ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগে এ পর্যন্ত ৩০ প্রার্থীর ভোট বর্জন

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বিরুদ্ধে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে সারাদেশে এ পর্যন্ত স্বতন্ত্রসহ বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং জাতীয় পার্টি ৩০ প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান ধানের শীষের ২২ প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র ৪ প্রার্থীর নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। রবিবার দুপুরে দলের প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।

তিনি বলেন, ‘ভোটার ও সাধারণ জনতার ওপর সরকারের অব্যাহত হামলায় জনগণের জীবন আজ বিপন্ন। সর্বত্রই চলছে সশস্ত্র মহড়া। জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা তো দূরের কথা জান-মালের কোনও নিরাপত্তা নেই।’

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই একতরফা নির্বাচনকে কোনও অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর যে সব প্রার্থীরা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন ওইসব আসনসমূহে আমরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান ও বয়কট করার ঘোষণা দিচ্ছি।’

জামায়াতসেক্রেটারি অভিযোগ করেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জনগণের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সরকারের নির্দিষ্ট ছক ও নক্শা অনুযায়ী সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও জোটের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দেওয়া হয়।’ আন্তর্জাতিক মহল থেকেও নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হয়।

তিনি অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোটারদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থী ও ভোটাররা হামলার শিকার হয়ে মারাত্মতকভাবে আহত হয়েছেন। দেশের সর্বত্রই নির্বাচনের নামে প্রহসনের নগ্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে এটা কোনও নির্বাচনই নয়। নির্বাচনের নামে এটি একটি ব্যালট ডাকাতির প্রহসন এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এছাড়া ঐক্যফ্রন্টের ঢাকা-১৭ আসনে আন্দালিব রহমান পার্থ, লক্ষীপুর-৩ আসনে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বাগেরহাট-৩ আসনের শেখ আব্দুল ওয়াদুদ, খুলনা-১ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী সুনীল শুভ রায় এবং ঢাকা-১ আসনে ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম।

ঢাকা-১৭: ঢাকা-১৭ আসনে ভোট বর্জন করেছেন ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ।

ঢাকা-১: ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মটরগাড়ি প্রতীকের অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। একই সঙ্গে অবিলম্বে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে এ আসনে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

রবিবার দুপুর ১২টায় নবাবগঞ্জের কামারখোলায় নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে সালমা ইসলামের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, আজ ৩০ ডিসেম্বর, বিজয়ের মাস। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির লোক। আমার প্রার্থী সালমা ইসলাম এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্র হলেও তিনিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লোক।

কুমিল্লা-১১: কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জামায়াত নেতা ড. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

রবিবার সকাল ১১টায় তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে ভোটার, নেতাকর্মী এবং প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের বাধাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

এই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রেলমন্ত্রী মজিবুল হক।

পাবনা-৫: পাবনা-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জামায়াত নেতা ইকবাল হোসেন ভোট বর্জন করেছেন। প্রার্থী নিজেই সাংবাদিকদের ফোন করে এই তথ্য জানান।

ভোট জালিয়াতি, তার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে তিনি ভোট বর্জন করেছেন বলে জানান।

খুলনা-৫: খুলনা-৫ আসনের ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী জামায়াত নেতা অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ভোট বর্জন করেছেন।

রবিবার সকাল ১০টার দিকে তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, ভোট গ্রহণের ১ ঘণ্টার ভিতরে ৫ আসনের সকল কেন্দ্রের ভোট কক্ষের দরজা বন্ধ করে নৌকা প্রতীকে জাল ভোট দেওয়া হচ্ছে। ভোট গ্রহণের পর থেকে শত শত ভোটারকে ভোট কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। যারা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

তিনি আরো অভিযোগ করেন, অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনকি প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদেরও কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সেনাবাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে জানানো হলে তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি। এজন্য এ প্রহসনের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালাম।

খুলনা -১: আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সুনীল শুভ রায় ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জন করেছেন।

খুলনা-৬: একই অভিযোগে খুলনা-৬ আসনের ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। দুপুর ১২টার দিকে তারা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আটজন প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। আজ রোববার সকাল আটটা থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোট বর্জন করা আট প্রার্থীর মধ্যে সাতজন ধানের শীষ প্রতীকে লড়ছিলেন। আর একজন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আট প্রার্থীরই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

ভোট শুরুর আড়াই ঘণ্টা পর প্রথম ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া খুলনা-৫ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার। ওই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ।

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া, এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া, দলীয় নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করার পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তিনি ভোট বর্জন করছেন। তিনি বলেন, অবৈধ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচন বৈধ করতে তিনি রাজি নন।

একই সময়ে ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-শালথা) আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ওই আসনের ১২৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০০টি কেন্দ্রে গতকাল শনিবার রাতেই ভোট দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ সকালে যেসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্টকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে নিজেও ভোট দেননি শামা ওবায়েদ ইসলাম। ওই আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী।

ঢাকা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলাম ভোট জালিয়াতির অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেছেন। আজ দুপুর ১২টায় নবাবগঞ্জ উপজেলার কামারখোলায় নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ঢাকা-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী রয়েছেন সালমান এফ রহমান।

ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাগেরহাট-৩ আসনে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মোহাম্মদ আবদুল ওয়াদুদ ও বাগেরহাট-৪ আসনে জেলা জামায়াতের শুরা সদস্য মো. আবদুল আলীম বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ভোট বর্জন করেন। বাগেরহাট-৩ আসনে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের স্ত্রী হাবিবুন নাহার আওয়ামী লীগের প্রার্থী। আর বাগেরহাট-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী আমির এজাজ খান, খুলনা-৩ আসনে রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনের আজীজুল বারী হেলাল ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা তিনজনই বিএনপির প্রার্থী। খুলনা-১ আসনে পঞ্চানন বিশ্বাস, খুলনা-৩ আসনে মুন্নুজান সুফিয়ান এবং খুলনা-৪ আসনে আবদুস সালাম মুর্শেদী আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।