জীবনের বাঁকে হার না মানা সংগ্রামী অন্ধ হাফেজ জাহাঙ্গীরের গল্প

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: কুমিল্লার মুরাদনগর থানার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কোরআনে হাফেজ মো. জাহাঙ্গীর আলম হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও যেন হার না মানা এক জীবন সংগ্রামী। প্রকৃতি যেখানে তার চোখের আলো কেড়ে নিয়েছে কিন্তু তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন তার হৃদয়ের আলো। নিজেকে মেলে ধরেছেন পবিত্র কোরআনের একজন নিবেদিত প্রাণ খাদেম হিসেবে।

সময়টা ১৯৮৬ সাল, মাত্র ছয় বছর বয়সে শিশু জাহাঙ্গীর আলমের চোখে কম দেখতে শুরু করার বিষয়টি হঠাৎ করেই আবিষ্কার করেন পরিবারের সদস্যরা। পাঁচ ভাইবোনের টানাপোড়েনের সংসারে মাত্র প্রথম শ্রেণিতে পড়া ২য় ছেলের চোখের এই সমস্যায় অনেকটাই কুল হারিয়ে ফেলেন বাবা আব্দুল জলিল বাহারি।

অনেক চেষ্টা করেন প্রিয় সন্তানের চোখের আলো ফেরাতে, কুমিল্লার স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল আর ডাক্তারদের দেখিয়ে কোনো ফল না পাওয়ায় চলে আসেন ঢাকায়। নামিদামি সব চক্ষু হাসপাতালে দেখানোর পরে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন কোনো লাভ হবে না, জাহাঙ্গীর আলমের হারানো দৃষ্টিশক্তি আর ফেরানো সম্ভব নয়।

চিকিৎসা চলাকালীন মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে জলমলে রঙিন এই পৃথিবী জাহাঙ্গীর আলমের কাছে রূপ নেয় অবিচল রাত্রি হিসেবে। কিন্তু ছেলের এই করুণ পরিণতিতে একটুও ভেঙ্গে পড়েন নি বাবা জলিল বাহারি। সিদ্ধান্ত নেন- চোখের আলো নিভে গেছে তাতে কি জ্বালিয়ে দিবেন ছেলের মনের আলো, তাকে বানাবেন পবিত্র কোরআনের হাফেজ!

যেই সিদ্ধান্ত সেই শুরু, ছেলেকে ভর্তি করান কুমিল্লার স্থানীয় হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। নানা সমস্যা আর সীমাবদ্ধতাকে হার মানিয়ে অবশেষে ২০০০ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের রাহমানিয়া সিদ্দিকিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে হেফজ শেষ করেন জাহাঙ্গীর আলম।

এরপর তিনি নিজেই এক হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদের কোরআন শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। বিয়েও করেন সেই বছরেই, মোটামুটি ভালোই চলছিল বাবা-মাসহ টানা পোড়েনের সংসার। কিছুটা কষ্ট হতো তারপরেও অল্পতেই তুষ্ট থাকতেন তারা।

কিন্তু হঠাৎ কষ্টের দোলাচলে কোনোমতে বয়ে নেয়া সংসারে দমকা হাওয়া আঘাত হানে ২০০৭ সালে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম জাহাঙ্গীর আলম আক্রান্ত হন হৃদরোগে। অল্প ক’দিনেই হার্টের ব্যথাটা প্রকট আকার ধারণ করে, ভর্তি হন ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন হার্টে রিং পরানোর।

কিন্তু দিনে তিন বেলা খাবারের যোগান পেতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয় সেখানে আবার ব্যয়বহুল চিকিৎসা! জাহাঙ্গীর আলম চিকিৎসকদের জানিয়ে দেন, এতো টাকার যোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। শুধুমাত্র ওষুধেই যতদিন বাঁচা যায় সে ব্যবস্থা নিতে তাদের কাছে অনুরোধ করেন। এরপর থেকে প্রতি দুই মাস পরপর তাকে ঢাকার হৃদরোগ হাসপাতালে আসতে হয়। প্রতিমাসে ২০০০ টাকার বেশী ঔষধ তো আছেই।

জাহাঙ্গীর আলমের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে সন্তান। বড় ছেলে মো. রহমত উল্লাহ স্থানীয় একটি স্কুলের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেজো ছেলে মো. বরকত উল্লাহ ৪র্থ শ্রেণির পড়ছে আর ছোট ছেলে মো. নেয়ামত উল্লাহ সবেমাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে।

এরমাঝে আবার মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে মেজো ছেলে রহমত উল্লাহর অসুস্থতা। ২০১৩ সালে হঠাৎ ব্রেইনে স্ট্রোক দেখা দেয় তার, উন্নত চিকিৎসার ফলে এখন কিছুটা সুস্থ হলেও অসহায় এই পরিবারকে ছেলের চিকিৎসাবাবদ গুনতে হয় প্রায় দুই লক্ষ টাকা। এ পর্ব যেতে না যেতেই বর্তমানে তারও দেখা দিয়েছে চোখের সমস্যা। তারও দেখা দিয়েছে দৃষ্টি শক্তির স্বল্পতা। প্রতিনিয়ত ওষুধ খেতে হয় আর ডাক্তার দেখাতে হয় তাকে।

জীবনের মাঝপথ হলেও হাফেজ জাহাঙ্গীর প্রতিনিয়ত ভাবেন, এই বুঝি পরপারের ডাক এলো তার! অসুস্থ বাবা-মা ও ছেলে তার নিজের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। পরিবার চালাতে চরম হিমশিম খেতে হয় তাকে।

‘দিন আনে দিন খায়’ পরিবার তিনি চালান মানুষের দান আর কিছু বাড়িতে কুরআন খতমের মাধ্যমে পাওয়া স্বল্প পরিমাণ কিছু টাকা দিয়ে।

এ অবস্থায়ও হাফেজ জাহাঙ্গীর স্বপ্ন বুনেছেন- বড় ছেলেকে সাধারণ শিক্ষায় পড়িয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আর ছোট দুই ছেলেকে সামনে বছরে ভর্তি করাবেন হেফজ মাদরাসায়। তাদের বানাতে চান দ্বীনের বড় খাদেম।

দিনরাত মৃত্যুর প্রহর গোনা এই হাফেজে কোরআন তার জীবনের শেষ স্বপ্ন পূরণে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন সমাজের বিত্তবান আর সক্ষম মানুষদের প্রতি।

জাহাঙ্গীর আলমকে সাহায্য পাঠানোর মাধ্যম: জাহানার খাতুন (মা)
মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব নং: ১৪৭৫২। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, কোম্পানীগঞ্জ শাখা, মুরাদনগর, কুমিল্লা।

মোবাইল: ০১৭৪৫১৪০৩৭৫।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।