বর্ণবাদের শিকার শ্বেতাঙ্গ নওমুসলিমদের অন্যরকম অভিজ্ঞতার চাঞ্চল্যকর কাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: ‘আমি একজন শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ। আমার জীবনে আমি কখনো বর্ণবাদের শিকার হই নি। আর যখনই আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হই তখন লোকজন এমনভাবে আমার সাথে আচরণ করতে থাকে যেন আমি আমার শ্বেতাঙ্গ পরিচয় হারিয়ে ফেলেছি।’

নও মুসলিম ক্রিস্টোফার জন জর্জ সম্প্রতি তার টুইটার একাউন্টে ঠিক এরকমই একটি টুইট করেন।

তিনি বলেন, ‘এটি ঠিক কী রকম অনুভূতির সৃষ্টি করে তা আমি এর পূর্বে জানতাম না, আর এখন আমি যখন অন্যদের পক্ষ নিলাম তখন এর মর্ম উপলব্ধি করতে পারছি…এটি আসলেই ন্যক্কারজনক।’

ক্রিস্টোফার জন জর্জের টুইটটি শুধুমাত্র ইসলামোফোবিয়ার উপর ভিত্তি করে উগ্র বর্ণবাদের বিষয়টি আমাদের সামনে উদ্ভাসিত করেনি, বরং তা পশ্চিমা সমাজে মুসলিমদের অভিজ্ঞতার কথা আমাদের জানান দেয়।

লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিয়ন মোসাভি বলেন, ‘যদিও সকল বর্ণের লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে থাকেন কিন্তু শ্বেতাঙ্গদের ইসলাম গ্রহণের ফলে তাদের সামনে বর্ণবাদ, উগ্রপন্থা এবং শেতাঙ্গ বাদীদের আচরণ উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।’

শ্বেতাঙ্গদের ইসলাম গ্রহণের পর তাদের সামনে শুধুমাত্র উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদীদের আচরণই ফুটে উঠে না বরং শ্বেতাঙ্গ সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা যে ধীরে ধীরে কমে যায় তা ফুটে উঠে।

লিয়ন মোসাভি আরো বলেন, ‘বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে বেশ কিছু স্থানে শ্বেতাঙ্গদের কোনো বাধা ছাড়াই প্রবেশ করতে দেয়া হয়, আর অন্যদিকে অশ্বেতাঙ্গদেরকে এসব স্থানে খুব কমই স্বাগত জানানো হয়।’

২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর বর্ণবাদ একটি শক্তিশালী আকার ধারণ করে যা অধিকাংশ পশ্চিমা মুসলিমের অভিজ্ঞতায় বিদ্যমান। এর ফলে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতারা পশ্চিমে আগত মানুষদের আরব, এশিয়ান, আফ্রিকান, ইন্ডিয়ান ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করেছে যারা মুসলিম বিরোধী মনোভাব তৈরীতে ভূমিকা রেখেছে।

৯/১১ এর পর মুসলিম বিরোধী ঘৃণামূলক অপরাধের প্রথম শিকার হয়েছিলেন শিখ ধর্মের অনুসারী একজন ভারতীয় যাকে মুসলিম ভেবে ভুল করে আক্রমণ করা হয়েছিল। সুতরাং যেসব শ্বেতাঙ্গ এই গভীর ইসলামোফোবিয়ার যুগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তাদের অভিজ্ঞতা কি?

প্রথমত, লিয়ন মোসাভির মতে, ‘শ্বেতাঙ্গদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ অনেক সময় অমুসলিমদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে, কারণ শেতাঙ্গবাদ এবং ইসলাম এ দুটোকে একে অপরের সাথে বেমানান হিসেবে ধরা হয়।’

যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের শ্যালিকা লাউরেন বুথ ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর অনেকের নিকটেই তা দ্বিধার কারণ হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি যখন আমার বন্ধু-বান্ধবদের আমার ইসলাম গ্রহণের কথা বলতাম তখন তারা আমাকে বলত- তুমি এর চাইতে ভালো কিছু নিশ্চয়ই জান, তুমি তো শিখতে শিখতে বড় হয়েছ।’

গণমাধ্যম সমূহ কিভাবে তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণকে ‘ভিলেন, পরিস্থিতির শিকার অথবা এমন একজন যে আশাহত হয়েছে’ ইত্যাদি আখ্যায়িত করে বলে তিনি তার ব্যাখ্যা দেন। একই সাথে তার ইসলাম গ্রহণ এমন লোকদেরকেও অবাক করেছে যাদের সাথে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের সাথে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক রয়েছে।

ক্রিস্টোফার জন জর্জ বলেন, ‘তারা বলে: তুমি এমন একজন যে, আমেরিকায় বোমা ফেলার জন্য দায়ী! তোমাকে তোমার দেশে ফিরে যেতে হবে। আর আমি চিন্তা করতাম যদি ঠিকই আমার যাওয়ার কোনো স্থান থাকত তবে আমি চলে যেতাম। ৯/১১ এর পর লোকজন আমাকে বোকা ভাবত। তারা মনে করত আমি ইংরেজি বলতে পারি না এবং আমি অশিক্ষিত। আর অনেকেই আমাকে পাকিস্তানি বা শ্বেতাঙ্গ পাখি নামে ডাকা শুরু করল।’

লিয়ন মোসাভি বলেন, সম্প্রতি আমি আমিনা ডেডি নামের ২৭ বছর বয়সী একজন মায়ের সাথে কথা বলেছিলাম যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া শহরের একটি ক্যাফেতে দাঁড়িয়ে থাকার সময় একজন শ্বেতাঙ্গ যুবক আমিনার ইসলামি পোশাকের সূত্র ধরে তাকে আক্রমণ করে।

এই আক্রমণের ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে যেখানে দেখা যায় যে, বর্ণবাদী লোকটি আমিনার উদ্দেশ্য বলতে শুরু করেছে- ‘আমি এটি পছন্দ করি না। আমি এটি পছন্দ করি না, কারণ আমি তোমার ধর্ম পছন্দ করি না। এটি(তোমার পোশাক) আমাকে হত্যা করবে বলে হুমকি দিচ্ছে কিন্তু আমি তোমার দ্বারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে চাই না।’

পরে আমি কার্টুনিস্ট কাটি মিরান্ডার সাথে কথা বলি যিনি ইহুদি ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এটি অনেক সময় খুবই সমস্যা তৈরী করে যখন লোকজন গতানুগতিক ভাবেই মুসলিমদের ‘একগুঁয়ে’ বলে মন্তব্য করে।

মিরান্ডা বিরূপ পরিবেশেও টিকে রয়েছেন কারণ তিনি লোকজনদের সাথে ইতিবাচক ভাবে কথা বলেন এবং তার প্রতিদিনকার জীবন যাত্রায় যখন তিনি লোকজনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হন তখন তিনি এগুলোকে বর্ণনা দেন এভাবে- ‘ইসলাম ভীতিতে আক্রান্ত গণমাধ্যমের’ কাজ হিসেবে যেগুলো মুসলিম বিরোধী অপপ্রচার করে লাভবান হয়।

যদিও পশ্চিমা দেশসমূহে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী শ্বেতাঙ্গ মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের স্তর অতোটা উঁচুতে নয়, আর তা অশ্বেতাঙ্গ মুসলিমদের সাথে করা আচরণের মত অতোটা মারাত্মক নয় কিন্তু তারপরেও এটি এমন এক ধরনের বর্ণবাদ যা সচরাচার গণমাধ্যমে উঠে আসে না এবং এ ধরণের বর্ণবাদকে এড়িয়ে চলা অবশ্যই উচিত নয়।

সূত্র: সিজে ওয়েরলেমানের কলাম থেকে যিনি ‘Crucifying America’, ‘God Hates You, Hate Him Back’ এবং ‘Koran Curious’ নামক বই লিখে বিখ্যাত হয়েছেন।