আরাকান আর্মি-আরসা হামলায় বাংলাদেশকে দোষারোপ, মায়ানমারকে কড়া সতর্কবার্তা

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: বাংলাদেশে আরাকান আর্মির এবং আরসার তিনটি ঘাটি রয়েছে বলে মায়ানমার সরকারের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে যেসব খবর প্রকাশ করা হয়েছে -তার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এক বিবৃতিতে দেশটি জানিয়েছে, ওই অভিযোগ পুরোপরি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। দেশটির সতর্কতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশের কোথাও বসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো সম্ভব নয়। খবর বিবিসির

‘কারণ প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য কাউকে সুযোগ দেয় না বর্তমান সরকার।’

গত ৪ঠা জানুয়ারি মায়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে রাখাইনে চারটি পুলিশ পোস্টে বৌদ্ধ বিদ্রোহীদের হামলায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সাত সদস্য নিহত হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলীয় এ রাজ্যটিতে গত ডিসেম্বর থেকেই আরাকান আর্মি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ জোরদার হতে থাকলে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়।

তবে সোমবার মায়ানমারের প্রেসিডেন্টের অফিসের মুখপাত্র যাউ হতাই একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বিছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি এবং আরসা সন্ত্রাসীগ্রুপগুলো বাংলাদেশে ঘাটি গেড়ে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।’

ওই বক্তব্যের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ বলছে, ‘আমরা জোরালোভাবে বলছি যে, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি সন্ত্রাসী গ্রুপের উপস্থিতি নেই অথবা এ ধরনের কোনো গ্রুপকে বাংলাদেশ কখনো আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না।’

‘দুই প্রতিবেশীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে, এরকম যেকোনো ঘটনা এড়াতে সীমান্ত রক্ষীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা সতর্ক রয়েছে।’

মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস প্রতিরোধে প্রতিবেশী অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যৌথ অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে একই ধরনের সহায়তার প্রস্তাব করা হয়েছিল মায়ানমার সরকারকে। সীমান্ত এলাকায় দাবি করা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের এলাকায় যৌথ অভিযান চালানোর জন্যও প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘কিন্তু দুঃখজনকভাবে মায়ানমারের পক্ষ থেকে ততটা আগ্রহ দেখা যায়নি। এমনকি অভিযোগ করা সন্ত্রাসী ঘাটির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে মায়ানমার’ বিবৃতিতে বলা হয়।

এ ধরনের অভিযোগের কড়া প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ বলছে, মায়ানমারের বর্তমান সহিংসতা দেশটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণেই ঘটছে। তার নিজের রাজনৈতিক সমস্যার সঙ্গে বাংলাদেশকে না জড়ানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।

এদিকে এএফপি’র খবরে বলা হয়, মায়ানমারের নিরাপত্তারক্ষী ও জাতিগত রাখাইন বিদ্রোহীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এতে মায়ানমার-বাংলাদেশী সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থানকারী কয়েক হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গ্রাস করছে আতঙ্ক।

মায়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট নৃশংস অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। এর ফলে বাধ্য হয়ে কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। কিন্তু সীমান্তে যারা কঠিন বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করছেন তারা না চাইছেন বাংলাদেশের এসব ক্যাম্পে আসতে, তেমনি দেশেও ফিরতে চাইছেন না। এখন তারা মায়ানমারের সেনা সদস্য ও আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইয়ের মধ্যে পড়েছেন। আরাকান আর্মি বিদ্রোহীরা চাইছে, রাখাইনে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের জন্য রাখাইনে অধিকতর শায়ত্ত্বশাসন।

জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের দলনেতা দিল মোহাম্মদ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, মায়ানমারে সরকারি সেনা ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। পরিস্থিতি প্রচ- উত্তেজনাকর। এতে নিরাপত্তার যে বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং প্রতিদিন যে গুলি বিনিময় হচ্ছে তাতে ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

এএফপি জানায়, সম্প্রতি আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে মায়ানমারে ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এরপরই গত সপ্তাহে সীমান্তে নিরাপত্তা ক্যাম্প বসিয়েছে সেনাবাহিনী। ব্যবহার করছে বাঙ্কার। সীমান্ত বেড়া বরাবর সরাসরি নেয়া হয়েছে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। নোম্যান্স ল্যান্ডের সংকীর্ণ স্থানে অবস্থান করছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা মুসলিম। তাদের দিকেও চোখ রাখছে সেনারা।

শরণার্থী নেতা নূর আলম বলেছেন, রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের ওপাড়ে ঘন ঘন শোনা যায় গুলির শব্দ। তিনি বলেন, প্রতি রাতেই এই শব্দ বেশি কাছে থেকে কাছে মনে হয়। মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা আমাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি নতুন ১০টি পোস্ট স্থাপন করেছে। এটা আমাদের জন্য খুবই ভীতিকর।

বুধবার এক বিবৃতিতে জাতিসংঘ ওই এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশী একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তারা সীমান্তের উত্তেজনা সম্পর্কে অবহিত। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেছেন, কি করতে হবে তা নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবো।

প্রসঙ্গত, দশকের পর দশক ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের হাতে নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা মুসলিমরা। তাদের বসবাস পশ্চিমের রাখাইন রাজ্যে। এটি খুব বেশি অনুন্নত রাজ্য। এখানে রয়েছে জাতিগত ও ধর্মীয় বিদ্বেষ তীব্র আকারে।