শেখ হাসিনার মন্ত্রিপরিষদের শপথের সাতকাহন

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: নির্বাচনের পর চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন শেখ হাসিনা। ৭ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো আবদুল হামিদ শেখ হাসিনার শপথবাক্য পাঠ করান।

তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের ২৪ মন্ত্রীকে শপথ করান। এরপর, তিনি শপথ করান প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের।

বঙ্গভবনের দরবার হলে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মন্ত্রীরা ও তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় হচ্ছে—মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রণালয় মো. আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসাদুজ্জামান খাঁন, তথ্য মন্ত্রণালয় ড. হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয় আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ কে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এম এ মান্নান, শিল্প মন্ত্রণালয় নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় জাহিদ মালেক, খাদ্য মন্ত্রণালয় সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় টিপু মুনশি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় শ. ম. রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় মো. শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমি মন্ত্রণালয় সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রলণালয় মো. নূরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় মোস্তাফা জব্বার।

১৯ জন প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন—শিল্প মন্ত্রণালয় কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ইমরান আহমদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় মো. আশরাফ আলী খান খসরু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মন্নুজান সুফিয়ান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মো. জাকির হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মো. শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ফরহাদ হোসেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় স্বপন ভট্টাচার্য, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জাহিদ ফারুক, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় মো. মুরাদ হাসান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় শরীফ আহমেদ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় কে এম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ডা. মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় মো. মাহবুব আলী এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

তিনজন উপমন্ত্রী হচ্ছেন—পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় হাবিবুন নাহার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ কে এম এনামুল হক শামীম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

বঙ্গভবনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন, যারা ছিলেন না
বঙ্গভবনে ঢোকার জন্য দুপুরের পর থেকেই ভিড় জমছিল। প্রায় হাজার খানেক অতিথি আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার বেশ আগেই দরবার হল পরিপূর্ণ।

তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থক বিভিন্ন পেশাজীবী এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের সংখ্যাই বেশি। আর ছিলেন সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। খবর বিবিসির।

আওয়ামী লীগের যে সিনিয়র নেতারা এবার মন্ত্রিসভায় ডাক পাননি, তাদের অনেককেই দেখা গেছে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। সামনের দিকের কাতারেই বসেছিলেন সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী। ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এ এম এম মুহিত।

তবে তাদের অনেকেই ছিলেন বেশ গুরুগম্ভীর।

নতুন সংসদে যিনি বিরোধী দলীয় নেতা হতে চলেছেন, সেই সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদকে অনুষ্ঠান দেখা যায় নি। বলা হচ্ছে তিনি অসুস্থ। তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদও গরহাজির ছিলেন। চোখে পড়েনি জাতীয় পার্টির কোন প্রথম সারির নেতাকে। দেখা যায়নি বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের কোন নেতাকেও।

একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা। ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং বিকল্পধারার নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী।

মহাজোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাম্যাবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়া এবং জাসদের শিরিন আখতারকে দেখা গেছে। তবে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেখা যায়নি অনুষ্ঠানে।

মন্ত্রিসভায় যারা শপথ নিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই নতুন এবং অপেক্ষাকৃতভাবে বয়সে তরুণ। তাদের অনেকেই ছিলেন উৎফুল্ল।

নবীন মন্ত্রীদের অনেকে সামনের কাতারে বসে থাকা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, তাদের আশীর্বাদ চান।

সাহসী পদক্ষেপ
সাবেক প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন একটা মন্ত্রিসভায় এত বেশি সংখ্যায় নবীন এবং তরুণদের জায়গা করে দেয়া, সেটা খুবই সাহসী একটা পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই সাহসী একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে তারা কাজ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

মন্ত্রিসভায় কেন মহাজোটের কোন শরিকদল থেকে কাউকে নেয়া হয়নি, সে প্রশ্ন উঠছিল রবিবার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইঙ্গিত দিলেন, মন্ত্রিসভায় তাদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা এখনো আছে।

মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত ছিল তার কথায়, “এখন হয়তো শরিকদের কেউ মন্ত্রিসভায় নেই, কিন্তু ভবিষ্যতে যে হবে না তা তো বলা যায় না।” তিনি মনে করেন, নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম এবং শেষ কাজ হবে দলের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা।

আওয়ামী লীগের প্রথম সারির ডাকসাইটে নেতারা যে মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি, সেটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে রাজী নন ওবায়দুল কাদের। তিনি এটিকে দেখছেন, নতুন করে দায়িত্ব বন্টন হিসেবে।

“কাউকে সরিয়ে দেয়া হয়নি বা বাদ দেয়া হয়নি। তারা দলের জন্য কাজ করবেন। দল গোছানোর কাজ করবেন।”

তিনি আরও বলছেন, সরকার এবং দল যেন দুটি আলাদা সত্তা বজায় রেখে চলে, সেটাও হয়তো কাজ করেছে এরকম একটি মন্ত্রিসভা গঠনের পেছনে।

মন্ত্রিসভায় শরিকদের না রাখার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে
সদ্য বিদায়ী সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, মন্ত্রিসভার আকার ছোট হওয়া এবং ১৪ দলের কোনও নেতাকে মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

সোমবার (৭ জানুয়ারি) সচিবালয়ে শেষ কর্মদিবসে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘কথা ছিল আন্দোলন, নির্বাচন আর সরকার নিয়ে। কিন্তু শরিকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। ব্যাখ্যাও হয়তো চাওয়া হতে পারে।’

শরিকরা কেন মন্ত্রিসভায় নেই সেই ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও কোনও দাবি থাকবে না বলে উল্লেখ করেন মেনন। রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘১৪ দলের সমন্বয়কের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে, কেন মন্ত্রিসভায় রাখা হলো না।’

মন্ত্রিসভার আকার শিগগিরই বড় করা হলে ১৪ দলের শরিকদের রাখা হবে কিনা জানেত চাইলে মেনন বলেন, ‘সেটা তো অপমান করা। আমার মনে হয় এক দেড় বছরের মধ্যে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হবে না।’

বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাশেদ খান মেনন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘নতুনরা ভালো করবেন।’

আশরাফ সৌভাগ্যবান, বিতর্কিত সংসদে শপথ নিতে হয়নি
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সৈয়দ আশরাফকে সৌভাগ্যবান রাজনীতিক বলেছেন কেননা তিনি এই বিতর্কিত সংসদে শপথ গ্রহণ করেননি। তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সৈয়দ আশরাফের জন্য জান্নাত কামনা করেন।

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সৈয়দ আশরাফকে সৌভাগ্যবান রাজনীতিক বলেছেন কেননা তিনি এই বিতর্কিত সংসদে শপথ গ্রহণ করেননি। তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সৈয়দ আশরাফের জন্য জান্নাত কামনা করেন।

গতকাল রবিবার নাগরিক টিভিতে এক আলোচনায় তিনি একথা বলেন।

মন্ত্রিপরিষদের চমক সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই চমক দিয়ে আসছেন। তিনি কথা দিয়েছিলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিএনপি’র কোনো নেতা কর্মীকে গ্রেপ্তার করবেন না। মন্ত্রিপরিষদ ছোট করা হবে। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি। সবই প্রধানমন্ত্রীর চমক।

তিনি বলেন, শুধু স্বাধীনতার পরে না, পাকিস্তান আমলেও কখনো মন্ত্রীদের শপথ নেয়ার আগে জানা যেতো না কে কে মন্ত্রী হবেন। এবার প্রথা ভেঙে শপথ নেবার একদিন আগেই মন্ত্রীদের নাম ও মন্ত্রণালয় ঘোষণা করা হলো।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, মতিয়া চৌধুরী, মো. নাসিম, নূরুল ইসলাম নাহিদ, শরিক দলের হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খাঁন মেননদের মতো বিজ্ঞ রাজনীতিকদের বাদ দেয়াটা একটি প্রথা ভাঙা মন্ত্রিপরিষদ যেটা রাজনীতিতে কাম্য না।

তিনি আরো জানান, তারুণ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই এবং আমিও তারুণ্যের পক্ষে। দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে হয়তো প্রধানমন্ত্রী তারুণ্য নির্ভর মন্ত্রিসভা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী অনেক দিন ধরেই বলছেন তিনি অবসর নিতে চান। এবং একদিন তো নিতেই হবে।

সিনিয়র নেতাদের হয়তো একটু খারাপ লাগবে কিন্তু সময় তো ঠিকই একদিন থামিয়ে দেবে। একটি সার্বোভৌম দেশকে আইনের শাসনের দিকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা তরুণদেরকেই নিতে হবে।