সংলাপের সাতকাহন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংলাপ কতটুকু ফলপ্রসূ

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারো সংলাপের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের কারণে ভোটের ফলাফল বর্জন করে গত ৮ জানুয়ারি পুনঃনির্বাচনের দাবিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জাতীয় সংলাপের কর্মসূচি ঘোষণা করার পর তা আলোচনায় আসে।

বিতর্কিত নির্বাচনের পর পুনঃনির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের পরবর্তী তিন কমৃসূচির মধ্যে জাতীয় সংলাপ অন্যতম। ওইদিন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকের পর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

এরপর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। ১২ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের কারণেই বিএনপি এখন নানা অভিযোগ করছে। কিন্তু এসব ধোপে টিকবে না। নতুন করে নির্বাচন নিয়ে সংলাপের দাবি এখন হাস্যকর।

শনিবার তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন তথাকথিত সংলাপ নামের ভাওতাবাজির কথা বলছেন।

ড. হাছান বলেন, ‘বিএনপি ও তাদের সহযোগী কিছু নেতার চিকিৎসা প্রয়োজন। তারা বহুল প্রশংসিত নির্বাচনে হেরে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে সংলাপের কথা বলছেন। তাদের মানসিক চিকিৎসা বেশি দরকার।’

এদিকে রবিবার সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচনের আগে যেসব দল এবং জোট সংলাপে অংশ নিয়েছে, তাদের ফের গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো সংলাপে বসবেন বলে জানিয়েছেন । এদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা এবং এর আশেপাশের জেলা, উপজেলা, পৌরসভা পর্যায়ের দলীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রদের সঙ্গে যৌথ সভার প্রাককালে তিনি এ কথা জানান।

এর প্রতিক্রিয়ায়

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ নিয়ে আলোচনা চলছে দেশজুড়ে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নির্বাচনের আগে আগে সংলাপের ইতিহাস বহু পুরনো। এর বাইরেও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ হয়েছে। ইতিহাস থেকে তুলে ধরা হলো সেই ধরনের কিছু সংলাপের ঘটনা।

এরশাদের সংলাপ রবিবার বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ফলপ্রসূ না হলে বার বার সংলাপ করে কোনো লাভ নেই। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সুফল বয়ে আনেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, সংলাপের ফলাফল তো আমরা দেখেছি। কোনো প্রতিফলন তো দূরের কথা, সে সংলাপের কারণে দেশের গণতন্ত্র বা নির্বাচনী প্রক্রিয়াতে কোনো ধরনের সুফল বয়ে এনেছে, এটা তো কেউ দেখতে পায়নি।

সংলাপের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে একটা সংবিধান আছে, সংবিধানে মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের কথা বলা হয়েছে, এগুলো থেকে ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংলাপ করে কিছু অর্জন করা যাবে না।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংলাপের ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, ১৯৮৪ সালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে আহ্বান জানিয়েছিলেন এইচ এম এরশাদ। বঙ্গভবনে হওয়া ওই সংলাপে বেগম খালেদা জিয়ার সাত দলের পক্ষ থেকে ৩৩ দফা দাবিনামা দেওয়া হয়েছিল। ওই সংলাপের পরপরই বঙ্গভবনে জামায়াতের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এরশাদ। আবার সংলাপে বসেন শেখ হাসিনার ১৫ দলের নেতাদের সঙ্গেও।

রাজনীতিতে ওই সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ কোন রেখাপাত করেনি।

৯৪ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি
১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে। ওই সময় সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিরসনের চেষ্টায় বাংলাদেশে আসেন তৎকালীন কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন।

শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের তোলা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের মধ্যে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা না করেই ফিরে যান স্যার নিনিয়ান।

জিমি কার্টারের সংলাপ
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি সংলাপে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অবশ্য এ সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

২০০৬: আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংলাপ
২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সংলাপে বসেন। সেসময় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সংলাপ হয়েছিল নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ দফা তুলে ধরা হয়। কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে ছয় দফা বৈঠক করেও মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। অবশেষে দুজনই তাদের দলের শীর্ষনেত্রীর কাঁধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সংলাপ সম্পন্ন করেন।

২০১৪: মধ্যস্থতায় তারানকো
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসে বিএনপি। সংকট নিরসনে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকা সফর করেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে তারানকোর সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের প্রথম বৈঠকটি হয় ১০ ও ১১ ডিসেম্বর। তৃতীয় বৈঠক হয় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে।

সংলাপটিও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা ফলপ্রসূ হয়নি।