ভবিষ্যৎ কর্মপন্থায় দ্বিধান্বিত ঐক্যফ্রন্ট

নিউজ ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে হতবাক জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচন পরবর্তী ভবিষ্যত কর্মপন্থা নিয়ে তাই দ্বিধান্বিত ফ্রন্টের নেতারা। যদিও এ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা আলোচনা শুরু করেছেন। কিন্তু করণীয় নির্ধারণ এবং আন্দোলনের বিষয় নিয়ে তারা একমত হতে পারছেন না। বিএনপি খুব দ্রুত আন্দোলন শুরু করতে চাইলেও গণফোরামসহ অন্যান্য দলগুলো ধীরে-সুস্থে আন্দোলনে নামার পক্ষে। গণফোরামের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন চাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্টের বাইরেও যেসব দল নির্বাচনে ভোট ডাকাতির কথা, অনিয়মের কথা বলছে; তাদের সাথে আলোচনা করে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করতে।

এ ছাড়া এ নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হয়নি তা আন্তর্জাতিক মহলকে বুঝিয়ে তাদের মাধ্যমেও সরকারকে চাপে রাখতে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রতিকার চাইবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমি মামলা করব। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছেও অভিযোগ জানাব। আমি চাইব, সব প্রার্থীই তার আসনভিত্তিক অভিযোগ করবেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য জানান, আসন ধরে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এখন চেষ্টা করা হচ্ছে, এই উদ্যোগের সঙ্গে মহাজোটের বাইরে থাকা অন্যান্য দলগুলোকেও যুক্ত করার। বিএনপির একটি অংশ এ বিষয়ে একমত হলেও অন্য একটি অংশ সরকারকে সময় দিতে চান না। তারা চান দ্রুত আন্দোলন শুরু করতে।

নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আজ নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি দেবে। নির্বাচনের আগে দাবি-দাওয়া নিয়ে একাধিকবার নির্বাচন কমিশনে গেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের জেরে বৈঠকের মাঝামাঝি বের হয়েও আসেন নেতারা। নির্বাচনের ফল বর্জন করে প্রার্থীসহ সেই ইসিতেই তাঁরা আবার যাচ্ছেন স্মারকলিপি দিতে। যে দিন তাঁরা যেতে চান, ওই দিনই আবার নবনির্বাচিতরা শপথ নেবেন। ঐক্যফ্রন্টের এ কর্মসূচি নিয়েও তাদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এ বিষয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে কোনো লাভ হবে না। যে নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সক্ষমতার পরিচয় দেয়নি, সেই নির্বাচন কমিশন এখন কী করবে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে মওদুদ আহমদ ও ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর একটি ফোনালাপ ফাঁস ঘিরে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে তাঁদের আলোচনায় ছিল সব প্রার্থীকে ঢাকায় ডেকে কোনো কর্মসূচি দেয়া। এখন নির্বাচনের পর সবাইকে ঢাকায় ডেকে কমিশনে নেয়া প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি নির্বাচনের আগেই করতে হতো। এখন করলে ফলপ্রসূ কিছু হবে বলে মনে হয় না।

ইসিতে স্মারকলিপি দেয়ার আগে সব প্রার্থীকে নিয়ে বৈঠক হবে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে। এ জন্য দলের পক্ষ থেকে সব প্রার্থীকে ঢাকায় ডাকা হয়েছে। তবে এতে অনেক প্রার্থী না আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ তারা এ ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি নির্বাচনের আগে চেয়েছিলেন। তখন তাদেরকে বলা হয়েছে, আপনারা চুপচাপ এলাকায় থেকে কাজ করুন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের এসব কথা শুনে তারা কিছু করতে পারেননি। নির্বাচনের সময় কোনো আন্দোলন কর্মসূচি না দেয়ার জন্য দলের প্রভাবশালী তিন নেতা কাজ করেছেন বলে এখন আলোচনা হচ্ছে। স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ নেতা, চট্টগ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং নোয়াখালি অঞ্চলের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতার ভ‚মিকা নিয়ে দলের মধ্যে এখন ক্ষোভ এবং অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে। তারা সরকারের সাথে গোপন আঁতাত করে দলের এই ভরাডুবি ডেকে এনেছেন এমন গুঞ্জনও শুরু হয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী এমপিরা আজ শপথ নেবেন। নির্বাচনে বিজয়ী ঐক্যফ্রন্টের সাতজন এমপি শপথ নেবেন কি না তা নিয়ে বিএনপি এবং গণফোরামের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের সাতজন এমপির মধ্যে ছয়জন ধানের শীষ প্রতীকে এবং একজন গণফোরামের উদীয়মান সূর্য প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন। যে ছয়জন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, তার মধ্যে পাঁচজন বিএনপির দলীয় প্রার্থী এবং একজন নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী। বিএনপি ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করে নির্বাচিতদের শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট করে বলেছেন, যেহেতু আমরা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখান করেছি; তাই শপথ নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। অন্য দিকে গণফোরাম এবং নাগরিক ঐক্যের যে দুইজন নির্বাচিত হয়েছেন; তারা শপথ নেবেন কি না সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। গণফোরাম সূত্র জানায়, আগামী ৫ তারিখ দলের বর্ধিত সভায় নির্বাচিত এমপির শপথ নেয়া না নেয়ার বিষয় সিদ্ধান্ত হবে। তবে গণফোরামের কার্যনির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, এই নির্বাচন কেমন হয়েছে তা গোটা দেশবাসী জানে। পুলিশ-প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোট চুরি করা হয়েছে। এই নির্বাচনে যদি গণফোরাম তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কেউ শপথ গ্রহণ করে বা সংসদে যায় তা হলে তারা হবেন সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি। কারণ এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই নয়, দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে।

বগুড়া-৪ আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত বিএনপির প্রার্থী মো. মোশাররফ হোসেন শপথ গ্রহণের বিষয়ে বলেন, আমি আজকে বিজয়ী হয়েছি দল ও ধানের শীষের কারণে। দল যদি আমাকে ধানের শীষ মনোনয়ন না দিত, তা হলে কেবল ব্যক্তি হিসেবে আমি কখনোই বিজয়ী হতে পারতাম না। তাই দল যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, আমি সেটিই পালন করব। দল যদি বলে শপথ নিতে হবে, আমি শপথ নেবো। দল যদি বলে শপথ নেয়া যাবে না, আমি শপথ নেয়ার কথা চিন্তাও করব না। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।-ইনকিলাব