বলতেই কেঁদে দেন

নিউজ ডেস্ক
কক্সবাজার: রোহিঙ্গা, বিশ্বের রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর নাম। মিয়ানমার এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে স্বীকার করে না। রাখাইন রাজ্য থেকে তাদের তাড়াতে প্রায়ই অভিযান চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, নির্বিচারে নারী-পুরুষকে গণহত্যা আর বাড়িঘরে আগুন দিয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করায় ব্যস্ত স্বয়ং বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ট দেশটির সরকার। গত আগস্টে সেনাবাহিনীর এমনই নির্মমতার সাক্ষী লাখো রোহিঙ্গা।

এদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় শিবিরে থাকা নারীদের অনেকের স্বামী খুন হয়েছেন। অনেক শিশু এসেছে, যাদের কারো বাবাকে হত্যা করা হয়েছে তো কারো মা নেই।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চাপে হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কাজ চলছে।

কিন্তু, যারা কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা ফেরত যাওয়ার বিষয়ে কি ভাবছেন, বিশেষ করে বিধবা নারী ও এতিমরা। শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে তাদেরই জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে।
গোলাপী ও বেগুনী রঙের ভোরে প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ধূলোময় পাহাড়। যার উপরে লাল রঙের অসংখ্য তাবুঘর, গড়ে উঠেছে ঘনবসতি। এর মধ্যেই ২৩০ নারী ও শিশুর বিলাপ, যাদের কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কারও বাবা।
গত আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে অভিযানের নামে নিপীড়ন শুরু করলে প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার (প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ) মুসলিম রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

রশিদ জান, সেনারা তার বাড়িতে আগুন দিলে পাঁচ সন্তান নিয়ে টানা ১০ দিন হেঁটে বাংলাদেশে আসেন। স্বামীর কোনো খোঁজ এখনো তার কাছে নেই, বলতেই কেঁদে দেন।

কান্না থামিয়ে রশিদ জান বলেন, ১১ মাস আগে রোহিঙ্গা জঙ্গি সন্দেহে গ্রামের আরো চারজনের সঙ্গে সেনারা তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যান। এরপর স্বামীর ভাগ্যে কি ঘটেছে, এখন পর্যন্ত তা জানেন না।

আয়েশা বেগম, ১৯ বছরেই বিধবা হয়েছেন। তিনি জানান, মিয়ানমারের এক সেনা তার স্বামীকে হত্যা করেন। এরপর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

আয়েশা বেগম বলেন, ‘মৃত স্বামীর পাশে বসে আমি শুধু কেঁদেছি। তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। রাস্তায় আমি তার লাশ পেয়েছি, তিনটি টুকরো করা।’

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন মানুষ এবং তাদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখে থাকে সরকার।
জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর চলানো অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে অভিহিত করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাবিরোধী নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানকে নৃশংস এবং রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ, গণহত্যা ও তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছে।

তবে মিয়ানমার সরকার এসব বেশিরভাগ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে। আর সেনাবাহিনী বলেছে, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে তারা এসবের কোনো প্রমাণ পায়নি।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অদূরে বালুখালীতে তিনটি বড় আশ্রয় শিবির উঠেছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট পাকিস্তানের অর্থায়নে। ৫০টি তাবুঘর, সেখানে শুধুমাত্র বিধবা ও এতিমরা বসবাস করছেন।

রান্না করার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ছোট্ট দুটি জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। পানির জন্য একটি টিউবওয়েল ও নামাজের জন্য একটি তাবু বরাদ্দ রয়েছে।

এই শিবিরের অলিখিত নেতা সুয়া লেহা জানান, যারা নামাজ পড়তে পারে না, তাদের জন্য সোম ও শুক্রবার আলাদা একটি কক্ষে বিশেষ সেশনের ব্যবস্থা রয়েছে।

তিনি জানান, এখানে বসবাসকারীদের দুটি শর্ত পালন করতে হয়। তারা নামাজ এবং পবিত্র কোরআন পড়তে পারবে। যেসব বিধবা এবং এতিম সত্যিকার অর্থে ঝুঁকিপূর্ণ তাদেরই এই শিবিরে বসবাসের জন্য বাছাই করে আনা হয়।
এই শরণার্থী শিবিরের পাশেই পুকুর এবং সেখানকার নোংরা পানিতে পোশাক ও থালাবাসন পরিষ্কার করেন রোহিঙ্গা নারীরা।

এই চিত্রের বিপরীতে আগস্টের সংকটের পর থেকে শরণার্থীদের জন্য হাজারো বসতি গড়ে উঠেছে এই অঞ্চলে। সেখানে মিয়ানমার থেকে আসা নারীরা এখনো একটু জায়গার জন্য সংগ্রাম করছেন।

তবে তিন ছেলে নিয়ে বসবাস করা ২২ বছর বয়সী বিধবা রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘এখানে কোনো নিরাপত্তা রক্ষীর ব্যবস্থা নেই। তারপরও আমরা ক্যাম্পে অনেক নিরাপদে বসবাস করছি।’

তিনি বলেন, ‘এই ক্যাম্পে সহজে কোনো পুরুষ আসতে পারে না। কক্ষগুলোও বেশ বড়, আর নিয়মিতই ত্রাণ পাচ্ছি।’
জাতিসংঘের নারী সংস্থা জানিয়েছে, রাখাইন থেকে পালিয়ে আসাদের মধ্যে ৫১ শতাংশ নারী ও বালিকারা ট্রমাটাইডজ। তারা কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মানবপাচার, যৌন নিপীড়ন ও জোর করে বাল্যবিয়ের শিকার।

প্রাপ্তবয়স্কা নারী ছাড়াও ১৩ থেকে ২০ বছর বয়সী যারা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন, তাদের সঙ্গে দুই থেকে চারটি করে বাচ্চা রয়েছে এবং অনেকেই অন্তঃসত্ত্বা।

এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসংস্থা এসব বিধবা ও এতিমদের জন্য শরণার্থী ক্যাম্পে আলাদাভাবে কাজ শুরু করেনি। কিন্তু, ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগতভাবে তাদের সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

রিহানা বেগম তার পাঁচ সন্তান নিয়ে একটি কক্ষে থাকেন। তিনি এখন অনেকটাই ট্রমাগ্রস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। ধর্মীয় পোশাক পরে রিহানা কোরআন পড়ছেন, চিকন পাটির দাড়ে মেয়ে শুয়ে। শিশুটি জ্বরে আক্রান্ত। কিন্তু, খাবার সংকটে তার দুশ্চিন্তা বেড়েছে, চিকিৎসক থেকেও দূরে রয়েছেন।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার রেশন কার্ডধারী রিহানা বলেন, ‘আমি ত্রাণ নিতে ভয় পাই। কারণ, সেখান থেকে ত্রাণ নেওয়ার মত শক্তি আমার নেই।’

চলতি সপ্তাহে মিয়ানমার বলেছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত ও নিরাপদ পুনর্বাসনে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।
কিন্তু, মিয়ানমার সরকারের এই ঘোষণা রিহানা বেগমের ভয়কে দূর করতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আমি খুবই ভীত। আমি কখনো সেখানে ফিরে যেতে চাই না। এখানেই (বাংলাদেশের ক্যাম্পে) মরতে চাই।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।