‘শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের ইসলাম গ্রহণ বিশ্বাসঘাতকতার সামিল’: ধর্মান্তরিত তিন নারীর গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: স্টেসি নাভারেত নামের ২৩ বছর বয়সী নারী যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তখন তার পরিবারের লোকজন এবং তার বন্ধুরা ভেবেছিল যে, তিনি তার মুসলিম স্বামীর মন পাওয়ার জন্য এমনটি করেছেন।

মেক্সিকো এবং পুয়ের্তো রিকান বংশোদ্ভূত নাভারেত বলেন, ‘আমার বন্ধু এবং আমার পরিবারের লোকজন ভেবেছিল আমি মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়েছি, কিন্তু আসলে এরকম কোনো কিছুই ঘটে নি। প্রথমে আমার পিতামাতা এ বিষয়টি বুঝতে পারে নি, কিন্তু আমি শুধুমাত্র মজা তথা আনন্দ করার জন্য ইসলাম গ্রহণ করিনি এমনটি জানতে পেরে তারা এখন এ বিষয়টি গ্রহণ করে নিয়েছেন।’

স্টেসি নাভারেত নামের এই নারী যুক্তরাষ্ট্রের ৩.৩ মিলিয়ন মুসলিমের মত দেশটিতে বেড়ে উঠেছেন এবং সেখানকার সেন্ট লুইস নামক শহরে বসবাস করেন। তিনি একই সাথে দেশটির ৬ শতাংশ লাতিনো মুসলিমের একজন।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে Pew গবেষণা কেন্দ্রের করা এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট মুসলিমের ২০ শতাংশ হচ্ছেন ধর্মান্তরিত মুসলিম। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরো জানিয়েছে যে, গত শতাব্দীতে একমাত্র ইসলাম ধর্মই ছিল সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হওয়া একটি ধর্ম।

স্টেসি নাভারেত বলেন, ‘ট্রাম্পের আমেরিকায় বসবাস করা খুবই ভয়ের। আমি সাধারণত হিজাব পরিধান করি না যাতে করে লোকজন আমার পরিচয় সম্পর্কে জানতে না পারে। কিন্তু যখন আমি আমার স্বামী এবং সন্তানের সাথে থাকি তখন আমি এই ভয়ে থাকি যে, লোকজন হয়ত আমাদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করবে।’

স্টেসি নাভারেত জানান, তিনি ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তার স্বামীর সাথে বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন। তিনি আরো বলেন, তার স্বামী চাইছিল ট্রাম্প ক্ষমতা নেয়ার পূর্বেই যাতে তারা আবার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারেন।

তিনি বলেন, তার ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী পোশাক পরিধান করা খুবই চ্যালেঞ্জের বিষয়। ইসলামে পুরুষ এবং নারীদেরকে শালীন পোশাক পরিধান করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী, নারীদেরকে তাদের চুল এবং বক্ষদেশ ঢেকে রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে নারীদের প্রতি আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইয়াশা আব্রাহাম
ইয়াশা আব্রাহাম নামের ৩৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ নারী যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো রাজ্যে একজন ইহুদি হিসেবে বড় হয়েছেন। তিনি গত বছরের মে মাসে তার দাদার জন্মদিনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইহুদি ধর্ম থেকে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত না হয়ে তিনি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হন।

তিনি বলেন, ‘আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে না জেনে অনেক মন্তব্য করেছি এবং এক সময় তা বুঝতে পেরে আমি পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন করা শুরু করি। আমি আর কপট থাকতে চাই নি তাই আমি আমার নিজেকে শিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি কখনোই জানতাম না যে, এটি এভাবে আমার কাছে এসে ধরা দিবে। সৃষ্টিকর্তার সাথে একজন মানুষের ঠিক যে ধরনের সম্পর্ক হওয়া উচিত বলে আমি মনে করতাম তা আমি পবিত্র কুরআনে খুঁজে পাই।’

তিনি জানান, পবিত্র কুরআন তাকে এত ভালোভাবে তাওরাত অনুসরণ করার দিকনির্দেশনা দিয়েছে যে, এরকমটি তার ইহুদি ধর্ম তাকে দিতে পারে নি।

ইয়াশা আব্রাহাম একজন নাচের শিক্ষিকা। তিনি বলেন, তার নতুন ধর্ম চর্চা এখন তার কাছে সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় কারণ রক্ষণশীল মুসলিমগণ একে হয়তো ভালো চোখে দেখবেন না।

তিনি বলেন, ট্রাম্পের যুগে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম হতে হলে চতুর হতে হবে। তার ভাষায়- ‘অনেক সময় যান চলাচলের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা আমার ব্যাগ চেক করে দেখে এবং আমি সাধারণত কোথাও ভ্রমণের সময় হিজাব পরিধান করি না। আমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং আমার জীবন এসব কিছুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত।’

সারা মেকআলিস্টার
সারা মেকআলিস্টার নামের ৩৫ বছর বয়সী খ্রিষ্টান নারী ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার কয়েক মাস পূর্বে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি জানান, পবিত্র কুরআন অধ্যয়নের ফলেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে উৎসাহ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘যখন আমি পবিত্র কুরআন খুলে দেখি তখন আমার মনে হয়েছিল আমি যেন আমার হৃদয় খুলে দিয়েছি। আর আমি যখন এই বইটি পড়তে শুরু করি তখন মনে হয়েছিল এটি যেন আমাকেই পড়তে শুরু করেছে।’

লুইসিয়ানা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডিতে অধ্যয়ন করার সময় তিনি পুরোপুরি হিজাব পরিধান করা শুরু করেন।

তিনি বলেন, ‘আমি তখন অনুভব করতে শুরু করি যে, শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা আমার মুসলিম হওয়া এবং হিজাব পরিধান করা দেখে নিজেদের শ্বেতাঙ্গ হওয়াটাকে অপরাধ মনে করছিল।’

তিনি আরো বলেন, লোকজন হয়তো আমাকে ভিন্নভাবে দেখত যদি আমি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত কেউ হতাম আর এখন লোকজন আমাকে দেখে একজন মগজ ধোলাই হওয়া নারী হিসেবে।

সারা মেকআলিস্টার বলেন, ‘একজন শিক্ষিত শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা অনেকের কাছে বিশ্বাসঘাতকতা করার মত ব্যাপার বলে বিবেচিত হয়। অনেক অপরিচিত মানুষ আমার নিকট জানতে চায় আমি ঠিক কোথা থেকে এসেছি এবং ঠিক কেনই বা আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার মত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সূত্র: মিক ডট কম।