যুক্তরাষ্ট্রে স্পেনিশভাষীদের ইসলামে ধর্মান্তরের গল্প

নিউজ ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ কোটির মতো স্প্যানিশ-ভাষী মানুষের বাস, যারা দেশটির প্রধান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

এই ল্যাটিনোদের বেশিরভাগের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ক্যাথলিক খ্রিস্টান হিসেবে।

কিন্তু ইদানিং তাদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার প্রবণতা বাড়ছে।

ধর্মান্তরিত এই ল্যাটিনোদের সংখ্যা আনুমানিক দুই লাখের মতো।

মার্কিন স্প্যানিশ-ভাষীদের ৮০ শতাংশ বাস করে নিউ জার্সির ইউনিয়ন সিটিতে। এছাড়াও শিকাগো শহরেও তাদের বসবাস একেবারে কম নয়।

চিকাগো সানটাইমস ডটকমে প্রকাশিত অ্যালেক্সজান্দ্রা আরিয়াজা একটি নিবন্ধে বলা হয়, শিকাগোর মরটন গ্রুভের মসজিদে মুসলিম সম্প্রদায়ের পুরুষরা পাশাপাশি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। তাদের পিছনে নারীরাও আলাদা স্থানে মাথায় হিজাব পরিধান করে নামাজ আদায় করেন। একই সময়ে শিকাগো সহ বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমরাও মক্কার দিকে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

মর্টন গ্রোভের মসজিদের মুসল্লিরা আরবি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন। তাদের বেশিরভাগের শিকড়ই ভারত, পাকিস্তান, জর্ডান এবং প্যালেস্টাইনে। সেখানে কিছু স্প্যানিশ ভাষাও শোনা গেছে।

মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, পুয়ের্তো রিকো এবং পেরু থেকে আসা এসব মুসলিমরা বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অংশ; যাদের প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়।

শিকাগো এলাকায় ঠিক কতজন ল্যাটিনো মুসলমান বাস করে তা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই হচ্ছে ল্যাটিনো। কিন্তু বিভিন্ন ধারণা অনুযায়ী, সেখানে শহর ও উপশহর মিলিয়ে ১৩০টি মসজিদ রয়েছে। সেখানে ধর্মান্তরিত ল্যাটিনো মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে।

ল্যাটিনো-আমেরিকান দাউয়াহ সংস্থার সাবেক পরিচালক জুয়ান গালভেন জানান, সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মুসলিম রয়েছে। ল্যাটিনো মুসলিম জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশের বসবাস শিকাগোতে বলে তিনি জানান।

সংগঠনটির বর্তমান পরিচালক এবং ইনার-সিটি মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্কের একজন অ্যাটর্নি অ্যারোন সাইবার্ট-লারিয়া জানান, কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম জনসংখ্যা শিকাগোতে প্রধানতম মুসলিম গোষ্ঠী।

তিনি জানান, ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ও দক্ষিণপশ্চিমাংশে পৃথকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার এবং আরব মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের সঙ্গে অন্যান্য অভিবাসী গোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করে।

তিনি বলেন, ‘শিকাগোতে সব সময়েই বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। তবে, এখানকার মুসলিম অভিবাসীরা একই ধরনের প্যাটার্ন অনুসরণ করেন।’

সিয়বার্ট-লারিয়া জানান, শিকাগোর ল্যাটিনো মুসলমানেরা অন্য শহরের তুলনায় আরো বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর উপাসনার জন্য হিউস্টনে ২০১৬ সালে ‘সেন্ট্রো ইসলামিক মসজিদ’ খুলে দেয়া হয়।

কিন্তু শিকাগোতে পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমানভাবে চিহৃ দেখা যাচ্ছে। হিউস্টনে স্প্যানিশ ভাষায় গঠিত ইসলামি সংগঠন এখন শিকাগো চ্যাপ্টারে স্থান পেয়েছে। ‘ওজালা’ নামে একটি নতুন অলাভজনক সংস্থা গঠন করার মাধ্যমে তরুণ ল্যাটিনো মুসলিমরা এখানে জড়ো হচ্ছেন এবং তাদের নিজস্ব মসজিদ স্থাপনের চেষ্টা করছেন।

ফেলিসিয়া সালামাহ, যিনি তার স্বামী ও দুই পুত্রের সঙ্গে অরল্যান্ড পার্কে বসবাস করেন। তিনি নিকটবর্তী একটি মসজিদে নামাজ আদায় করে থাকেন এবং তার বড় ছেলেকে পার্শ্ববর্তী একটি মুসলিম স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন; যেখানে তিনি আরবি ভাষায় কোরআন পড়া শিখছেন।

ফেলিসিয়ার মা একজন মেক্সিকান ক্যাথলিক এবং বাবা একজন ফিলিস্তিনি মুসলিম।

অন্যান্য ল্যাটিনো মুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে ইসলামের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। স্প্যানিশ গ্রুপের অন্যান্য মুসলিদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি হিজাব পরিধানের দিকে আরো বেশি অগ্রসর হন। তিনি ইসলাম সম্পর্কে আরো শিখছেন এবং সারাদেশের ল্যাটিনো মুসলমানদের সঙ্গে দেখা করার জন্য টেক্সাসে ভ্রমণ করেছেন।

সালামাহ বলেন, ‘সেখানে আমি মেক্সিকান এবং পুয়ের্তো রিকানস এবং কলম্বিয়ান মুসলিমদের দেখতে পেয়ে খুব ভাল লেগেছিল।’

তিনি বলেন, ‘যদি কোনো ল্যাটিনো ইংরেজী বলতে না পারেন, তবে তারা তাদের স্প্যানিশ ভাষায় ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে থাকেন।’

অনেক ল্যাটিনোর ইসলাম গ্রহণ করার পেছনে শক্তিশালী ক্যাথলিক সংস্কৃতি একটি কারণ হতে পারে বলে সালামাহ মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘ক্যাথলিক বা খ্রিস্টানদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেন যে, এটি সেই সমস্ত জিনিস যা তারা ইতোমধ্যেই বিশ্বাস করেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইসলামই একমাত্র অ-খ্রিস্টীয় বিশ্বাস যা যিশুকে বিশ্বাস করে।’

এদিকে সিজিটিএন’র ফিল লাভেলি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ল্যাটিনরা ব্যাপক সংখ্যায় ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছেন, বিশেষকরে ল্যটিন নারীরা। বলা চলে তারা হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত ক্রমবর্ধমান জাতিগত গোষ্ঠী। কিন্তু দেশটিতে বসবাসরত ল্যাটিন-আমেরিকান নারীদের জন্য ক্যাথলিক ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তর খুব সহজ নয়।

কেউ কেউ বলছেন, এসব নারীরা আরব হবার জন্য তাদের ঐতিহ্যকে ত্যাগ করছে। তবে যারা ইসলামে ধর্মান্তর হচ্ছেন তাদের অনেকের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন রাজনৈতিক সময়।

লুসি সিলভা একজন মুসলিম। তিনি ১৮ বছর আগে ক্যাথলিক ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন।

তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ আছে যারা হঠাৎ করেই ধর্মান্তরিত হন এবং হিজাব পরা শুরু করেন। কিন্তু আমি ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার পদক্ষেপ নেয়ার আগে অনেক সময় নিয়ে বিস্তর গবেষণা করার পরই এটি গ্রহণ করি।’

তিনি ছিলেন একবার মেক্সিকান ও ক্যাথলিক এবং বর্তমানে একজন মেক্সিকান ও মুসলিম।

লুসি বলেন, ‘তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমান করে নেয় যে, আমি আরব কিংবা সেখান থেকে এসেছি। সুতরাং তারা যখন আমাকে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে শুনে বিশেষকরে যখন আমি কোনো মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে অথবা আমি আমার মা বা ছেলের সঙ্গে কথা বলছি তখন তারা বেশ আশ্চর্য হয়ে যায়। তারা বলে, ‘আপনি কোথা থেকে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে শিখলেন? তখন আমি বলি, ‘ওয়েল, আমি একজন মেক্সিকান।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঠিক কতজন লাতিনো এবং লাতিনা মুসলমান রয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কারণ তাদের নিয়ে কখনো কোনো সরকারি গবেষণা করা হয়নি। কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন তাদের এই সংখ্যা ১৫০,০০০ থেকে ২০০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে।

ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাদের ৯০ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলিম এবং এদের অধিকাংশই নারী।

সত্য বলতে, লাতিনো এবং লাতিনা মুসলমানরা হচ্ছেন ইসলামের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান জাতিগত গ্রুপ।

অরেঞ্জ কাউন্টির ইসলামিক ইন্সটিটিউটের ইমাম মোস্তফা উমর বলেন, ‘তাদের অনেকের মূল্যবোধের ধারা ইতোমধ্যে রক্ষণশীল মূল্যবোধে পরিণত হচ্ছে। যীশুর প্রতি তাদের উচ্চ সম্মান রয়েছে; যাকে আমরা ইসলামে নবী বলে থাকি। যীশুর মা মরিয়মের জন্যও তাদের উচ্চ সম্মান রয়েছে। তাই সেখানে ধর্ম, ঈশ্বরের ধারণা এবং ঈশ্বরের জন্য ভালবাসা- এই ধরনের সংযোগ রয়েছে।’

উয়ান্ডা নামে আরেক ধর্মান্তরিত তরুণী বলেন, ‘আপনি যদি একটি ঐতিহ্যগত হিস্পানিক পরিবারে বড় হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে এটি ইসলামের অনুরূপ।’

তিনি পুয়ের্তো রিকো থেকে এসেছেন এবং একজন কিশোরী হিসাবে ৯/১১ এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন।

ওয়ান্ডা বলেন, ‘আমার বয়স যখন ১১ বছর তখন আমি ড্রাগ ও অ্যালকোহলের প্রতি আসক্ত ছিলাম এবং আমার জন্য ইসলাম একটি স্থিতিশীল কাঠামোর চেয়েও বেশি কিছু ছিল।’

কিন্তু একটি কঠোর ক্যাথলিক পটভূমি থেকে এসে ইসলাম গ্রহণ করাটা আমার জন্য অতটা সহজ ছিল না।

ওয়ান্ডা বলেন, ‘আমার ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়া কারণ বুঝতে আমার মায়ের প্রায় পাঁচ বছর লাগে। এটি বুঝতে পারা তার জন্য বেশ কঠিন ছিল। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আমাকে ঘর থেকে ছুড়ে ফেলে দেন। আমি বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হই। ওই সময় আমি ছিলাম মাত্রই ১৬ বছরের কিশোরী।’

তিনি আরো বলেন, ‘তারপরে একদিন আমার মা আমাকে ফোন দেন এবং বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করেন এবং তার সঙ্গে থাকার জন্য বলেন। তিনি আমাকে বলেন, আমি কেন মুসলিম হয়েছি তা বুঝার জন্য তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং তিনি তার মনোভাবের পরিবর্তন আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। এখন আমাদের মধ্যে একটি আশ্চর্যজনক সম্পর্ক বিরাজ করছে এবং এটি দেখতে অত্যন্ত চমৎকার।’

উয়ান্ডা এবং লুসির মত নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন, বিশেষকরে যখন ধর্মীয়, ঐতিহ্য এবং লিঙ্গের সঙ্গে রাজনীতির মিশ্রণ ঘটে। কিন্তু তাদের আশা কিংবা তাদের পরিচয় প্রত্যাখ্যান না করতে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।