আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে ফের কৌশলী সরকার, সংলাপের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ফের কৌশলী হয়ে উঠেছে সরকার। নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির অভিযোগ তদন্তের জন্য যখন আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়ছে তখন নতুন করে সংলাপের কথা বলছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আবারও সংলাপে বসার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রবিবার সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচনের আগে যেসব দল এবং জোট সংলাপে অংশ নিয়েছে, তাদের ফের গণভবনে ডেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারো সংলাপে বসবেন বলে জানিয়েছেন।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সংলাপের প্রস্তাবে প্রধান বিরোধী দলগুলো কতটুকু সাড়া দিবে তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

সংলাপে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কী নিয়ে এই সংলাপ তা জানতে চেয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা গণফোরামের নেতা ড. কামাল হোসেন।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ডাকবেন সংলাপে, একটু তো ইঙ্গিত থাকবে কী কী বিষয় নিয়ে এই সংলাপ। যদি সেটা আমাদের কাছে বিবেচনাযোগ্য হয়, তখন আমরা কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেব এব্যাপারে।’

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সংলাপের আমন্ত্রণ এলে তাতে সাড়া দেবেন কীনা, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমি একে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করবো। কিন্তু সেটা জানতে হবে কী প্রেক্ষাপটে এটার আয়োজন করা হচ্ছে, কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’

উল্লেখ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, শনিবার দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এই সংলাপের কথা বলেন। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে যেসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ হয়েছিল তাদের সঙ্গে আবারও সংলাপ হবে।

নির্বাচনের আগে ঐ সংলাপে অংশ নিয়েছিল বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি, যুক্তফ্রন্ট সহ আরও বহু দল। ঐ সংলাপের সময়েই বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা ঘোষণা করে।

কেন সংলাপ
নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর কেন এরকম একটি সংলাপের উদ্যোগ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?

বিবিসির বাংলার মিজানুর রহমান খানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সরকারের একজন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চান সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে। সেই লক্ষ্যেই তিনি কিন্তু ৭০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন নির্বাচনের আগে। তখন শুধু রাজনীতি নয়, দেশ গঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যে তাদের ভুলে যাননি, তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার আগ্রহ যে তাঁর আছে, সেই বিষয়টাই এখানে পরিস্ফুটিত হয়েছে।’

কী কথা হতে পারে সংলাপে
যদি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে যোগ দেন, সেখানে কী জানাবেন তাকে? এ প্রশ্নের উত্তরে ড. কামাল হোসেন বলেন, সেখানে অবশ্যই নির্বাচনের ব্যাপারে কথা হবে।

তিনি বলেন, ‘সংলাপের প্রস্তাব আসলে প্রথমে আমরা জানতে চাইবো যে কী বিষয় নিয়ে হবে। তারপর আমাদের কমিটির বৈঠক হবে। ওখানে বসে আমরা আমরা আলোচনা করে সুচিন্তিত উত্তর দেব।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, সংলাপে যোগ দেয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্তটি তারা প্রথম নিজ দল গণফোরাম থেকেই নেবেন। বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগের অবস্থার সঙ্গে এখনকার অবস্থার একটা পার্থক্য রয়েছে। কাজেই যে কোনো প্রস্তাবের ব্যাপারে এখন নতুন করে চিন্তা করতে হবে।

জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের চেয়ে এখন তিনি গণফোরামকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কীনা, এ প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এটা তো সবসময় দিতে হয়। নিজের পার্টিকে গুরুত্ব দিয়ে তার পর তো ঐক্য ফ্রন্ট।’

যদি বিএনপি এই সংলাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন কী গণফোরাম সংলাপে যাবে? এর উত্তরে ড. কামাল হোসেন বলেন, এটা একদম স্পেকুলেট করা উচিৎ নয়। এটা যখন ঘটবে তখন আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে রবিবার বিকেলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফলপ্রসূ না হলে বার বার সংলাপ করে কোনো লাভ নেই। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো সুফল বয়ে আনেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, সংলাপের ফলাফল তো আমরা দেখেছি। কোনো প্রতিফলন তো দূরের কথা, সে সংলাপের কারণে দেশের গণতন্ত্র বা নির্বাচনী প্রক্রিয়াতে কোনো ধরনের সুফল বয়ে এনেছে, এটা তো কেউ দেখতে পায়নি।

সংলাপের প্রয়োজন নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে একটা সংবিধান আছে, সংবিধানে মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের কথা বলা হয়েছে, এগুলো থেকে ব্যত্যয় ঘটিয়ে সংলাপ করে কিছু অর্জন করা যাবে না।

রাজনৈতিক সংলাপের ইতিহাস থেকে যতদূর জানা যায়, ১৯৮৪ সালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে আহ্বান জানিয়েছিলেন এইচ এম এরশাদ। বঙ্গভবনে হওয়া ওই সংলাপে বেগম খালেদা জিয়ার সাত দলের পক্ষ থেকে ৩৩ দফা দাবিনামা দেওয়া হয়েছিল। ওই সংলাপের পরপরই বঙ্গভবনে জামায়াতের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এরশাদ। আবার সংলাপে বসেন শেখ হাসিনার ১৫ দলের নেতাদের সঙ্গেও।

রাজনীতিতে ওই সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ কোন রেখাপাত করেনি।

৯৪ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি
১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করে। ওই সময় সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিরসনের চেষ্টায় বাংলাদেশে আসেন তৎকালীন কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন।

শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের তোলা পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের মধ্যে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা না করেই ফিরে যান স্যার নিনিয়ান।

জিমি কার্টারের সংলাপ
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি সংলাপে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অবশ্য এ সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

২০০৬: আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংলাপ
২০০৬ সালের অক্টোবরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল সংলাপে বসেন। সেসময় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সংলাপ হয়েছিল নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ দফা তুলে ধরা হয়। কিন্তু এত লম্বা সময় ধরে ছয় দফা বৈঠক করেও মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। অবশেষে দুজনই তাদের দলের শীর্ষনেত্রীর কাঁধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সংলাপ সম্পন্ন করেন।

২০১৪: মধ্যস্থতায় তারানকো
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসে বিএনপি। সংকট নিরসনে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকা সফর করেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে তারানকোর সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলের প্রথম বৈঠকটি হয় ১০ ও ১১ ডিসেম্বর। তৃতীয় বৈঠক হয় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে।

সংলাপটিও রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তা ফলপ্রসূ হয়নি।