যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনায় আন্তঃধর্মীয় মুসলিম খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মিলন মেলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নর্থ ক্যারোলিনা: যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার রাজধানী র্যা লিঘ তে ‘Islamic Association of Raleigh’ এর উদ্যোগে চলতি মাসের ২ তারিখ শনিবার আয়োজিত একটি আন্ত ধর্মীয় সভায় মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি ধর্মের সদস্যরা যোগদান করেছেন।

ধর্মসভায় আজ থেকে চার বছর পূর্বে অজ্ঞাত বন্দুকধারীর হামলায় নিহত ডেহা বারাকাত, ইউসোর আবু সালহা এবং রাজান আবু সালহার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে আগত লোকজনদের ভোজের ব্যবস্থা করা হয়। আর এই ভোজ আয়োজনের জন্য একই সাথে মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি ধর্মের অনুসারীরা খাবারের ব্যবস্থা করেন।

ফারিস বারাকাত নামের একজন বলেন, ‘২০১৫ সালে আমার ভাই গুলির আঘাতে নিহত হয়, আমি কর্তৃপক্ষের নিকট এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাই।’

তার এই আহ্বান কাজে লাগতে যদিও কিছু সময় ক্ষেপণ হচ্ছে কিন্তু তার মত অনেকের প্রচেষ্টায় হত্যাকাণ্ডের এক মাস পরেই আন্তঃধর্মীয় খাদ্য সরবরাহ মূলক কিছু অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় ‘Food Bank of Central and Eastern North Carolina’ এ অন্তত ২১,০০০ জন মানুষকে খাওয়ানোর মত অর্থ জমা পড়ে।

শনিবারের এই ভোজ সভায় আগত অথিতিলঅ ৬৭,০০০ জন মানুষের জন্য খাদ্য নিয়ে আসেন যা গত বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়।

ফারিস বারাকাত বলেন, ‘চ্যাপল হিলের ওই হত্যাকাণ্ডের পর একতার যে অনুভূতি সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে তা অনেক লোককে একসাথ করতে সক্ষম হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আমরা অনেকের জীবনে অবদান রাখতে পারছি।’

আর বর্তমানের এই খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির পেছনে মূল অবদান রাখছে মুসলিম তরুণদের ক্ষমতায়নে কাজ করা অলাভজনক সংগঠন ‘Light House Project’।

দক্ষিণ র্যাালিঘের বেথ শালোম নামের একটি ইহুদি মন্দিরের সদস্য রেবেকা কলিন্স এই খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে আসতে ভালোবাসেন এবং তিনি একে বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসীদের সাথে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মন্দির আন্তঃধর্মীয় সদস্যদের জন্য অনেক কিছু করেছে এবং গত বছর আমি এখানে এসেছিলাম। আমি অনেক ভ্রমণ করতে ভালোবাসি কিন্তু গত বছর এখানে এসে আমি বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের সাথে পরিচিত হই এবং এটি অন্য কোনো স্থানে ভ্রমণের চাইতে অনেক বেশী ভালো।’

‘Community for First Baptist Church’ এর প্রধান লেহ রিড বলেন, তার চার্চ ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে খাদ্য সংগ্রহ করেছে এবং এ কাজে তারা ১৫ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়োজিত করেছে।

তিনি বলেন, ‘একসাথে হওয়া ব্যতীত আমরা কিছুই করতে পারবো না। আমি মনে করি মুসলিম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদিদের সাথে নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারবো। আমার মনে হয় সৃষ্টিকর্তার রাজত্ব এরকমই হওয়া উচিত। লোকজন একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবে এবং অন্যদের মঙ্গল কামনা করবে আর ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দিবে।’

প্রসঙ্গত, ক্রিস হিকস নামের নিহতদের প্রতিবেশী একজনকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হয় যার সাথে গাড়ি পার্কিং নিয়ে নিহতদের জটিলতা সৃষ্টি হয়।

সাদি নামের একজন বলেন, ‘এই ব্যক্তি কেন পার্কিং নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার জন্য এরকম একটি ঘটনা ঘটাতে যাবে? কিন্তু সে যখন দেখতে পায় যে, তার সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে কিছু মুসলিম নারী শিক্ষার্থীর এবং তাদের পরনে হিজাব রয়েছে তখনই সে তার বন্দুক তাক করে এবং আশপাশে গুলি চালিয়ে অনেককে হত্যা করে।’

এ ঘটনার পরে ক্রিস হিকস পলায়ন করেছে এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

কার্যকরী সিদ্ধান্ত
ফারিস বারাকাত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, তার ভাইয়ের হত্যাকারীর বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং সে ফাঁসিতে ঝুলবে।

তিনি বলেন, ‘এটি হয়ত এমন সময় যখন আমরা কিছুটা সান্ত্বনা অনুভব করবো কিন্তু আমি মনে করি বিচার আরো দ্রুত হওয়া উচিত। এ বিচারের ফলে অন্যদের মধ্য একটি বার্তা পৌঁছাবে যে, এ ধরনের কাজের শাস্তি তাদের জন্য অপেক্ষারত আছে।’

নর্থ ক্যারোলিনার ডারহাম কাউন্টির অ্যাটর্নি সাতানা ডেব্রি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘তার দপ্তর এ ধরনের সংঘাত পূর্ণ অপরাধের দ্রুত বিচার করতে বদ্ধ পরিকর।’

তিনি বলেন, ‘আমি এই সংঘাতের কার্যকর এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ। এ মামলাটি ডারহামের একটি পুরাতন মামলা। আমি বিচার প্রক্রিয়াকে আরো তড়িত করার জন্য চেষ্টা চালাবো। আবু সালাহ এবং বারাকাতের পরিবারে সাথে আমার হৃদয় জড়িয়ে আছে।’

বালোচ নামের একজন বলেন, আমি বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশী কিছু ভাবতে পছন্দ করছিনা, কিন্তু প্রতিবেশীদের মধ্যে এধরনের বিরোধপূর্ণ সংঘাতের অবসান হোক তা আমি দেখতে চাই।

তিনি বলেন, ‘ঘৃণা মূলক আক্রমণ সমূহের শ্রেণীবদ্ধ করণ প্রয়োজন। কমিউনিটির প্রত্যেক সদস্য আশা করে যে, এই আক্রমণকে একটি ঘৃণামূলক আক্রমণ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হবে। এর ফলে যদিও সবকিছুর বিচার হয়ে যাবে না কিন্তু এটি এ বিষয়টি জানান দিবে যে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি কোনো বিরোধের কারণে হয়নি বরং তা ঘৃণামূলক আক্রমণের কারণে হয়েছে।’

খাদ্য বিতরণ কর্মসূচীতে আগত অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবীরা বলেছেন, ক্রিস হিকসের বিচার হতে এত দীর্ঘ সময়ের কেন প্রয়োজন হচ্ছে তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না।

জারা হাসান নামের একজন স্বেচ্ছাসেবী বলেন, ‘এটি একটি ভয়ানক ঘৃণাত্মক কাজ ছিল, এটি একটি ঘৃণামূলক আক্রমণ ছিল এসব জেনেও অনেকে নীরব ভূমিকা পালন করছে।’

নিহত ডেহা বারাকাতের সহপাঠী জাইনুব জাভেদ এখনো তার সতীর্থের কথা মনে করে স্মৃতিচারণ করেন।

তিনি বলেন, ‘চার বছর যাবত এ মামলার বিচরা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি অসাড় হয়ে পড়েছি। সবকিছু আবার নতুন ভাবে শুরু হচ্ছে বলে মনে হয়।’

কিন্তু জাভেদের মতে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচীর মাধ্যমে নিহত তিন জনের আত্মার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি তারা কিভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল তার আলোচনা নয় বরং তারা কিভাবে বেঁচেছিল তার আলোচনা হয়।’

তিনি বলেন, ‘এ অনুষ্ঠানে এসে আমি খুবই আশাবাদী হয়ে উঠি। আমি এখানে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাই। এখানে শুধুমাত্র উদযাপন করা নয় বরং বড় কিছুর অংশীদার হওয়ার মাহাত্ম খুঁজে পাওয়া যায়।’

সূত্র: নিউজঅভজার্বার ডট কম।