নতুন মন্ত্রিসভাকে যেভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা

নিউজ ডেস্ক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সবার আলোচনা ও আগ্রহ ছিল নতুন মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন, তা নিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের চমক থাকবে। শেষমেশ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ জনের যে মন্ত্রিসভা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা সবাইকে অবাক করেছে। নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হলো, তা নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তিন বিশেষজ্ঞ এম হাফিজউদ্দিন খান, সুলতানা কামাল ও আলী ইমাম মজুমদার।

মন্ত্রীরা যেন ইশতেহার মেনেই কাজ করেন
মন্ত্রিসভায় সত্যিই বিরাট চমক দেখতে পেলাম। অনেক জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বাদ পড়েছেন। অনেককে মন্ত্রী করা হয়েছে, যাঁরা হয়তো এবার নির্বাচনই করেছেন জীবনে প্রথম। যাঁরা ঠিকমতো মন্ত্রণালয় চালাতে পারেননি, তাঁদের কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু যাঁরা ভালো করেছেন, তাঁরাও কেন বাদ পড়লেন, ঠিক বোঝা গেল না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীই ভালো বুঝবেন, কোন মন্ত্রী এযাবৎ কেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন।

যেহেতু মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েই গেল, আমাদের চাওয়া হচ্ছে এখন নির্বাচনী ইশতেহার মেনে সব মন্ত্রীই যেন কাজ করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্য গণতন্ত্র। গণতন্ত্র তো নেই। আইনের শাসন তো নেই। তারপরও আমরা চাইব, মন্ত্রীরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবেন। আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর কথা বলা আছে। এই কথার ওপর কতটুকু আস্থা রাখা যাবে তা নির্ভর করবে নতুন মন্ত্রিসভা আগামী সময়ে কী করবে, তার ওপর। হতাশ হই, আগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল, মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে। কাজটি আর হয়নি।

প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ নিরাপদ জীবন
নতুন মন্ত্রিসভার সবাইকে শুভেচ্ছা। তরুণদের মন্ত্রিসভায় আসা আশাব্যঞ্জক বটে, এই অর্থে তাঁরা নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে আসবেন। তাঁরা নতুনভাবে বিশ্বকে দেখেন। উন্নয়নের পর্যায়ক্রমিক ধারাগুলোর সঙ্গে তাঁরা নিজেদের অনেক সহজে খাপ খাওয়াতে পারেন। এসব কারণে তাঁদের সুযোগ থাকে প্রচুর। তবে যেহেতু তাঁদের আগে কখনো এ রকম দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি, তাই একটা ভাবনাও থাকে, তাঁরা কেমন ভূমিকা রাখবেন।

পুরোনোদের মধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের কয়েকজন তো ভালো। সেই সময় তাঁরা ভালো ভূমিকা রেখেছিলেন, এখনো ভালো ভূমিকা রাখবেন বলে আশা রাখি। কয়েকজন সম্পর্কে প্রশ্ন ছিল, তাঁরা কোন বিবেচনায় এলেন? তবে প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন, অতীতের ভুলগুলো শুধরে ওঠার চেষ্টা করবেন।

সামগ্রিকভাবে আমাদের প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সম্মানজনক একটা জীবন পাওয়ার, অর্থাৎ আমাদের সংবিধানে যা আছে। আমাদের প্রত্যাশা, এমন একটা সমাজ, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার থাকবে। আশা করছি, এমন সমাজ নিশ্চিত করবেন তাঁরা।

আগে যখন (সরকারের) সমালোচনা হতো তখন আমরা প্রায়ই একটা ভাষ্য পেতাম যে অন্যদের কারণে তাঁরা কিছু করতে পারছেন না। তাঁরা এবার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে এসেছেন। তাঁদের কাজ, চিন্তা, নীতি বাধাগ্রস্ত করতে পারেন এ রকম কোনো শক্তি নেই। আশা করছি, তাঁরা ইশতেহারে যে কথা বলেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। তরুণ যাঁরা এসেছেন, তাঁরা নির্বাচনের যে অঙ্গীকার করে এসেছেন, সেটি যেন বাস্তবায়িত হয়।

একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে যে বিষয়টা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিগত সময়ে মানবাধিকার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে আমাদের সুনাম সে রকমভাবে রক্ষিত হয়নি। আমরা আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসেবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া মন্ত্রিসভার কাছে প্রত্যাশা থাকবে যে তারা যেন প্রগতিবিরোধী, নারীবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের অজুহাতে আপসকামী না হয়।

মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আশা করি, যাঁদের পরিবারের সদস্যরা গুম হয়েছেন কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন, সেই জায়গায় একটা পরিবর্তন আসবে। এঁদের ন্যায়বিচার দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন তাঁরা।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণও এ সরকারের ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। সেখানে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে। যদিও আমরা (দুর্নীতিতে) চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে বের হয়েছি, তবে এখনো দুর্নীতিতে ২৫ / ২৬ তম স্থান থেকে বের হতে পারিনি। এই জায়গায় আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। দুর্নীতি দমন নিয়ে আওয়ামী লীগ শক্ত বক্তব্য রেখেছে। আশা করব সেই অঙ্গীকার তারা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে।
সবশেষে আমি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন চাই।

সুশাসন নিশ্চিত করাই চ্যালেঞ্জ
নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের অধিকাংশই নতুন। এটা এক অর্থে ইতিবাচক। কেননা, পুরোনোদের তো নতুনদের জায়গা করে দিতে হবে। নয়তো নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে না। কিন্তু তাই বলে অভিজ্ঞ ও পুরোনোদের বেশির ভাগকে একদম বাদ দিয়ে দেওয়াটাকে আমি সঠিক মনে করি না। আগের মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞ ও জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতাদের কয়েকজনকে নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা যেত। সরকার পরিচালনার জন্য তাঁদের মতামত ও দক্ষতাকে কাজে লাগানো যেত। মন্ত্রিসভায় না রাখলে তা করা কঠিন।

অন্যদিকে সরকারের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কাদের রাখা হচ্ছে, তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। এসব দলের নেতাদের অনেকেই অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তাঁদের মন্ত্রিসভায় আদৌ রাখা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তা দূর করা উচিত।

সরকারের সামনের দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করা। দেশের আর্থিক খাতে নানা অনিয়ম ও শৃঙ্খলার অভাব বহুলভাবে আলোচিত। সরকারের হাতে অনেকগুলো বড় প্রকল্প চলমান আছে। সেগুলো শেষ করতে হবে। এ ছাড়া দুর্নীতিও সরকারের জন্য বড় সমস্যা। এটা দূর করতে হবে। দেশে একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, অন্যদিকে আয়বৈষম্য বাড়ছে। এতে দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে অনেক সাবধানে ও সাহসের সঙ্গে এগোতে হবে। সেই পথে পুরোনো অভিজ্ঞ নেতা ও মেধাবী তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের দরকার হবে।

কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে এমন সব অপরিচিত ব্যক্তির নাম দেখলাম, যা আমাকে কিছুটা অবাক করেছে। একদম অনভিজ্ঞ ও নতুনদের দিয়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাজ কতটুকু সফলভাবে করা যাবে, তা আরেকটু ভেবে দেখা যেতে পারে। সরকারের সামনে সুশাসন নিশ্চিত করা ও মানুষের আস্থা অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি দেশকে সামনের দিকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যে কাজে অভিজ্ঞদের অনেক বেশি করে দরকার হবে। অবশ্য পুরোনোদের এখনো যুক্ত করার সুযোগ আছে।

নতুন সরকারের মন্ত্রীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা হচ্ছে, দক্ষতা ও সততা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনের আওতায় রেখে কাজ করানো নিশ্চিত করাটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে সরকারের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এই প্রত্যাশা পূরণে নতুন মন্ত্রীদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে।

মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো ঠাঁই পাচ্ছেন ২৭ জন
নতুন মন্ত্রিসভায় বেশির ভাগই নতুন মুখ ঠাঁই পাচ্ছে। আজ রোববার বিকেল সোয়া চারটায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম পড়ে শোনান।

নতুন মন্ত্রিসভার ৪৭ সদস্যের মধ্যে ২৭ জন প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন। আবার চারজন আছেন—যাঁরা সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় না থাকলেও এর আগে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এই দুই মিলিয়ে ৩১ জন সদস্য নতুন মন্ত্রিসভার নতুন মুখ।

এবার মন্ত্রিসভায় প্রথমবার এসে পূর্ণ মন্ত্রী হতে যাওয়া ৯ জন হলেন: তাজুল ইসলাম (স্থানীয় সরকার), এ কে আবদুল মোমেন (পররাষ্ট্র), নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন (শিল্প), গোলাম দস্তগীর গাজী (বস্ত্র ও পাট), সাধন চন্দ্র মজুমদার (খাদ্য), টিপু মুনশি (বাণিজ্য), শ ম রেজাউল করিম (গণপূর্ত), নুরুল ইসলাম সুজন (রেলপথ), মো. শাহাব উদ্দিন (পরিবেশ ও বন)।

সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় না থাকলেও আগে ছিলেন—এমন তিনজন হলেন: আবদুর রাজ্জাক (কৃষি), দীপু মনি (শিক্ষা) ও হাছান মাহমুদ (তথ্য)।

১৯ প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ১৫ জনই এবার প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় আসছেন। আর একজন সর্বশেষ মন্ত্রিসভায় না থাকলেও আওয়ামী লীগের আমলে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

এঁরা হলেন, কামাল আহমেদ মজুমদার (শিল্প), ইমরান আহমেদ (প্রবাসী কল্যাণ), জাহিদ আহসান রাসেল (যুব ও ক্রীড়া), আশরাফ আলী খান খসরু (মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ), খালিদ মাহমুদ চৌধুরী (নৌ পরিবহন), জাকির হোসেন (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা), ফরহাদ হোসেন (জনপ্রশাসন), স্বপন ভট্টাচার্য (স্থানীয় সরকার), জাহিদ ফারুক (পানিসম্পদ), মো. মুরাদ হাসান (স্বাস্থ্য), শরীফ আহমেদ (সমাজকল্যাণ), কে এম খালিদ (সংস্কৃতি), এনামুর রহমান (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ), মাহবুব আলী (বিমান), শেখ মো. আবদুল্লাহ—টেকনোক্র্যাট (ধর্ম)।

মন্নুজান সুফিয়ান (শ্রম) ২০০৯ থেকে ২০১৪ মেয়াদে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

উপমন্ত্রী তিনজনই এবার প্রথমবার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন। এঁরা হলেন: হাবিবুন নাহার (পরিবেশ), এ কে এম এনামুল হক শামীম (পানিসম্পদ), মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল (শিক্ষা)।

পদোন্নতি পেলেন তাঁরা
গত মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বে পাচ্ছেন এম এ মান্নান (পরিকল্পনা), জাহিদ মালেক (স্বাস্থ্য), নুরুজ্জামান আহমেদ (সমাজকল্যাণ), বীর বাহাদুর ঊশৈ সিং (পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক), সাইফুজ্জামান চৌধুরী (ভূমি)।