বিশ্ব রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা ও বিশ্লেষকদের ভাবনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে ইসলাম সম্পর্কিত আলোচনা সামাজিক আন্দোলন, রাজনৈতিক দল এবং সশস্ত্র গ্রুপ সমূহের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে।

তথাপি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ তাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ঠিক কি ধরনের নীতি অনুসরণ করবে এই প্রশ্নটি কিছুটা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন নামে গবেষণা সংস্থার প্রতিষ্ঠান ‘Center for Middle East Policy’ সম্প্রতি ‘Islam as Statecraft: How governments use religion in foreign policy’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেন শাদি হামিদ এবং পিটার ম্যান্ডাভিলে নামের দুজন গবেষক।

সৌদি আরব: সেখানে কি সত্যিকারের কোনো পরিবর্তন এসেছে?
প্রতিবেদনটির শুরুতেই সৌদি আরবে ‘ওহাবিজম’ আমদানির বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ম্যান্ডাভিলে একদিকে সৌদি আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার আদর্শের প্রচার করছে অন্যদিকে বিভিন্ন ইসলামিক দাতা সংস্থাসমূহ এ দায়িত্ব পালন করছে।

তিনি একই সাথে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কিছু ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিন বলেন, ‘যখন সালমান মধ্যপন্থী ইসলাম সম্পর্কে কথা বলেন তখন পশ্চিমা বিশ্ব একে রক্ষণশীল ধর্মের মধ্যকার একটি আন্দোলন হিসেবে দেখে।’

শেষে, ম্যান্ডাভিলের নিকট এমন একটি প্রশ্ন করা হয়: তিনি কি বিন সালমানের ধর্মীয় দৃষ্টিকে ক্ষমতা রক্ষার অস্ত্র হিসেবে দেখেন কিনা? ম্যান্ডাভিলে একমত হয়ে বলেন, ‘রাজনীতি এবং ধর্ম সম্পর্কিত বিষয়ে বিন সালমানের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী প্রতিশ্রুতি নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি একে ধর্মের বিরোধী হিসেবে দেখতে চাই না। আমি একে দেখি সৌদি আরবের যে কোনো শক্তির বিরোধী হিসেবে যা ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করতে চায়।’

ধর্ম কিভাবে ক্ষমতার ইস্তেহার হয়ে উঠতে পারে
ম্যান্ডাভিলে ধর্মীয় ক্ষমতাকে উদারনীতি, সমাজতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদের সাথে তুলনা করেন যেগুলোর ক্ষমতা রয়েছে একটি জাতিকে পরিবর্তন করার। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘ধর্মের দিকে বিশ্ববাসীর পুনরায় নজর দেয়া প্রয়োজন, কেননা এর রয়েছে পরিবর্তন করার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা।’

ম্যান্ডাভিলের সাথে একমত হয়ে শাদি হামিদ যুক্ত দেন যে, অনেক মুসলিম দেশ তাদের বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে ইসলামের দ্বারস্থ হচ্ছে কারণ ‘এটি তাদের নিকট একমাত্র আদর্শগত বিকল্প।’

তিনি আরো যুক্ত দেন যে, বেশিরভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশসমূহ ‘ইসলামকে একটি বাধ্যকর এবং মর্মস্পর্শী আদর্শ হিসেবে দেখে থাকে।’

দেশসমূহ কেন জাতীয়তা বাদের বদলে ইসলামকে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিফলিত করছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মিশরের কথাই ধরুন, অন্যান্য দেশসমূহে মিশরীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হতে পারে না বরং ইসলাম হচ্ছে এর চাইতে আরো বেশী কার্যকর সমাধান।

কাতার: এর পরে কি?
ইসলাম কি কাতার অবরোধের কারণ? শাদি হামিদের মতে, যদিও কাতারের শাসক গোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সংযুক্ত নয়, কিন্তু ‘ব্রাদারহুডের সমর্থন করার জন্য তারা বাধা প্রদান করে না অথবা তারা বৃহৎ অর্থে এর সমর্থকও নয়।’

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব বরং মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামিজমকে ‘তাদের ক্ষমতার জন্য মূল হুমকি বলে মনে করে এবং তারা ব্রাদাহুডের মত ইসলামপন্থীদের দমন করার জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।’

আর এ সূত্র ধরেই শাদি হামিদ ব্যাখ্যা দেন যে, কাতার অবরোধের ক্ষেত্রে কিছু বাহিরের এবং কিছু ভেতরের উদ্দীপক কাজ করেছে। বাহিরের উদ্দীপকের মধ্য ওয়াশিংটন অন্তর্ভুক্ত। হামিদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন তাদের অস্ত্রের অন্যতম ক্রেতা সৌদি আরবকে সুরক্ষার ছাতার নীচে নিয়ে আসা আর এ জন্যই কাতারের উপর অবরোধ প্রয়োজন ছিল।’

ইসলামিক রাষ্ট্রযন্ত্রে ইরান অন্যতম খেলোয়াড়
সৌদি আরব এবং ওয়াহাবিজমই শুধুমাত্র ইসলামকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা করায়ত্ত করে রাখেনি বরং ইরান ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু ব্যবহার করে আসছে। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পর ইরান সেখানে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে এবং একই সাথে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যা কিছু রাজনৈতিক দল আর শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

কে এর সর্বোত্তম ব্যাবহার করছে?
আলোচনার শেষে, লাকশামানান নামে একজন সাংবাদিক শাদি হামিদ এবং ম্যান্ডাভিলে দুজন গবেষকের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন আর তা হলো: কোন দেশ ইসলামিক কোমল শক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করছে?

ম্যান্ডাভিলে উত্তরে বলেন, তুর্কি, দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর সবচেয়ে বেশি সু-ব্যবহার করছেন। এরদোগান একে ‘তুরস্কের গৌরবময় অতীত ফিরিয়ে আনার জন্য নিউ-অটোমান ধারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।

ম্যান্ডাভিল যেমনটি মনে করেন হামিদ ঠিক তেমনটি মনে করেন না। তার মতে, কোনো দেশই এককভাবে ধর্মীয় ক্ষমতার ব্যবহারের ক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল নয়। তথাপি সৌদি আরব সম্প্রতি পশ্চিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে আর আরব আমিরাত আন্তঃধর্মীয় সামিটের মাধ্যমে খ্রিষ্টান, ইহুদি আর মুসলিমদের এক করতে পেরেছে।

গবেষকদের মতে, সৌদির কৌশল ইরানের তুলনায় ‘অনেক বেশি আন্তঃরাষ্ট্র কেন্দ্রিক।’ ইরানের ক্ষেত্রে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি তাদের পররাষ্ট্রীয় নীতিতেও প্রতিফলিত হয়।

সূত্র: ব্রুকিংস ডট এডু।