তারকাদের ইসলাম গ্রহণে পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষীদের গায়ে জ্বালা

ড. সাদেক হামিদ: খ্যাতিমান আইরিশ সঙ্গীত তারকা সিনেয়াদ ও’কনোর সম্প্রতি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর তার মত একজন জনপ্রিয় শিল্পীর এই ধর্মান্তর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তার উদ্যমী ঘোষণায় বিশ্বের মুসলিমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছেন, আর অন্যদিকে বেশ কিছু অমুসলিম লোকজন তার সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। তার ইসলাম গ্রহণ করার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইসলাম-ভীতিতে আক্রান্ত কিছু পশ্চিমা গণমাধ্যম। এমনকি এসব গণমাধ্যম ইসলাম গ্রহণের কারণে সিনেয়াদ ও’কনোর মানসিক বিকৃতি ঘটেছে বলেও আখ্যায়িত করেছে।

এতদসত্বেও সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘোষণাটি এসেছে খ্রিস্টান বিশেষজ্ঞ জন মিলবানকের কাছ থেকে, যিনি সিনেয়াদ ও’কনোরকে ‘সভ্যতা-বিরোধী বিশ্বাসঘাতক যার কোনো রুচি বোধ নেই’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

মিডেলইস্ট আই’র সাংবাদিক সিজে ওয়ের্লম্যান গত সপ্তাহে শ্বেতাঙ্গদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন- ‘শ্বেতাঙ্গদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ একই সাথে অমুসলিম এবং মুসলিমদের নিকটে দ্বিধান্বিত একটি বিষয়, কারণ শুভ্রতা এবং ইসলাম একে অপরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

‘Finding Peace in the Holy Land’ গ্রন্থের লেখিকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের শ্যালিকা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত লরেন বুথ তার গ্রন্থে এসব অপব্যাখ্যা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তিনি তার বইতে এমনভাবে আধ্যাত্মিক জাগরণ, ব্যক্তিগত রূপান্তর এবং ন্যায় বিচারের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন যা পড়ে একজন পাঠক গ্লামার দুনিয়ায় বিচরণের পাশাপাশি রাজনীতি এবং ধর্মের প্রতি অনুরাগ অনুভব করবেন।

লরেন বুথ তার বইতে যুক্তরাজ্যের উত্তর লন্ডনে তার ছোট বেলার কিছু স্মৃতি দিয়ে পাঠ শুরু করেছেন। তার অতীতের জীবন শুরু হয়েছিল অভাব অনটনের মাধ্যমে, কেননা তার পিতা বিখ্যাত অভিনেতা হওয়া সত্বেও সাদাসিধে জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন এবং তিনি তার সন্তানদের মধ্যে মূল্যবোধ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছিলেন।

একজন খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে ওঠা সত্বেও তিনি খ্রিস্টান ধর্মে ট্রিনিটি ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন এবং একাকী প্রার্থনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি তার বইতে ১৯৭০ এবং ১৯৮০ সালের বহু-সংস্কৃতির ব্রিটেনের কথা ইতিহাসের আলোকে তুলে ধরেছেন।

তিনি ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারেন এশিয়ান মুসলিমদের সাথে মেশার পরে যাদেরকে সে সময় মূল সমাজের মানুষেরা মুসলিম হিসেবে সামাজিক এবং বর্ণগত ভাবে অনেক উচ্চমানের বলে মনে করত।

বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে লরেন বুথ শিল্পকলা অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই আশায় যে, তিনি নাটক অভিনয়কে তার পেশা হিসেবে বেছে নিবেন। বিভিন্ন বার এবং রেস্টুরেন্টে অভিনয়ের পরে তিনি কয়েক বছর অস্ট্রেলিয়ায় তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে কাটানোর পরে এটি তার কাছে আরো বেশি কষ্টদায়ক বলে মনে হল।

এর পরে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে আসেন এবং বিনোদন জগতের লোকজনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দেন। সে সময় তার বয়স ছিল ২০ এবং তিনি তখন থেকেই একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

সেসময় প্রভাবশালী দুলাভাই লেবার পার্টির নেতা টনি ব্লেয়ারের সাথে তার বোনের বিবাহ হয়। পরবর্তীতে টনি ব্লেয়ার লেবার পার্টি থেকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ‘টনি ব্লেয়ারের শ্যালিকা’ হওয়ার সুবাদে তার জন্য সুযোগের সকল দ্বার খুলে যায় এবং তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করেন।

কিন্তু অচিরেই তার সাথে তার দুলাভাই টনি ব্লেয়ারের সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নেয় এবং লেবার পার্টি দ্বারা পরিচালিত সরকারের কিছু সিদ্ধান্তের কারণে তার মোহ ভঙ্গ হয়। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সমর্থন দিয়ে টনি ব্লেয়ার প্রতিক্রিয়াশীলতায় পরিবর্তিত হয়েছেন বলে তিনি মত দেন।

তিনি এর পরে ‘Stop The War’ নামক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যকার সংঘাত সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। আর এভাবেই তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ শুরু করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সফরকালে দখলদারি ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের উপর অত্যাচারের দৃশ্য দেখে তার চোখ খুলে যায়। এতে করে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে যায় এবং তিনি এখানকার মানুষদের ধর্ম এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেন।

ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যকার সহমর্মিতা, সম্মান দেখে তিনি তাদের সম্পর্কে লেখালেখি করার সিদ্ধান্ত নেন। ফিলিস্তিনে আসার পরে তিনি একদিন একটি ট্যাক্সিতে উঠেন আর ট্যাক্সিটার চালক লরেন বুথকে তার কাজের জন্য প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করি আপনি যাতে ইসলামের ছায়াতলে আসতে পারেন, ম্যাডাম। মহান আল্লাহ তায়ালা আপনার সহায় হোন।’

তথাপি সেময় এমন পরিস্থিতি এসে যায় নি এবং নিজের ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তন করার কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। খ্রিস্টান ধর্ম তার জীবনের সাথে মিলে গেছে এবং এ ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তাকে তার নিকটে- ‘একরকম আইপডের মত মনে হয়েছে যিনি সবসময় নীরব থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সুইচ চালু করা হয়।’

তবে তিনি যখন পূর্ব জেরুজালেম থেকে পবিত্র কোরআনের একটি কপি কিনে তা অধ্যয়ন করার জন্য বসে পড়েন এর পর থেকেই তার মন উদ্বেলিত হয়ে পড়ে।

পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথম কিছু বাক্য পড়ে তিনি আশ্চার্যান্বিত হয়ে পড়েন এবং অনুভব করতে থাকেন যে, এগুলো যেন তার সাথে সরাসরি কথা বলছে। সেসময় তার মনে হয়েছিলে যে, তার একটি ‘রোগাক্রান্ত মন’ রয়েছে।

তবে তখনও তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ কারার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি। কিন্তু এর কয়েক বছর পরে তিনি তার পেশার স্বার্থে ইরানে ভ্রমণকালীন সময়ে মুসলিম লোকজনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

তিনি সেখানকার ইসলাম চ্যানেল এবং প্রেস টিভি’র সাথে কাজ করেন এবং তিনি ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা তুলে ধরতে শুরু করেন।

ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে অনেককেই বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক অমুসলিম এশিয়ান এবং আরব অঞ্চলের মানুষদের সাথে মিশে মুসলিম হন।

লরেন বুথ তার বইতে অকপটে স্বীকার করেন যে, ইসলাম গ্রহণের পরে তার বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীগণ তার সম্পর্কে নেতিবাচক আলোচনা করতেন এবং তাকে তার পূর্বের জীবনে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানাতেন।

তিনি নিজের সাথে আলোচনায় মগ্ন হতেন তার নতুন বিশ্বাসের সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য যাতে করে তার ভেতরকার উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তা দূর হয়। তার মত যুক্তরাজ্যের অন্য যেসকল লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের লরেন বুথের বইটি অবশ্যই পড়ে দেখা উচিত এটি জানতে যে তিনি কিভাবে জেরুজালেম থেকে মক্কা পাড়ি দেয়ার পথের সন্ধান পেয়েছেন এবং আধুনিক ব্রিটেনে মুসলিম হওয়ায় যেসব মানুষ প্রতিনিয়ত দ্বিধার সম্মুখীন হন তাদের জন্য বইটি অধ্যয়ন উপকারী হবে।

সূত্রঃ ‘Sufis, Salafis and Islamists: The Contested Ground of British Islamic Activism’ এর লেখক এবং ‘British Muslims: New Directions in Islamic Thought, Creativity and Activism’ নামক বইয়ের সহ লেখক ড. সাদেক হামিদ এর কলাম থেকে।