খালেদা ও তারেকবিহীন ‘নতুন বিএনপি’, ভারতের গেম প্লান!

নিউজ ডেস্ক: “খালেদা ও তারেকবিহীন ‘নতুন বিএনপি’ সৃষ্টি বাংলাদেশে ভারতের গেম প্লান!”- এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাউথ এশিয়ান মনিটর। প্রতিবেদনটি লিখেছেন অনলাইন নিউজ পোর্টালের নির্বাহী সম্পাদক চন্দন নন্দী। নিচে প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো –

বাংলাদেশ রয়েছে সন্ধিক্ষণে। ১০ মিলিয়ন বাংলাদেশী ভোটার শঙ্কাময় পরিবেশে ৩০ ডিসেম্বরের জন্য রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় অপেক্ষা করছে। সহিংসতা, বিরোধী অ্যাক্টিভিস্টদের গুম, নির্বাচনী ষড়যন্ত্র, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যাখ্যান এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য ক্ষমতাসীন দলের সব উপায় অবলম্বনের মতো পরিস্থিতিতে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু তারপরও দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় তারা এতে অংশ নিচ্ছে। এন্টি-ইনকমবেন্সি ধারণায় চালিত ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য বাড়ি থেকে বের হতে সক্ষম হবে কিনা। তবে এই বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের কৌশলী চালও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

ভোট শুরু হতে মাত্র ২৪ ঘণ্টা বাকি থাকতে বাংলাদেশের কিছু থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, নাগরিক সমাজ ও চিন্তাবিদের মধ্যে সাধারণ ধারণা রয়েছে যে ভারতের ‘নীরব তবে পূর্ণ সমর্থন’ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমতায় ফিরতে পারে। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন নেতা দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি চাপের মধ্যেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং তাদের ক্যাডার ও কর্মীবাহিনী ৩০০ আসনেই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে।

চূড়ান্ত দিন আসন্ন হওয়ার প্রেক্ষাপটে এসব মিশ্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ভারতের সাবেক কয়েকজন কূটনীতিক ও থিঙ্ক ট্যাঙ্ক স্কলার আরো বেশি বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তারা টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে নয়া দিল্লির ঝুঁকি ও স্বার্থ পর্যালোচনা করছেন। ঢাকায় ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিবিদ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামো থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানকে ‘বিচ্ছিন্ন’ করা।

ওই সাবেক হাই কমিশনার বলেন, আমরা কেবল অ-মৌলবাদীদের সাথে কাজ করব। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী (যদিও তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে) বিকল্প নয়। এই সময় তাদের প্রতি ভারত সমর্থন দেবে, এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়নি। ফলে একমাত্র বিকল্প হলো আওয়ামী লীগের শাসন অব্যাহত থাকতে দেয়া।

শেখ হাসিনাকে সমর্থন প্রদানের একটি কারণ, যদিও তা সাধারণ সব যুক্তির বিরুদ্ধেই যায়, তা হলো চীনকে দূরে রাখা – এই মত সমর্থন করে ওই সাবেক দূত বলেন: ‘সম্পদ ঢালার দিক থেকে বেইজিংয়ের সাথে নয়া দিল্লি প্রতিযোগিতায় পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের মধ্যে তার একটি প্রতিষেধক আছে। অবশ্য প্রধান উদ্দেশ্য হলো খালেদা ও তারেকবিহীন নতুন বিএনপির জন্য ধীরে ধীরে রাস্তা খোলা। এটি একটি পর্যায় পর্যন্ত পরিকল্পনা। এখন তারা কোথায় আছে তা কি দেখতে পাচ্ছেন না? আর এই নির্বাচনের পর তারা আরো বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। কারাবন্দি খালেদা জিয়া খুবই অসুস্থ বলে জানা গেছে। আর তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছেন। হাসিনা টানা তৃতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার দেশে ফেরার আশা ক্ষীণ হয়ে পড়বে।

খালেদা ও তারেককে ‘নিঃসঙ্গ’ করা ভারতের প্রধান পরিকল্পনা কিনা এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত আরেক সাবেক হাই কমিশনার দেব মুখার্জি বলেন, খালেদা ও তারেক নিজেদের নিঃসঙ্গ করেছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের অব্যাহত সমর্থনের প্রেক্ষাপটে মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী অনুভূতি বাড়ছে বলে প্রায়ই যে কথাটি বলা হচ্ছে, তা তিনি মেনে নিচ্ছেন না।

আসন্ন নির্বাচনের ছয় মাস আগে বিএনপি নয়া দিল্লির ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ওই সময় স্থায়ী কমিটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের সদস্য ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক নেতা, ক্ষমতাসীন আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আমলা, দিল্লির সাবেক শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাত করেন। এরপর সরাসরি টেলিফোনে কথা হয়। দলের প্রতি সমর্থন আদায়ের জন্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য অক্টোবরের শেষ দিকে বিদায়ী হাই কমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সাথেও সাক্ষাত করেন।

এসব প্রয়াস ফলপ্রসূ হয়নি। তবে ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের সাথে সতর্ক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, এমন সিনিয়র নেতাদের নিরীক্ষণ করেছেন। অবশ্য নির্বাচন কাছাকাছি চলে আসায় এবং নয়া দিল্লির কাছ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত খুবই সামান্য হওয়ায় ঢাকায় বিএনপি নেতৃত্ব ‘আই-ওয়ার্ড (ইন্ডিয়া)’ ছাড়াই নির্বাচনী প্রচারকাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়।

গত জুনে দিল্লিতে বিএনপি নেতারা যে কজন ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও বিশেষজ্ঞের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন তাদের অন্যতম হলেন অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলে মনোজ যোশি। তিনি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, আমরা জানি যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক সূচকগুলো খুব ভালো হলেও রাজনৈতিক অংশটি অনেক বেশি জটিল। শেখ হাসিনা বিরোধী দল ও যেকোনো ধরনের ভিন্নমতের বিরুদ্ধে কঠোর হস্ত। নিশ্চিত বিষয় হলো, যখনই ভিন্নমত বাধাগ্রস্ত হয়, তখন এর দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যা হতে পারে তা হলো বৃহত্তর ইসলামীকরণ।

বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে না এড়ালেও যোশি মনে করেন, এখন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আওয়ামী লীগের অনুকূলে হলেও বিএনপি আমাদের কাছে অপেক্ষাকৃত ভালো কোন বিকল্প দেখাতে পারছে না। এখন তাদের শীর্ষ দুই নেতা নেই, আমাদের জানতে হবে বিএনপি কে? তার চেয়েও বড় কথা হলো চীন ফ্যাক্টর। এ কারণে ভারতের উদ্দেশ্য হলো ধীরে ধীরে ও নিশ্চিতভাবে বিএনপিকে ‘নিস্ক্রিয়’ করে দেয়া, বিশেষ করে যখন জামায়াতকে অংশীদার হিসেবে বহাল রাখার রেকর্ড আছে দলটির। তিনি আরো বলেন, বর্তমান বিএনপি ভালো কোনো বিকল্প নয়।

খালেদা-তারেককে নিঃসঙ্গ করার ভারতীয় পরিকল্পনার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এবার বিএনপির অবস্থান দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে খুব বেশি আগ্রহী নয়। তারা নতুন নেতৃত্ব উঠে আসার জন্য এক বা দুই বছর অপেক্ষা করতে পারে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিকট ভবিষ্যতে তাদেরকে অনাবশ্যক করে ফেলতে পারে। একই সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির একটি অংশ তারেককে নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে।

তিনি তারেককে নিয়ে ভারতের উদ্বেগের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকলেও তিনি দিল্লির কাছে এবং সেইসাথে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সম্ভাব্য নেতা হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেখছেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, উদার স্পেস না থাকলে ইসলামী চরমপন্থীরা আরো শক্তি সঞ্চয় করতে পারে। আর এখানে ভারত একটি ফ্যাক্টর কারণ দেশটি আগের চেয়েও কঠোরভাবে হাসিনাকে সমর্থন প্রদান অব্যাহত রেখেছে।

সাখাওয়াত ও বাংলাদেশের অন্যান্য চিন্তাবিদ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এটি অবশ্যই আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বড় চ্যালেঞ্জ হলো নারী, সংখ্যালঘুর মতো নাজুক অংশগুলো তাদের ভোট দিতে বের হতে পারে কিনা তা। তিনি বলেন, সাধারণভাবে গ্রেফতার হওয়ার ভয়, ভীতি প্রদর্শনের পরিবেশ, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, অনেক ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে।

পালাবদল