চরম দুর্দিনে জিয়ার পরিবার, চারদিকে অন্ধকার!

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: চরম দুর্দিনে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের পরিবার। চারদিকে অন্ধকার, একের পর এক ঝামেলা ঘিরে ধরছে। কোনো দিকেই আশার আলো নেই। কোনোমতেই যেন এই দুর্দিন কাটছে না।

বয়স ৭২, বিধবা হয়েছেন ৩৬ বছর বয়সেই। অবুঝ দুই ছেলেকে নিয়ে পথচলা শুরু। এরপর নিয়তির ডাকেই রাজনীতিতে আসা। দলে স্বামীর শূন্যতা পূরণে নেতানেত্রীদের পীড়াপীড়িতেই আশির দশকের গেড়ার দিকে অর্থাৎ ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ নিয়ে অনেকটা হঠাৎ করেই রাজনীতির মাঠে আসেন।

একদিকে অবুঝ দুই শিশু সন্তান নিয়ে ঘর-সংসার; অন্যদিকে স্বামীর হত্যাকারী জেনারেল এরশাদকে উৎখাতে মাঠের রাজনীতি। এরপরও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বেই ’৯০-এর পটপরিবর্তন ঘটে। দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়ার পরও জিয়ার ইমেজ আর তার আপোষহীন অসাধারণ নেতৃত্বের আকৃষ্ট হয়ে মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। এরপর আরো দুইবার ক্ষমতায় বসেন বেগম জিয়া।

সাংবাদিক মাহফুজ আনামের ভাষায় সেই সময়টা খালেদা জিয়ার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত’। ‘এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়টি যদি বেগম খালেদা জিয়ার জীবনে ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনটি তার জীবনের সবচেয়ে ‘অন্ধকার সময়’।’

‘আপোসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্বাধীনভাবে চিন্তার মাধ্যমে পরিস্থিতির মূল্যায়ন, দ্রুত সমন্বয় এবং বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হন।’

‘এর শুরুটা হয় ২০০৮ এর নির্বাচনকে দিয়ে। ওই নির্বাচনের পরাজয়কে জনগণের রায় হিসেবে না মেনে তাকে তথাকথিত ‘১/১১ সরকারের’ মেকানিজম হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। এমনকি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকার চালানোর সময় যেসব ভুল করেছেন তা তিনি পর্যালোচনা করেননি।’

এর আগে ১৯৮২ থেকে ২০১৯ এই ৩৬ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাকে। এরশাদের শাসনামলে ’৮৬ সালের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় তাকে চরম জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে হয়। অতঃপর ২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের সময় তাকে কারাগারে যেতে হয়। দুই ছেলেকেও পাঠানো হয় কারাগারে। ছেলেদের উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

এরপরও খালেদা জিয়া এমন একজন রাজনীতিক। কখনো ক্ষমতায় থেকেছেন আবার কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো পদে নেই, নেই সংসদেও। না থাকলে কী হলো, দেশের জনপ্রিয় দলগুলোর অন্যতম বিএনপির চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় তথা নতুন ঐক্যফ্রন্টের জোটনেত্রী। দেশের মানুষের ‘ভোটের অধিকার’ আদায়ের দাবিতে তার নেতৃত্বে চলছে ১২ বছর ধরে আন্দোলন। মূলত জনগণকে ঘিরেই তার সব কিছু। কিন্তু এখন তার জীবনে চরম দুর্দিন চলছে।

সরকার বিরোধী আন্দালনের মধ্যেই ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো নির্বাসনে থাকাবস্থায় মারা যান। লাখো মানুষের শ্রদ্ধা-ভালবাসায় ২৭ জানুয়ারি লাশ দাফন করা হয়। আর বড় ছেলে তারেক রহমান সেই ২০০৮ সাল থেকেই স্বপরিবারে নির্বাসনে রয়েছেন।

২০০৯ সালের মে মাসে ৪০ বছরের স্বামীর স্মৃতি বিজরিত বাড়ি ছাড়া হয়ে উঠেছেন ভাড়া বাসায়। এখানেই শেষ নয়, খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে শতাধিক মামলা।

১৯৮২ থেকে ২০১৯ এই ৩৬ বছরে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে জিয়া পরিবারকে। চড়াই-উৎরাই পাড় করতে হয়েছে তাকে। এখন চরম দুর্দিন চলছে। ফলে সামনের দিনগুলো আরো বেশী চ্যালেঞ্জের মুখে এই পরিবারটি।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই মামলায় (জিয়া অরফানেজ এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট) খালেদা জিয়ার (জেলে যাওয়ার মতো) সাজা হয়েছে ৭ ও ৫ বছর। আবারো নাইকো দুর্নীতির মামলার শুনানি শুরু হয়েছে।

৩ জানুয়ারি ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত আদালতে নাইকো দুর্নীতি মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে বিচারককে উদ্দেশ্য করে খালেদা জিয়া বলেছেন, এতো ছোট জায়গায় মামলা চলতে পারে না। এখানে আমাদের কোনো আইনজীবী বসতে পারেন না। এখানে মামলা চললে আমি আর আদালতে আসব না। যা সাজা দেয়ার দিয়ে দেন।

পূর্বাপর পরিস্থিতি বিবেচনায় ধারণা করা হচ্ছে নাইকো মামলার রায়েও খালেদা জিয়ার ৫ থেকে সাত বছরের সাজা হতে পারে।

এদিকে দুর্নীতির দুই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনা হলেও নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগ বলছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। যদিও পশ্চিমাবিশ্ব এখনো ফলাফল মেনে নেয়নি। তারা অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করে আসছে।

সবমিলেই খালেদা জিয়ার জীবনের পড়ন্ত খুবই দুর্দিন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের লক্ষ-কোটি নেতাকর্মী-সমর্থক থাকার পরও ইতোপূর্বে তার মতো আর কোনো রাজনীতিবিদকে এমন নির্মম পরিস্থিতি শিকার হতে হয়নি।

দেশবাসীকে শুভেচ্ছা
আজ বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৩৬ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন পূর্ণ হল।

খালেদা জিয়ার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও জাতির প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে তার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছে দলটি।

শুক্রবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিনন্দন জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে দলে যোগ দেন। এর দুই মাস পর দেশে সামরিক শাসন জারি হলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, জাতীয় জীবনের সেই ক্রান্তিকালে শুরু হয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। সেই সংগ্রামে খালেদা জিয়ার অবদান বীরত্বগাঁথা।

রিজভী বলেন, সেই সময়ে নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামে তিনি জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে একক ও অনন্য নেতৃত্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামে, সংকটে আপোষহীন ধারায় জনগণের সঙ্গে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। শুরু হয় গণতন্ত্রের পথ চলা।

‘তার (খালেদা জিয়া) ৩৬ বছর রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও জাতির প্রতি অবদানের জন্য আমরা আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা তার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।’

বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, দেশি-বিদেশি চক্র এই মহান জাতীয়তাবাদী নেত্রীর উত্থান সহ্য করতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে যিনি আগলে রেখেছিলেন অতন্ত্র প্রহরীর মতো, তাকে পর্যুদস্তু করার জন্য চক্রান্তকারীরা চক্রান্ত জাল বুনতে থাকে।

তিনি বলেন, ভোটারশূন্য নির্বাচনে বিদেশি মদদপুষ্ট অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শক্তি গণতন্ত্রকে দাফন করতে খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটকে রেখে জুলুমের পর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে।

‘বিনাচিকিৎসা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কারাবিধি অনুযায়ী নিকটজনদের সাক্ষাৎ করতে নানা ফন্দিফিকির করে বিলম্ব করা হচ্ছে। মূলত সাত দিন পর পর আত্মীয়স্বজনদের দেখা করার কথা। অথচ কারাকর্তৃপক্ষ ১৫ দিন পর পর সাক্ষাতের বিধান করে। এবারে ২০-২১ দিন অতিবাহিত হলেও তার সঙ্গে আত্মীয়স্বজনদের সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি।’

দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা গত চার মাস ধরে তার সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন রিজভী।