সৈয়দ আশরাফের মরদেহ আসছে শনিবার, কাঁদছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মরদেহ শনিবার দেশে আসছে।

শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো আওয়ামী লীগের এক সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মরদেহ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা তার মরদেহ গ্রহণ করবেন।

এরপর সন্ধ্যা সাতটায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মরদেহ ২১ বেইলি রোডে তার সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখান থেকে মরদেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। পরদিন ৬ জানুয়ারি রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ কিশোরগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

মরহুমের তৃতীয় জানাজা দুপুর ২টায় ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। বাদ আছর বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হবে।

বৃহস্পতিবার রাতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

সৈয়দ আশরাফ ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে থেকেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি।

কিশোরগঞ্জে শোকের ছায়া
জনপ্রশাসন মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে কিশোরগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বর্ষীয়ান এই নেতার ইন্তেকালে গভীর শোকাচ্ছন্ন তাঁর নিজ এলাকা সদর উপজেলার বীর দামপাড়া গ্রাম থেকে পুরো কিশোরগঞ্জ।

সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে একজন সৎ, পরোপকারী, নির্লোভ ও নিরহংকারী মানুষ হিসাবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয়রা।

যশোদল ইউনিয়নের বীর দামপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও সৈয়দ আশরাফের প্রতিবেশী মো. শাহাবুদ্দিন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রসিক্ত নয়নে বলেন, ‘সে ছিল আমার বাল্যবন্ধু ও বয়সে আমার থেকে সাতদিনের ছোট। ছুটিছাটায় সে যখনই বাড়িতে আসতো, আমরা একসঙ্গে খেলাধুলা করতাম, ঘুরে বেড়াতাম এবং গল্প গুজব করতাম। আমার সঙ্গে সে মনের সব কথা বলতো। মন্ত্রী হওয়ার পরও এই বন্ধুত্বে ছেদ পড়েনি। সব সময়ই আমার খবর রাখতো এবং যেকোনো প্রয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিত।’

সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চাচাতো ভাই সৈয়দ আব্দুল্লাহ হাসান হারুন বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ ও সৎ মানুষ। তাঁর এতটাই দেশ প্রেম ছিল যে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হওয়ার পর একবার আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি তো রাতদিন দেশের জন্য কাজ করছো। কিন্তু নিজের জন্য কি করেছো। সে উত্তর দেয় এই বলে, গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরই আমার ঘর, প্রতিটি মানুষই আমার স্বজন। কেউ আমার আলাদা নয়।’

অপর চাচাতো ভাই সৈয়দ আল বোরহান বলেন, ‘ তিনি এতই অমায়িক ছিলেন যে বাড়িতে এলে আমাদেরকে সুযোগ না দিয়ে নিজেই প্রথম আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কুশল জিজ্ঞেস করতেন। সব সময়ই আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। ছুটিতে বাড়িতে আসলে আমরা একসাথে খেলাধুলা ও আনন্দ-ফুর্তি করতাম।’

বীর দামপাড়া গ্রামে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি দেখাশোনা করেন খোরশেদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মা ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্ত্রী সৈয়দা নাফিসা ইসলাম প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমাকে এই বাড়ি দেখাশোনার জন্য রেখে যান। তারপর থেকে আমি এই বাড়ি দেখাশোনা করছি। এই বাড়িতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্ম ও শৈশব কাটলেও পেশাগত কারণে তিনি পরিবার নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা সদরে থাকতেন। আমার নিজের বাড়ি করার জন্য তাঁর মা আমাকে এই বাড়ির পাশেই ১৫ শতাংশ জায়গা দিয়ে গেছেন। ৭৫ সালের ঘটনার পর দীর্ঘ ১৭ বছর সৈয়দ আশরাফ এই বাড়িতে আসেননি। পরে তিনি যখনই আসতেন আমার কুশলাদি জেনে নিতেন ও সাহায্য-সহযোগিতা করতেন।’

প্রতিবেশী মো. বাছির মিয়া বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে কোন কাজের জন্য গেলে তিনি ফিরিয়ে দেননি।’

যশোদল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল হক বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক স্বপন কুমার রায় বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সারা জীবন নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন সৎ ও নির্মোহ রাজনীতিক, কখনো অসৎ ও দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেননি। আমরা একুশে বা স্বাধীনতা পদকের মাধ্যমে সম্মাননা প্রদান করে তাঁর কর্ম ফলের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করছি। তাঁর মরদেহ যেন কিশোরগঞ্জে এনে জানাজার আয়োজন করা হয়, যেন আমরা শেষ বারের মত তাঁকে এক নজর দেখতে পারি। এটা আমাদের প্রাণের দাবি।’

এর আগে গতকাল রাতে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুসংবাদ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কিশোরগঞ্জে শোকের ছায়া নেমে আসে। দলীয় নেতাকর্মীসহ অনেকেই রাতে ভিড় করেন জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে নেতাকর্মী, শুভাকাঙ্খী, স্থানীয় এলাকাবাসীসহ জেলার সর্বস্তরের মানুষ।

ফিরে দেখা অতীত
২০১৭ সালের ২৩ অক্টোবর মারা যান আশরাফ পত্মী শিলা ইসলামও। তিনি থাকতেন যুক্তরাজ্যে। তিনিও ভুগছিলেন জটিল রোগে। স্ত্রী বিয়োগের ব্যাথায় কাতর আশরাফের শরীরেও মারণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে।

গত বছরের ৩ জুলাই চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে থাইল্যান্ডে যান আশরাফ। তার শারীরিক অবস্থা সঙ্গীন- এই অবস্থাতেও তাকে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী করে আওয়ামী লীগ। আর টানা পঞ্চমবারের মতো তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে জনগণ জানিয়ে দেয়, তাদের মণিকোঠায় ছিলেন আশরাফ।

১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ শহরে জন্ম নেন আশরাফ। রাজনীতিতে জড়ান ছাত্র জীবনেই। ছিলেন অবিভক্ত ময়মনসিংহ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সহ-প্রচার সম্পাদক।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর যুক্তরাজ্য চলে যান আশরাফ। প্রবাস জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ভোটে দাঁড়ান। ওই বছরই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালে জেতেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ২০১৫ সালের ১৬ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন তিনি।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আশরাফকে নিয়ে নেতিবাচক কোনো খবর নেই। তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জটিল পরিস্থিতিতে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।