বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত, খ্রিস্টানদের গির্জার জিম্মাদার মুসলিম সহোদর!

খ্রিস্টানদের গির্জার জিম্মাদার মুসলিম সহোদর

নিউজ ডেস্ক
ঢাকা: খ্রিষ্টান অধ্যুষিত পাশ্চাত্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি ধারণা, মুসলমানেরা গোঁড়া, সন্ত্রাসী এবং খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের প্রতি বৈরীমনোভাবাপন্ন। এ দিকে, বিশেষ করে গত দুই দশকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নানাভাবে হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে পশ্চিমা জগতে। অথচ ইসলাম ধর্মাবলম্বী একটি পরিবার সততা, নিরপেক্ষতা ও সুবিচারবোধের কারণে এমনই চিরস্থায়ী আস্থা অর্জন করেছে যে, বিশ্বে খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গির্জাটির চাবি সহস্রাধিক বছর ধরে তাদের হেফাজতে। লন্ডনের দি টাইমস পত্রিকা এ বিষয়ে একটি চমকপ্রদ লেখা ছাপা হয়েছে। জেরুসালেম থেকে এটি পাঠিয়েছেন শিরা ফ্রেঙ্কেল। শিরোনাম Muslim family still proud to hold key for Christian church (খ্রিষ্টানদের গির্জার চাবি রাখায় মুসলিম পরিবারটি আজো গর্বিত)।

গত ৪০ বছর ধরে প্রতিটি সকালে ওয়াজিহ নুসেইবাহ কাঠের সেই সরু সিঁড়িটি বেয়ে উঠে গির্জার দরজা খুলে দিয়েছেন। এই গির্জার নাম ‘চার্চ অব হলি সেপালকর’। জেরুসালেমের গির্জাটি খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের কাছে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ গির্জা।

শত শত বছরের যে রীতি নুসেইবাহ পরিবারের মাধ্যমে বজায় রয়েছে, সে মোতাবেক ওয়াজিহ গির্জার দরজায় তিনবার টোকা দিয়ে ১২ ইঞ্চি মাপের একটি লোহার তালা টেনে বের করে আনেন। এতে গির্জার তোরণ হয়ে যায় উন্মুক্ত। (খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুসারে) এখানেই যিশুখ্রিষ্ট ক্রুশবিদ্ধ, সমাহিত ও পুনরুত্থিত হয়েছিলেন।

যা হোক, গত মার্চ মাসের শেষ দিকে ইস্টার দিবস উপলক্ষে হাজার হাজার খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রী এই গির্জায় সমবেত হলেও হয়তো তাদের কেউ জানে না, তাদের এই ধর্মীয় পবিত্র স্থাপনার চাবি ন্যস্ত মুসলমানের হাতে।

ওয়াজিহ নুসেইবাহর পূর্বপুরুষেরা এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন যে কারণে, তা হলো তাদের দীর্ঘ দিনের সেবা এবং সেই সাথে খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহিংস দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত মোকাবেলার যোগ্যতা।

নুসেইবাহ (৬২) বললেন, ‘হলি সেপালকর চার্চের চাবির হেফাজতকারী আমি।’ তখন গুড ফ্রাইডের তীর্থযাত্রীরা জেরুসালেমের পুরনো শহরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

নুসেইবাহ বলছিলেন, এই লোকগুলো এবং আমিও অনুভব করি কাজটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমার পরিবার এতগুলো বছর ধরে ঐতিহ্যটি ধরে রাখা কত না চমৎকার। আমার পরিবার এই মর্যাদা লাভ করতে থাকবে এ কথা ভাবলে গর্ব হয় বৈ কি!

চলতি বছর নুসেইবাহ তার ছেলে ওবেদিয়াকে অর্পণ করবেন গির্জার চাবি রাখার দায়িত্ব। ওবেদিয়া দিনের বেলায় কেশসজ্জার কাজ করে থাকে। ইস্টার উৎসবের পর সে বাবার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবে। তাকেও প্রতিদিন ভোর ৪টায় গির্জায় এসে দুয়ার খুলতে হবে। আর রাত ৮টা বাজলেই তালা দিতে হবে দুয়ারে।

‘শুরুতে আমার কাজ ঠিকমতো করতে পারব না ভেবে নার্ভাস বোধ করছি। অনেক রীতিনীতির কথাই মনে রাখতে হয়। অবশ্য কয়েক বছর ধরে ভালোভাবে দেখছি, বাবা কাজটা কিভাবে করছেন। মনে হয়, এত দিনে কাজটা আমার ভালোই শেখা হয়ে গেছে।’ ওবেদিয়া এর সাথে যোগ করলেন, বাবা আমাকে উপদেশ দিয়েছেন নিরপেক্ষ থাকতে। আর কাজটা যে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক, সেটা মনে রাখতে বলেছেন।

ওয়াজিহ নুসেইবাহ বললেন, গির্জার ভেতরে যে ‘রাজনীতি’ আছে, তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা সব সময় সহজ নয়। কারণ এই গির্জায় উপাসনাকারী খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায় একটি অধিকারকে কেন্দ্র করে। তা হলো, গির্জার কোনো একটি নির্দিষ্ট জানালা পরিষ্কার করা কিংবা কয়েকটি সিঁড়ি ঝাড়– দেয়া।

২০০৮ সালে অর্থোডক্স পাম সানডের দিন আর্মেনিয়ান ও গ্রিস চার্চ অনুসারীরা মারামারিতে লিপ্ত হয়েছিলেন। ‘যিশুর সমাধি’র কাছে অবস্থান নেয়া জনৈক যাজককে একটু সরে যেতে বলায় তুমুল কাণ্ড ঘটে যায়। তখন দু’জন ধর্মযাজক একে অন্যকে চড়থাপ্পর মারছিলেন। হাঙ্গামা থামাতে ডাকতে হয়েছিল পুলিশ।

ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের শাসন যখন চলছিল, তখন এই গির্জায় নিজ নিজ অংশের দখলদারি বজায় রাখা নিয়ে খ্রিষ্টানদের নানা উপদলের মধ্যে সঙ্ঘাত দেখা দিত। তাদের এসব রেষারেষি থামাতে বন্দুকের আগায় বেয়নেট লাগিয়ে সৈন্যদের এসে দাঁড়াতে হতো।
ওয়াজিহ বললেন, কিছু লোক মনে করেন এটা নিয়তির পরিহাস যে, গির্জার চাবি থাকে মুসলমানের হাতে। তবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের প্রজ্ঞার কারণে বুঝেছিলেন, শান্তি বজায় রাখার এটাই একমাত্র উপায়।’

নুসেইবাহ পরিবারকে এই চাবির হেফাজতকারী সর্বপ্রথম বানানো হয়েছিল যখন খলিফা হজরত উমর বিন খাত্তাব রা: ৬৩৮ সালে জেরুসালেম জয় করেছিলেন।

পরিবারটির এই কাজে ছেদ পড়েছিল কেবল ক্রুসেডের সময়ে। দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডারদের শাসন চলেছিল ৮৮ বছর। ১১৮৭ সালে সালাহুদ্দিন জেরুসালেম আবার অধিকার করেছিলেন। তখন তিনি ‘সিংহহৃদয়’ রিচার্ডকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, গির্জার চাবি রাখার দায়িত্ব আবার নুসেইবাহদের দেয়া হবে।

ওই সময় থেকে খ্রিষ্টানদের তিনটি প্রধান অংশ গ্রিস অর্থোডক্স, রোমান ক্যাথলিক ও আর্মেনিয়ান প্রতি বছর একটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নুসেইবাহদের দায়িত্ব নবায়ন করে থাকে। তখন তাদের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয় গির্জার ‘জিম্মাদার ও প্রহরী’ হওয়ার জন্য। নুসেইবাহ পরিবার তাদের পরিচিতিকার্ডে গর্বের সাথে পদবিটি ব্যবহার করে আসছে।

ওয়াজিহ নুসেইবাহ বলছিলেন, বাবা যখন এ দায়িত্ব আমাকে দিলেন, আমি সম্ভবত প্রথমে ঐতিহ্যটি তত ‘সিরিয়াস’ভাবে গ্রহণ করিনি। অবশ্য বয়স বাড়ার সাথে সাথে কাজটির প্রতি ভালোবাসাও বেড়েছে। ২২ বছর বয়সে তিনি এই দায়িত্ব পালনের ট্রেনিং নিতে শুরু করেছিলেন। গত বছরের শেষ দিকে দ্বিতীয়বারের মতো হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় তিনি কাজের ভার ছেলে ওবেদিয়ায় ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন।

ওয়াজিহ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, চিরদিন আমি থাকব না। তাই ঐতিহ্যটা যাতে আমার পরও বজায় থাকে, তা আমাকে নিশ্চিত করতে হবে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।’

গির্জার পুরো চত্বর ভরে গিয়েছিল তীর্থযাত্রীতে। এ সময়ে অতীতের কথা মনে এনে ওয়াজিহ বলছিলেন, আমার দিনগুলো কেটেছে ভালোই। যখন এ দায়িত্ব নিই, তখন থেকে পরিবর্তন এসেছে অনেক। তখন তো তীর্থযাত্রীরা তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাতে হাঁটু ভর দিয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে গির্জায় পৌঁছতেন। আর এখন তারা আইফোন ক্যামেরা দিয়ে গির্জার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এখানে পৌঁছে যান। গির্জায় পা রাখার আগেই ওই ক্যামেরায় তোলা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে দিচ্ছেন। এরা নতুন জেনারেশন যারা আগের চেয়ে অনেক আলাদা।

তবে একটা বিষয় অপরিবর্তিত থাকায় ওয়াজিহ খুশি। বললেন, যদ্দিন নুসেইবাহরা আছে, আমাদের কাছেই থাকবে গির্জার চাবি।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।