মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ফোনের অপেক্ষায় অস্থীর সময় যাচ্ছে যাদের

নিউজ ডেস্ক: দেশের ইতিহাসে এই প্রথম টানা তৃতীয় মেয়াদ ও চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। আগামী সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। শেখা হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন।সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু কন্যাকেসরকার গঠনের জন্য নিয়ে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ।

রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সরকার গঠণের আমন্ত্রণ পাওয়ার পর থেকে গত দুদিন ধরে শেখ হাসিনা হোমওয়ার্ক করছেন মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে। শনিবারের মধ্যেই তার নতুন মন্ত্রিসভার জায়গা পাওয়াদের তালিকা চুড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এরপর নির্বাচিতদের এই তালিকা চলে যাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ব্যস্ততা বাড়বে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের. দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যকে ফোন করে তিনিই জানাবেন সুসংবাদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে মন্ত্রিপরিষদের তালিকা হাতে পাওয়ার পর পরই শপথ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। শপথের আগে সকাল থেকেই তালিকায় স্থান পাওয়া ভাগ্যবান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের টেলিফোন করে শপথ গ্রহণের জন্য বঙ্গভবনে আসার আমন্ত্রণ জানাবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তাদের বাসা-বাড়িতে পাঠানো হবে মন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ সরকারী গাড়ি। ফ্ল্যাগবিহীন গাড়িতে চড়ে বঙ্গভবনে শপথ নেয়ার পর ফ্ল্যাগ উড়িয়ে বের হবেন নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীরা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সেই ফোনের অপেক্ষায় আছেন দলের সিনিয়র নেতারা। থেমে নেই জল্পনা কল্পনা. কেমন হবে নতুন মন্ত্রিসভা? পুরনোদের মধ্যে কারা থাকছেন আর কে কে বাদ পড়ছেন, এই নিয়ে নানারকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণও সামনে নিয়ে আসছেন অনেক। তবে সব আলোচনাই একটা জায়গায় এসে থেমে যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এটি চুড়ান্ত করবেন। তবে প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নবীনের প্রতিভার সংমিশ্রণ ঘটিয়েই চমক সৃষ্টির মতো নতুন মন্ত্রিসভা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দেশবাসীকে উপহার দিতে পারেন বলেই জোরালো আলোচনা চলছে।

এদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে অনেকেই জোর লবিংয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন- গণভবন, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমণ্ডির দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, প্রভাবশালী নেতাদের বাসায় মন্ত্রী পদপ্রত্যাশীদের আনাগোনা বেড়েছে। এদের মধ্যে নবনির্বাচিত এমপি, মনোনয়নবঞ্চিত নেতা এবং বর্তমান মন্ত্রিসভার অনেকে আছেন।নতুন মন্ত্রিসভা প্রসঙ্গে শুক্রবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নেত্রী চমক তৈরিতে পছন্দ করেনআমার কেন যেন মনে হয় বিশাল একটা চমক আসবে।

তিনি আরও বলেন, তিনি বলেন, নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ের আওয়ামী লীগের পথ চলা। তবে বিশাল জয়ের সঙ্গে বিশাল চমকও থাকতে পারে। ক্যাবিনেটে কে কে থাকছে, আমি ঠিক তা বলতে পারছি না। আমার মনে হয় বিপুল বিজয় তো বিপুল প্রত্যাশা। জনগণেরও এখানে একটা প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার প্রতিদ্বন্দ্বি তো করতে পারে একজনই (শেখ হাসিনা)। মন্ত্রিসভার বিষয়টা সম্পূর্ণই নেত্রীর বিষয়। এটা প্রধানমন্ত্রীর এরিয়া, এখানে অন্য কারোর প্রবেশের সুযোগ নেই।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের কাছ থেকে পা্ওয়া তথ্য অনুযায়ী,টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ফের জোটগতভাবেই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে মহাজোটের শরিকরা ( ১৪ দল, জাতীয় পার্টি, যুক্তফ্রন্ট) তাদের সম্মতি জানিয়েছে। ‘বিরোধী দল’ কে হবে, তা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতাই জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী চান জাতীয় পার্টিই বিরোধী দলে থাকুক। জাপা চেয়ারম্যান এরশাদও তাই চান। কিন্তু জাতীয় পার্টির ২২ এমপির প্রায় সবাইসরকারে অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় থাকতে আগ্রহী। এ বিষয়ে জাপা শিগগিরই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবে।

গণভবনের একাধিক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী এই মেয়াদে সুশাসন ও দূর্নীতি দমনের প্রতি বেশি নজর দেবেন।রযে মন্ত্রীরা গত পাঁচ বছরে কিছু কাজের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করেছেন, সমালোচনায় ফেলেছেন, তারা নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পাচ্ছেন না- এটি এক প্রকার চূড়ান্ত। ,যারা নিজ মন্ত্রণালয়ের কিছু জটিল সমস্যা নিজেরা সুরাহা করতে পারেননি, এবারের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ছেন তারা। কাজেই বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে এমন কয়েকটি ক্যাটাগরিতে বাদ পড়ছেন কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে এবারের সরকারে যুক্ত থাকছেন না মহাজেটভুক্ত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। তারা এবার সংসদে প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করবেন। একারণেও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ পড়ছেন জাতীয় পার্টির একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী। তবে মহাজোটের শরিক দল হাসানুল হক ইনুর জাসদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি-জেপি ও রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতিনিধি হয়তো থাকছেন নতুন মন্ত্রিসভায়।

সূত্র জানায়, পুরনোদের মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভায় অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের অন্তর্ভুক্ত হওয়াটা।পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হতে পারে ড. আবদুল মোমেনকে।

এবারের মন্ত্রিসভার গঠন নিয়ে যারা ইতিবাচক আলোচনায় রয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন, টাঙ্গাইল-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দীপু মনি, চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম আগেও মন্ত্রী ছিলেন।

একেবারেই নতুনদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অসিম কুমার উকিল। যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য মইনুদ্দিন খান বাদল, সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য একে আব্দুল মোমেন, পিরোজপুর-১ আসনের শ ম রেজাউল করিম, চাঁদপুর-৪ আসনের শফিকুল রহমান, দিনাজপুর-৩ আসনের খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শরীয়তপুর-২ আসনের এনামুল হক শামীম, রংপুর-৪ আসনের টিপু মুনশি, নাটোর-৪ আসনের অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের দবিরুল ইসলাম, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাস।

নতুন মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় আরও যাদের নাম ইতিবাচক তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে তারা হলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনে সংসদ সদস্য মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের হাবিবে মিল্লাত, নওগাঁ-৬ আসনের ইসরাফিল আলম, গাজীপুর-২ আসনের জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর-৪ আসনের সিমিন হোসেন রিমি। এছাড়াও মন্ত্রী হচ্ছেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ।

মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েতে পারেন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী শাহজাহান কামাল, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু, তথ্য প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়।

তবে মন্ত্রিসভা গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপেই নির্ভর করছে বলেও জানা গেছে।

নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, আগামী ৭ জানুয়ারি (সোমবার) বিকাল সাড়ে ৩টায় বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।নতুন মন্ত্রিসভাকে বরণ করতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

জানা গেছে, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের (প্রধানমন্ত্রীসহ) শপথ পড়াবেন। এরপর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের দফতর বণ্টন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।-পূর্বপশ্চিম