‘ইসলামভীতি’ এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমের মনোভাব সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: ‘ইসলামভীতি’ এমন একটি সমস্যা যা সহজে দূর হওয়ার নয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক শব্দ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর এমনকি ইসলাম সম্পর্কেও তাদের মনোভাব নেতিবাচক।

ইউরোপের গণমাধ্যমগুলোতে মুসলিমদের সম্পর্কে খুব কমই ইতিবাচক খবর প্রকাশিত হয়ে থাকে। এসকল দেশসমূহের মধ্যে বিশেষত যুক্তরাজ্যে জনগণ এরকম নেতিবাচক সাংবাদিকতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। সেখানে ‘ডেইলি মেইল’, ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’, এবং ‘দ্যা টাইমস’ এর মত গণমাধ্যমসমূহ সুযোগ পেলেই মুসলিমদের নিদারুণ অবজ্ঞা করতে ভুল করে না।

নিয়মতান্ত্রিকভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের মত দেশসমূহে ইসলামকে সেখানকার উদার মনোভাবের বিরোধী হিসেবে শুধুমাত্র চিত্রায়িত করা হয় না, বরং সেখানকার বুদ্ধিজীবীগণ ইসলামকে এসব দেশসমূহের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাস্তিকগণ ইসলামকে দেশটির উদারনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হুমকি সরূপ হিসেবে দেখাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা আধুনিক ‘ইসলাম-ভীতির’ জনক ঐতিহাসিক বার্নাড লুইসের সাথে তাল মিলিয়ে বলা শুরু করেছে যে, ইসলামের মূলনীতিসমূহ বৈশ্বিক সভ্য সমাজ তৈরীর পথে নিত্য নতুন সমস্যা তৈরী করে চলেছে।

ফ্রান্সের জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবী এরিক জেমোর মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কে যে কোনো ধরনের খবরকে বিকৃত করতে অনেকটা সিদ্ধহস্ত এবং তার এসব কাজে দেশটির রাজনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত দেশটিতে বসবাসকারী কয়েক মিলিয়ন মুসলিমদের জন্য।

এরিক জেমোর একবার দাবী করেছিলেন যে, ফ্রান্সে বসবাসরত কোন মুসলিম যদি তার নামের প্রথম অংশে আরবি শব্দ ব্যবহার করেন তবে তার মানে এই যে, উক্ত ব্যক্তি ফ্রান্সের সমাজ ব্যবস্থার সাথে একীভূত হতে অনিচ্ছুক।

ইউরোপজুড়ে ‘জনপ্রিয়তাবাদ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদ’ এর উত্থান শুধুমাত্র ‘ইসলামভীতি’ কেই উস্কে দিচ্ছে। সরকারি তথ্য মতে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে যুক্তরাজ্যে মুসলিম বিরোধী মনোভাব ৫৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং দেশটিতে ১০ জনের মধ্যে ৬ জন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি ছিলেন মুসলিম নারী আর মুসলিম ভীতিমূলক এসব আক্রমণের প্রতি ১০ জনের ৮ জন ছিলেন মুসলিম পুরুষ।

এতেই প্রমাণিত হয় যে, ‘ব্রেক্সিট’ ঘোষণা দেয়ার ফলে ‘ইসলামভীতি’ দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে, একই সাথে ম্যানচেস্টারে আত্মঘাতী বোমা হামলার মত সন্ত্রাসী আক্রমণকে উস্কে দিচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের ৩৭ শতাংশ মানুষ বলেছেন যে, তারা এমন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন যারা দেশটির মুসলিমদের সংখ্যা কমাতে চায়। আর দেশটির ১০ শতাংশ মুসলিম সেখানকার এমন স্থানসমূহে বসবাস করে যেখানে নুন্যতম সুযোগ সুবিধা নেই একই সাথে তারা প্রতিনিয়ত ‘ইসলামভীতি’ মূলক আক্রমণের শিকার হয়ে থাকেন।

২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ রাজনৈতিক দলের সাবেক সহকারী প্রধান সাইয়্যেদা ওয়ার্সি বলেছিলেন যে, যুক্তরাজ্যের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতামূলক আক্রমণ দেশটির সুশীল সমাজে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

২০১৬ সালে লন্ডনের মেয়র নির্বাচনের সময় সাদিক খানের বিরুদ্ধে তার বিরোধীরা এই বলে প্রচার চালিয়েছিল যে, তার সাথে ইসলামিক সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে কিন্তু তিনি পরে নির্বাচিত হয়েছেন। আর এতেই প্রমাণিত হয় যে, ‘ইসলামভীতি’ সবসময় কাজ করে না।

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমারা শরিয়া আইনকে যেভাবে দেখে তা ঠিক সেরকম নয়। পবিত্র কুরআনে মুসলিমদের প্রতি ইসলামি জীবনযাপন করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং এটি নারী বিরোধী কোনো নির্দেশনা নয়। তথাপিও পশ্চিমা গণমাধ্যমসমূহ ইসলামি আইনসমূহকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করতে সচেষ্ট।

ইসলাম ধর্মের প্রতি পশ্চিমাদের নেতিবাচক ধারণার আরেকটি উল্লেখ যোগ্য কারণ হচ্ছে তারা বহু উচ্চ শিক্ষিত ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকানদের সম্পর্কে অজ্ঞ যাদের মূল প্রোথিত হয়ে আছে মধ্য প্রাচ্য এবং এশিয়াতে।

জুয়ান কোলে নামক বিখ্যাত লেখকের লিখা ‘Muhammad, Prophet of Peace Amid the Clash of Empires’ নামক বই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি তার বইতে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মদ(সা: এর জীবনের ঐতিহাসিক পটভূমির অবতারণা করেছেন এবং একই সাথে তার দেয়া শান্তির বাণী সমূহ তুলে ধরেছেন।

এরকম একটি শিক্ষামূলক বই খুব কম সংখ্যক মানুষই অধ্যয়ন করেছেন এবং যদি তার অধ্যয়ন করতেন তবে হয়ত ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধ্যান ধারণা আরো বৃদ্ধি পেত।

পশ্চিমে ‘ইসলামভীতি’ দূর করার সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে একটি সংঘাতহীন মধ্যপ্রাচ্য কিন্তু এটি অচিরেই এসে যাচ্ছে এরকমটি ঘটার সম্ভাবনা একেবারেই কম।

সূত্র: ‘Barcelona Centre for International Affairs’ এর সহকারী গবেষক ফ্রান্সিস গিলেস এর কলাম থেকে।