ইসলামী দলগুলোর অনৈক্যে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে সেক্যুলার পন্থীরা

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: অনৈক্য, দলাদলি, মামলার ভয় ও পারিপার্শ্বিক নানা কারণে অনেকটাই চুপসে গেছে ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলো। আর এ কারণে বাংলাদেশে সেক্যুলার পন্থীরা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

দেশে বেশ কয়েকটি দলের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, ইসলামপন্থী দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কড়া নজরদারি ও সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পারিপার্শ্বিক চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠের কার্যক্রম গুটিয়ে তারা এখন অনেকটাই ঘরবন্দী হয়ে পড়েছে।

দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাতটি ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠন হলো জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।

এর মধ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে নানা ফৌজদারি মামলায় কাবু হয়ে পড়েছে জামায়াত।

দলটির একাধিক সূত্র বলছে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে হাজার হাজার ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অনেকে কারাগারে, বাকিরা গা ঢাকা দিয়ে চলছেন। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরসহ অধিকাংশ জেলায় প্রকাশ্যে দলীয় কার্যালয় বন্ধ রয়েছে।

এ অবস্থায় গোপনে ও নানা কৌশল অবলম্বন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানান ঢাকা মহানগর জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে ইতিমধ্যে ৫জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। আরো কয়েকজন কারাবন্দি রয়েছেন, তাদেরও বিচার কাজ চলছে। বাইরে থেকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ ঢাকা মহানগরের নেতারাও গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সহিংসতা ও নাশকতার মামলায় আসামি হয়ে কয়েক দফা কারাবাসের পর আত্মগোপনে রয়েছেন।

জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা দাবি করেন, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, জামায়াত কখনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে না। এখন পরিস্থিতির আলোকে সতর্কতার সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে, এটুকুই।

প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই কয়েক বছর ধরে। ২০১৫ সালে সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর গ্রেপ্তারের দাবিতে দুই শুক্রবার লালবাগে মিছিল করা ছাড়া এরপর ইসলামী ঐক্যজোটের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি ছিল না।

দলটির সহকারী মহাসচিব আহলুল্লাহ ওয়াছেল বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে অনেকটা ফোনে ফোনে। জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগটা রক্ষা করছি।’

দলটির অপর একটি সূত্র জানায়, ইসলামী ঐক্যজোটে সম্প্রতি অনৈক্য দেখা দিয়েছে। আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত ও তার ভগ্নিপতি সাখাওয়াত হোসাইনের সঙ্গে মতবিরোধ চলছে দলের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লার সঙ্গে।

এ বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ইসলামী পরিষদ নামে একটি নতুন সংগঠন করেন হাসানাত। সংগঠনটির প্রথম অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে প্রধান অতিথি করা হয়।

ইসলামী ঐক্যজোট ১৭ বছর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের বিএনপির জোট ছাড়ে তারা। এরপর আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হলেও প্রকাশ্যে কেউ বলতে নারাজ।

চরমোনাইপীর সৈয়দ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনে প্রকাশ্যে দলাদলি নেই। তবে যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানসহ একটি অংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃত্ব খাটান বলে অভিযোগ আছে। এ অংশকে ডিঙিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা জানিয়েছেন।

গাজী আতাউর রহমান দাবি করেন, ‘কর্তৃত্ব খাটানোর অভিযোগ ঠিক না। তবে এটা ঠিক যে আমি ছাত্রজীবন থেকেই দলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছি।’

এবার একাদশ নির্বাচনেও এই সংগঠনটির ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। তারা ২৯৮ আসনে প্রার্থী দিলেও কোনো আসনে জয়লাভ করেনি। তবে নির্বাচনি মাঠে আওয়ামী লীগ অন্য সব দলকে প্রতিপক্ষ ভাবলেও এই দলটিকে সহযোগী ভেবেছে বলে দৃশ্যমান হয়েছে। কোথাও এ দলের নেতাকর্মী ক্ষমতাসীনদের আক্রমণে শিকার হয়নি।

মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। হাফেজ্জী হুজুরের বড় ছেলে আহমদুল্লাহ আশরাফ খেলাফত আন্দোলনের আমির ছিলেন। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ায় পরে ভোটাভুটিতে তাঁই ভাই আতাউল্লাহ দলের আমির নির্বাচিত হন। আর জাফরুল্লাহ খান পুনরায় মহাসচিব হন। যদিও আহমদুল্লাহ আশরাফের বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ মিয়াজি মহাসচিব হতে চেয়েছিলেন। তা হতে না পেরে ওই সময় তিনি নতুন এ কমিটির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান এবং নিজের বাবাকে দলের আমির বলে দাবি করেন। এসব দলাদলিতে দলীয় কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়ে।

খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মুজিবুর রহমান হামিদী দাবি করেন, কমিটি নিয়ে বিরোধের মীমাংসা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক কাজ চলছে। তবে প্রশাসনের বাধা ও হয়রানির কারণে মিছিল-মিটিং করা যাচ্ছে না। ঘরোয়া বৈঠকের কথা শুনলেও পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে উপস্থিত হন।’

শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভেঙে যায়। দলটির অবস্থা এখন অনেকটাই ছন্নছাড়া বলে একাধিক নেতা মন্তব্য করেছেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে দলের অগোচরে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব হুমায়ুন কবির। এরপর তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে শায়খুল হাদিসের এক ছেলে মাহফুজুল হককে মহাসচিব করা হয়। এ নিয়ে বিবাদে দলটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগ দেন।

এখন খেলাফত মজলিসের আমির সিলেটের মাওলানা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে দলের মহাসচিবসহ মূলধারার নেতাদের নানা বিষয়ে বিরোধ চলছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো ছাড়া দলটির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম নেই।

এ দেশে ধর্মভিত্তিক সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির নায়েবে আমির নূর হোসাইন কাসেমী ও মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাছের মধ্যে বিরোধ চলছে। সম্প্রতি আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক এবং ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা জুনায়েদ আল হাবিবকে এ দলে যোগদান করিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পর থেকে এ বিরোধের সৃষ্টি বলে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে।

অবশ্য মুফতি ওয়াক্কাছ এ বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসব বাজে কথা। লোকজন খালি খালি কথা ওঠায়।’ তিনি সাংগঠনিক স্থবিরতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এখন তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সময় হলে জাগবে। আমরা নভেম্বরে কাউন্সিল করব।’

জমিয়তের প্রচার সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, এটা ঠিক যে ২০১৩ সালের ৫ মের আগ পর্যন্ত রাজপথে ইসলামি দলগুলোর যে ভূমিকা ছিল, এখন আর তা নেই। নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নানা প্রশাসনিক চাপ আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

রাতারাতি গড়ে ওঠা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে গেছে। ২০১২ সালে গঠিত এ সংগঠনটি পরের বছর ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করে দেশ-বিদেশে হইচই ফেলে দিয়েছিল। এখন এটি অনেকটাই কাগুজে সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নানামুখী চাপ, বিভক্তি, হতাশায় সংগঠনটির নেতারা চুপ মেরে গেছেন। এখন মাঝেমধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেন সংগঠনটির নেতারা।

তবে এই সংগঠনটির ভূমিকাও বেশ নাটকীয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ সনদ দাওরায়ে হাদিসকে (তাকমিল) সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমান স্বীকৃতি দেয়ায় রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ আয়োজিত ‘শুকরানা মাহফিলে’ প্রধানমন্ত্রীকে অতিথি হিসেবে পান। সেখানে অনেক নেতাকেই ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ভূমিকা ভুলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী-এমপিদের ভুয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। নির্বাচনেও তাদের ভুমিকা ছিল অনেকটাই রহস্যাবৃত।

এদিকে কয়েক বছর থেকে রাজনীতিতে চলছে নানা মেরুকরণ। কখনো ক্ষমতাসীনরা, কখনো বিরোধীরা চাপে পড়ছে। তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর রাজনীতির দৃশ্যপটে অনেকটাই পরির্তন ঘটে। বলা যায়, রাজনীতির একক নিয়ন্ত্রণে যায় ক্ষমতাসীনরাও।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের সেই নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত হয়েছে।

যদিও দু’পক্ষের লড়াই এখনো চলছে। কখনো সেটা মৃদু উত্তেজনার রূপ নিচ্ছে। এটা মূলত ক্ষমতার লড়াই। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়- এই লড়াইয়ে ক্ষমতাসীনরাই সুবিধাজনক অবস্থানে।

এটা এ জন্যই যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে ক্ষমতাসীনরা আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে যে ধরনের চাপে পড়েছিল সেটা অনেকটাই সামলিয়ে উঠতে পারে খুবই সহজে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর একইভাবে তারা পরিস্থিতি সামলিয়ে উঠতে পেরেছে।

এছাড়া সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায়, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কূটনৈতিক সাফল্য ক্ষেত্রেও তারা অনেকটাই সফল হয়েছে বলা যায়। এতে নিশ্চিন্তভাবে ভিশন-২০২১ অনুযায়ী মধ্যমআয়ের দেশ এবং ভিশন-২০৪১ অনুযায়ী উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে তারা।

তবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পাশাপাশি চলছে এক ধরনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব। সেটা একদিকে সেক্যুলারিজম,অন্যদিকে ইসলাম। দ্বন্দ্বটা বেশ শক্তিশালীই বলা চলে। আপাতত দৃষ্টিতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বটা কেবল অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বলে মনে হলেও মূলতঃ এটা একটা বিশ্বায়নেরও দ্বন্দ্ব।

কেননা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীব্যাপী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনের যে হিড়িক পড়েছিল তার ধাক্কা এ উপমহাদেশেও লেগেছিল। কিন্তু সেই ধাক্কায় প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয়ে পৃথক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়- ধর্মীয় চেতনায় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে ইন্ডিয়া রাষ্ট্র গঠন হয়।

৭১ বছরে ভারত আদর্শিক চেতনা হিন্দুত্ববাদ থেকে বের হতে না পারলেও কিছুটা সেক্যুলারিজমের চরিত্রে শক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিশ্বায়ন মূল্যায়নে অনেক পেছনে।

তবে অবস্থাদৃষ্টে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম চরিত্র ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। আর ক্ষমতাসীনরাও সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে ইউরোপ-অ্যামেরিকাসহ দাতা গোষ্ঠীর আস্থা অর্জনে আদায়ে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া মানবাধিকার ও গণতন্ত্র বিষয়ে শত ব্যর্থতা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের সেক্যুলার চরিত্র ক্ষমতাসীনদের কাছে অধিকতর নিরাপদ বলে বিশ্বস্যেকুলারবাদীদের কাছে প্রতীয়মান হওয়ায় জোরালোভাবেই সমর্থন দিচ্ছে।

এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে মানবাধিকার তথা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ ব্যাপকভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও এ নিয়ে বিশ্বনেতারা প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।

এমন কী মার্কিন কংগ্রেসের টম ল্যান্টোস মানবাধিকার কমিশনের শুনানিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ করে, শ্রমিক নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানি, বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড ও গুম, বিডিআর বিদ্রোহসহ নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ফলে সংগঠনটি বাংলাদেশের ওপর নিয়মিত নজর রাখতে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থার উচ্চপর্যায়ের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

এদিক থেকে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র পৃথক কোনো বিষয় না হলেও পৃথিবীব্যাপী ক্ষমতাসীনরা ভিন্নভাবে দেখছেন। তবে গণতন্ত্র মানে নিছক নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রগঠনের-প্রক্রিয়া ও ভিত্তি নির্মাণের গোড়া থেকেই জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় নিশ্চিত করা। জনগণের সেই ইচ্ছা ও অভিপ্রায় রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা না গেলে তাকে কোনোভাবেই গণতন্ত্র বলা যায় না।

ব্যক্তির যে-মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়, প্রাণ, পরিবেশ ও জীবিকার যে-নিশ্চয়তা বিধান করা ছাড়া রাষ্ট্র নিজের ন্যায্যতা লাভ করতে পারে না এবং যেসব নাগরিক অধিকার সংসদের কোনো আইন, বিচারবিভাগীয় রায় বা নির্বাহী আদেশে রহিত করা যায় না- সেই সব অলঙ্ঘনীয় অধিকার অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি।

মানুষ ও নাগরিক হিসেবে এসব অধিকার ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করেছে এবং সেই সব অধিকারের সার্বজনীনতা নানান আন্তর্জাতিক ঘোষণা,সনদ ও চুক্তির মধ্য দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই স্বীকৃত অধিকারগুলো কী এদেশের নাগরিকরা ভোগ করতে পারছেন?

তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যে শুধু এই সরকারের আমলেই ঘটছে তা বলার সুযোগ নেই। অতীতে যেমন রক্ষিবাহিনী গঠনে রাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সৃষ্টি করেছিল, তেমনি বিগত বিএনপি সরকার র‌্যাব-চিতা ও কোবরার নামে এলিট ফোর্স করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথকে সুপ্রশস্ত করে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দলই এর দায় এড়াতে পারে না। যদিও ক্ষমতায় গেলে এবং ক্ষমতার বাইরে থাকলে বক্তব্যের সুরে ভিন্ন।

ফলে সহজেই প্রতীয়মান, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার, যা সংবিধানের ৩৭,৩৮ ও ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত। এতে প্রতিবন্ধকতা মানে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব। আর সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ যেখানে থাকে না,সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিক ঘটনা। মানবাধিকারের সুরক্ষার জন্য যেমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ অত্যাবশ্যক,তেমনি গণতন্ত্র সফলের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকারের এত ব্যর্থতা সত্ত্বেও কূটনীতিকভাবে সরকার বেশ সফল। মূলত সেক্যুলারিজমের পক্ষেই বিশ্ব সম্প্রদায় সমর্থন জুগিয়ে চলেছে।

দেশের বর্তমান এই পরিস্থিতির জন্য প্রধান বিরোধীদের ভূমিকাও কম দায়ী নয়।

কয়েক বছরে দফায় দফায় তেল গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ জনঅধিকার সংশ্লিষ্ট শত ইস্যুতে শক্ত আন্দোলন গড়তে না পারা, সমাজ বিপ্লবে ত্যাগী মানসিকতার অভাব,সর্বোপরি রাজনীতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতায় পরিস্থিতিকে ক্ষমতাসীনদের অনুকূলে নিয়ে গেছে।

সবচেয়ে বড় যে কারণটি বিরোধীদের পিছিয়েছে বলে ধরা হয়- রাজনীতিতে অধিকতর ইসলামিজমের প্রাধান্য। আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভেও অনেকটাই ব্যর্থ বলা হয়। যদিও বিরোধীরা এটাকে প্রতিপক্ষের অপপ্রচার বলছেন।

এছাড়া ইসলামিজম সম্পর্কেও বিএনপির অবস্থান অনেকটাই কমপ্লিকেটেড। কখনো তারা ইসলামের শক্ত ভক্ত,আবার কখনো মধ্যমপন্থী, আবার কখনো সেক্যুলার হিসেবে নিজেদের প্রমাণের চেষ্টা করেন। এতে বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির এখনো অবস্থান অস্পষ্টতাই পরিলক্ষিত।

বিগত ২০১৩ সালের হেফাজতের আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে মাঠে না নামা,আবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়েও এটাকে নিছক নির্বাচনী জোট বলা।

বিএনপিকে যেভাবেই মূল্যায়ন করা হোক না কেন,এটা সত্য যে, রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমানে বড় ধরনের আন্দোলন করার শক্তি-সামর্থ তাদের কতটা রয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

এখানে অতীতের সব আন্দোলন সংগ্রাম-বিপ্লব থেকে বলা যায়- ইসলামিজমে কখনো সমাজ বিপ্লবের আগে রাজনৈতিক বিপ্লব সফল হয়নি। আর কখনো দৈব্যচয়িতভাবে রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেলেও সেটা বেশিদিন টিকেনি। যেমনটি আরব বসন্তের ঢেউয়ে মিশরের বিপ্লব এক বছরও টিকতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশেও রাতারাতি ইসলামী বিপ্লব হবে না।

অন্যদিকে ইসলামী রাজনৈতিক বিপ্লব না ঘটিয়েও সেক্যুলার আদলে রাষ্ট্রগঠনে রাজনীতিতে ইসলামিক চেতনা ধারণ সম্ভব। যেমনটি তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলার সংবিধান পরিবর্তন না করেও আব্দুল্লাহ গুল ও এরদোগান তুরস্ককে একটি মডারেট মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ফলে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়- বিরোধীরা যদি শক্ত আন্দোলন গড়তে না পারলে সহসাই কোনো পরিবর্তন সম্ভাবনা নেই। এর মধ্যে যদি দৈববশত কোনো অঘটন না ঘটে। তবে ক্ষমতাসীন যদি পরিস্থিতি সামলে পাঁচ বছর টিকে যেতে পারে তবে তাদের এই শাসন হতে পারে তুরস্কের মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের শাসনের মতো ১৫ বছর, ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মত ২৩ বছর,হতে পারে মিশরের হোসনি মোবারকের মতো ৩০ বছর কিংবা লিবিয়ার গাদ্দাফির মতো দীর্ঘ ৪১ বছর। যদিও সেটা খুব সহজ হবে না।

আর আওয়ামী শাসনকাল দীর্ঘায়িত হবার কারণটি মূলত সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সাথে সম্পৃক্ত। আর বিশ্ব সম্প্রদায়ের ধারণা এ ধরনের একটি রাষ্ট্র গঠনে ক্ষমতাসীন মহাজোটই ভালো ভুমিকা রাখতে পারছে। যদিও বাংলাদেশ পুরোপুরি সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ এই সরকার রাজনীতিতে অনেকটা কৌশলী। তাদের কাছেও সেক্যুলারিজম শতভাগ নিরাপদ বলা যায় না। কেননা, তারা সহজে ইসলামপন্থী বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে চটিয়ে কিছু করতে নারাজ। অতীতে হেফাজতে ইসলাম এবং মূর্তি ইস্যুতে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা ছিল রহস্যাবৃত।

তবে সরকার এই মেয়াদে নিরাপদে টিকে যেতে পারলে সেক্যুলারিজম যে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে সেটা বলারও সুযোগ নেই। বলা যায়, এখানে ইজমকে কাজে লাগিয়ে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে রাষ্ট্র ক্ষমতা ভোগ করাই সব’পক্ষের মূল লক্ষ্য।