নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষকদের অবস্থান পরিবর্তন, সরকারে অস্বস্থি বাড়ছে

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চন সম্পর্কে ক্রমেই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পর্যবেক্ষকরা আগের অবস্থান পরিবর্তন করে এখন বলছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তারা বড় ধরনের অনিয়মের কথা বলছেন। এতে সরকারের ভেতর নতুন করে অস্বস্থি দেখা দিয়েছে।

অ্যানালাইসিস বিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয়বার যেন তেনভাবে ক্ষমতায় এসে নানা ধরনের কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে। নির্বাচনের জালিয়াতিকে আড়াল করার জন্য কুটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন দেশের অভিনন্দন আদায়েরও চেষ্টা করছে। কিন্তু তারপরও ছিদ্রপথ দিয়ে যেন অনেক কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে হাতে থাকা জিনিষগুলোও যেন আর আওয়ামী লীগের হাতে থাকছে না। এজন্যই প্রবাদে বলে চোরের ১০ দিন আর গেরস্থের একদিন।

আজ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আওয়ামী নীতি নির্ধারক মহলে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেছে বলে জানা গেছে। এবারের নির্বাচনের আগে থেকেই দেশী বিদেশী পর্যবেক্ষকদেরকে নিয়োগ করার ব্যপারে নির্বাচন কমিশন নানা ধরনের অযাচিত বিধি নিষেধ আরোপ করে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিদ্ধ নির্বাচনী পর্যবেক্ষকসহ আমাদের দেশের অনেক পরিচিত মুখও নির্বাচন কভার করার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে পর্যবেক্ষকদেরকে মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেয়ার পর থেকে অনেকের মনেই তখন নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হবে তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।

তাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভয়াবহ জালিয়াতিকে লুকোনোর জন্য নির্বাচনের পরদিনই গণভবনে আওয়ামী লীগের দেশীয় ও বিদেশ থেকে ভাড়া করে আনা পর্যবেক্ষকদেরকে নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেই সম্মেলনে দালাল পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে স্বীকৃতিও আদায় করা হয়। সেগুলো সরকারপন্থী মিডিয়াগুলো আবার বেশ ফলাও করে প্রচারও করে। কিন্তু সব গোমর ফাঁস হয়ে গেছে এবার।

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্স সেই পর্যবেক্ষকদেরকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রচার করে যাতে পর্যবেক্ষকরা আগের অবস্থান থেকে পল্টি মারেন। তারা অবলীলায় স্বীকারও করলেন যে, আমাদেরকে ভুল বোঝানো হয়েছে, আসলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি।

বিভিন্ন মিডিয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আসা পর্যবেক্ষকেরা নির্বাচন নিয়ে এখন ভিন্ন কথা বলছেন। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, যতটা অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে তারা সেসময়ে মন্তব্য করছিলেন তারা, এখন বলছেন নির্বাচন ততটা সুষ্ঠু হয়নি।

কানাডার তানিয়া ফস্টার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভোটের পরদিন গণভবনে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই অনুষ্ঠানে তানিয়া বলেছিলেন, ‘নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক হয়েছে। তবে তিনি এখন বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, তখন তিনি সবকিছু একটু বেশি সরলভাবে নিয়েছিলেন।

একই রকম মনোভাব নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুস সালামেরও (৭৫)। তিনি বলেছেন, ভোটার ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, ‘আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরেছেন, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। আমার মনে হচ্ছে নতুন ভোট হওয়া উচিত।’ আবদুস সালাম বলেন, ‘এখন আমি সবকিছু জানতে পেরেছি এবং বলতে পারি, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি।’

সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যোগাযোগ আছে বলে অভিযোগ আছে। সংগঠনটির উপদেষ্টা কমিটিতে আছেন আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দুই সাংসদ। এ ছাড়া নাম ও লোগোতে মিল থাকলেও দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সঙ্গে সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের কোনো সম্পর্কই নেই। সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন কানাডা, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে কয়েকজন পর্যবেক্ষক নিয়ে আসে। ওই দলেই ছিলেন তানিয়া ফস্টার। ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের দিন এবং তার পরদিন ওই পর্যবেক্ষকেরা সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

তানিয়া ফস্টার বলেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের যোগসূত্র রয়েছে বা সংগঠনটি যে সার্কের কেউ নয়, তা তিনি জানতেন না। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার ভালো লাগেনি। আমার মনে হচ্ছে সবকিছু আমি একটু বেশি সরলভাবে নিয়েছিলাম।’

তানিয়া আরও বলেন, ‘আমরা কেবল ঢাকার নয়টি ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলাম, তারপরও আমাদের প্রতিবেদন যে এভাবে ওরা কাজে লাগােেব, তা বুঝতে পারিনি। আমরা অপেক্ষাকৃত প্রতিকূল এলাকাগুলোয় যাইনি।’

এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্য থেকে দ্বৈবচয়নের (লটারি) ভিত্তিতে ৫০টি বেছে নেয় টিআইবি। নির্বাচনের দিন ৪৭ আসনে কোনো না কোনো নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। অনিয়মের ধরনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টির মধ্যে ৪১টি আসনে জাল ভোট; ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা; ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল; ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা; ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট; ২৬টি আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিতে বাধ্য করা; ২০টিতে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা; ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া; ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়া ইত্যাদি।