর্ণ দেখতে পান।

এ বিষয়ে ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেন নি।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐক্যফ্রন্টের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া, ভোটারদের হুমকি দিয়ে সবার সামলে নৌকায় সিল মারিয়ে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা।

এদিকে নির্বাচনে সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। মধ্যরাত থেকে এ পর্যন্ত ৪জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রবিবার সকালে চট্টগ্রামের বাশখালিতে দুর্বৃত্তের গুলিতে জাতীয় পার্টির কর্মী আহমেদ কবির এবং রাঙামাটির কাউখালীতে নির্বাচনী সহিংসতায় এক যুবক নিহত হয়েছেন।

ভোটগ্রহণের আগেই দেশের তিন জেলায় শনিবার মধ্যরাতে প্রতিপক্ষের সঙ্গে গোলাগুলিতে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন নিহত হয়েছেন।

এদিকে নোয়াখালী- ২ ও ৩ আসনের দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। হামলা ও নির্বাচনী সামগ্রী লুটের ঘটনায় এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

শনিবার মধ্যরাতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া গ্রামে দু’পক্ষের গোলাগুলিতে ছাত্রলীগের এক কর্মী নিহত হয়েছে।

একই রাতে প্রতিপক্ষের হামলায় সুনামগঞ্জে আ’লীগ কর্মী এবং চট্টগ্রামে যুবলীগ কর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এ ঘটনায় রাকিব হোসেন ও জহির নামের স্থানীয় দুই ছাত্রলীগ নেতা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাদেরকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

জানা যায়, সদর উপজেলার বড়ালিয়া গ্রামের বড়ালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের সামনে বেশ কয়েকটি ফাঁকা গুলির শব্দ শোনেন স্থানীয়রা।

এসময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন।

এর কিছুক্ষণ পর পাশের একটি ডোবায় যুবকটির মরদেহ পাওয়া যায়।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও আওয়ামী লীগ নেতা আহসানুল কবির রিপন জানান, অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলায় আমাদের কর্মী নিহত ও ছাত্রলীগের দুই নেতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এ ব্যাপারে চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি এ কে এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের পরিচয় জানা যায়নি। তার লাশ উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আহত দু’জনকে পুলিশ উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

একই রাতে প্রতিপক্ষের হামলায় সুনামগঞ্জে আ’লীগ কর্মী এবং চট্টগ্রামে যুবলীগ কর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ওসি নিয়ামত উল্লাহ বলেন, গুরনখাইন এলাকায় রাত ১০টার দিকে বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে যুবলীগকর্মী দ্বীন মোহাম্মদকে হত্যা করে।

নিহত দ্বীন মোহাম্মদের (৩৫) বাড়ি কুসুমপুরা ইউনিয়নের গুরনখাইন এলাকায়। দ্বীন মোহাম্মদকে মৃত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।

তার ভাতিজা সাইফুর রহমান মামুন হাসপাতালে অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় বিএনপিকর্মী রফিক, আরিফ ও আনিসের নেতৃত্বে এই হামলা করা হয়েছে। এদিকে একই রাতে ‍সুনামগঞ্জে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় বিএনপি কর্মীর আঘাতে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়েছেন। শনিবার রাতে উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের মহিষপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত সাইফুল ইসলাম (৪০) মহিষপুর গ্রামের সোনা মিয়া তালুকদারের ছেলে। এই খুনের ঘটনায় পুলিশ ওই গ্রামের জায়েদ আলীর ছেলে মিস্টার মিয়া ও তার স্ত্রী রোজিনাকে আটক করেছে।

এলাকাবাসী জানায়, জয়শ্রী ইউনিয়নের মহিষপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম কিছুদিন আগে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

ধর্মপাশা থানার ওসি এজাজুল ইসলাম বলেন, দায়ের হাতলের আঘাতে সাইফুলের মৃত্যু হয়েছে। মিস্টার মিয়া ও তার স্ত্রী রোজিনাকে আটক করা হয়েছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি জোট দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করছে বলে দাবী করছে আওয়ামী লীগ।

এদিকে পোস্টার ছেড়াকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ক্যাম্প এবং বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসময় সংঘর্ষের ঘটনায় দলটির অন্তত ৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

আহতদের মধ্যে জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের দপ্তর সম্পাদক সাইফুল ইসলামকে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শহরের পৌর এলাকার ধানবান্ধি মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদর থানার ওসি মোহাম্মদ দাউদ জানান, ধানবান্ধি মহল্লার বি.এল সরকারি স্কুল এলাকায় অবস্থিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ক্যাম্পের কাছে পোস্টার ছেড়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ক্যাম্পের চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর ও স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা সাইফুলকে মারপিট করা হয়। এ সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে উভয় দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ধানবান্ধি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় আওয়ামী লীগের আরেকটি নির্বাচনি ক্যাম্প ভাঙচুর চালানো হয়।

ওসি মোহাম্মদ দাউদ আরও জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া শহরে বিজিবির টহলও রয়েছে।

পৌর আওয়ামী লীগের সদস্য মাহবুবুর রহমান জানান, বিএনপি সমর্থকরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে নৌকার দুটি নির্বাচনি ক্যাম্প ও দুটি বসতবাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে। এ ঘটনায় সাইফুল ও শুভসহ ৫ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, মামলা-হামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতাকর্মীদের অধিকাংশ পালিয়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ক্যাম্প ও বসতবাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ অবান্তর।

অন্যদিকে নোয়াখালী- ২ ও ৩ আসনের দুটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। হামলা ও নির্বাচনী সামগ্রী লুটের ঘটনায় এসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

নোয়াখালী-৩ বেগমগঞ্জ আসনের শরীফপুর ইউনিয়নের ১৩৩নং পূর্ব বাবুনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শনিবার রাতেই দুর্বৃত্তরা ভোটের সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়। তাই আজ সেখানে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে নোয়াখালী-২ আসনের (সেনবাগ ও সোনাইমুড়ি আংশিক) সোনাইমুড়ি উপজেলার নাটেশ্বরী ইউনিয়নের মধ্য এবতেদায়ী নূরানী মাদরাসা কেন্দ্রেও হামলার ঘটনায় ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

শনিবার রাত ১১টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় প্রিসাইডিং অফিসার সোনাইমুড়ি উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ও নির্বাচনী কর্মকর্তা শেখ ফরিদসহ সাতজন আহত হয়েছেন। এছাড়া ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম লুট করা হয়েছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।