ধানের শীষে ভোট দেয়ায় গণধর্ষণ, সেই আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৩

নিজস্ব প্রতিনিধি
নোয়াখালী: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডার জেরে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার স্বামী-সন্তানদের বেঁধে রেখে এক নারীকে মারধর ও গণধর্ষণের ঘটনায় ‘মূল ইন্ধনদাতা’ আওয়ামী লীগ নেতা মো. রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর আগে চার সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ অভিযোগের মামলায় সোহেল ও স্বপন নামের আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ মঙ্গলবার রাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও বুধবার দুপুরে কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনকে বুধবার রাতে সদর উপজেলার উত্তর চরওয়াপদা গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে বৃহস্পতিবার সকালে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সুবর্ণচরের চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন।

ওসি আরো জানান, একই রাতে সেনবাগ উপজেলার খাজুরিয়া গ্রাম থেকে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার নাম বেচু মিয়া। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভোটের দিন রাতে সুবর্ণচরের চরজুবলী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি বাড়িতে এক নারীকে মারধর ও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরে নিহতের স্বামী নয়জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন।

মামলার আসামিরা হলো মো. সোহেল (৩৫), হানিফ (৩০), স্বপন (৩৫), চৌধুরী (২৫), বেচু (২৫), বাসু ওরফে কুড়াইল্যা বাসু (৪০), আবুল (৪০), মোশাররফ (৩৫) ও সালাউদ্দিন (৩৫)। এরা সবাই সুবর্ণচরের মধ্যবাইগ্গা গ্রামের বাসিন্দা।

মামলার বাদী উল্লেখ করেন, গত ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ শেষে সরকারি দলের সমর্থক মোশারফ, সালাউদ্দিন ও সোহেলসহ ১০-১২ জন তাঁর বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এ সময় আসামিরা তাঁকে ও তাঁর মেয়েসহ বাড়ির অন্যদের পিটিয়ে আহত করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। পরে তারা তাঁর স্ত্রীকে ধর্ষণ করে এবং পিটিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে। পরের দিন সকালে এলাকাবাসী এসে তাঁদের উদ্ধার করে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই নারী।

গতকাল পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ওই নারী ও তাঁর স্বামীকে দেখতে যান এবং তাঁর বক্তব্য শোনেন। এ সময় ওই নারী মো. রুহুল আমিনকে মামলার আসামি থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ডিআইজি পরে সংবাদিকদের বিষয়টি ‘রাজনীতির বাইরে রেখে’ সুষ্ঠু ও যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। পুলিশের এ প্রতিনিধি দলটি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে।

ডিআইজির আশ্বাসের পর পরই আওয়ামী লীগ নেতা মো. রুহুল আমিনসহ আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর আগে গত মঙ্গলবার এ ঘটনায় বাসু ওরফে কুড়াইল্যা বাসুকে এবং গতকাল বুধবার মো. স্বপনকে নোয়াখালী থেকে ও মো. সোহেলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে সুবর্ণচরে নারীকে গণধর্ষণের বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ ঘটনা তদ্ন্ত করছি। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা এ ঘটনাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত কেউ পার পাবে না।’

সুবর্ণচরে গত ৩১ ডিসেম্বর চার সন্তানের জননীকে গণধর্ষণ অভিযোগের ঘটনায় ৯ জনের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে তাতে অভিযুক্তদের তালিকায় সাবেক এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য রুহুল আমীনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যাকে ধর্ষণের নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নির্যাতিতা নিজেই।

নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৫ বছরের ওই নারী গত ৩১ ডিসেম্বর অভিযোগ করেছিলেন, নির্বাচনে বিএনপি’র ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় রুহুল আমীনের নির্দেশে তার ১০ থেকে ১২ জন সহযোগী তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে।

রুহুল আমিন নিজেকে সুবর্ণচর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন।