ধান কাটার নামে ‘ফটোসেশন’, কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?

নাগিব বাহার বিবিসি বাংলা, ঢাকা: সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্প্রতি বহু ছবি ভাইরাল হচ্ছে যেখানে দেখা যাচ্ছে সরকারদলীয় নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা দলবল নিয়ে ধান কাটছেন। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে জারি করা লকডাউনের কারণে ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, তাই কৃষকদের এভাবে সাহায্য করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। কিন্তু এসব ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হচ্ছে বিস্তর সমালোচনা।

কেউ কেউ লিখছেন, এমপি মন্ত্রীরা দলবল নিয়ে মূলতঃ ধান কাটার নামে ‘ফটোসেশন’ করছেন। আর এটা করতে গিয়ে ধান কাটার কাজটাই ঠিকমতো করছেন না তারা, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে কৃষকদের ক্ষতি করছেন তারা।

কৃষকদের অনেকেই অভিযোগ করেন যে ধান কাটার ছবি তোলা বা ভিডিও করা শেষ হওয়ার পরই সাহায্য করতে আসা ব্যক্তিরা চলে যান।

বুধবার সকালে সুনামগঞ্জে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে হওয়া ধান কাটার সেরকম এক অনুষ্ঠান নিয়ে নানা সমালোচনা করছেন বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান-সহ মোট ৬ জন সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের অনেকে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওই ধানকাটা অনুষ্ঠানের ছবি তুলছেন বহু মানুষ, এটা করতে গিয়ে তারা ক্ষেতের পাকা ধান একেবারে মাড়িয়ে ফেলছেন।

সমালোচনার কী উত্তর দিচ্ছেন দায়িত্বশীলরা?
সুনামগেঞ্জর আলোচিত ওই ধান কাটার অনুষ্ঠানটিকে অবশ্য ‘প্রতিকী’ বলে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান।

বিবিসিকে তিনি বলেন, “প্রতীকী ধান কাটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু মানুষ যদি অনুপ্রাণিত হয় এবং কৃষকদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, তাহলে আপত্তি কোথায়?”

তবে তাদের প্রতীকী অনুষ্ঠানের সময় সেখানে উপস্থিত মানুষ করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জারি করা সামাজিক দূরত্ব মানার নির্দেশ মানছিলেন না বলে স্বীকার করেন মি. মান্নান।

“সেখানে পুলিশ বারবার হ্যান্ডমাইক দিয়ে মানুষজনকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু পরিস্থিতি ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। তাই আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান শেষ করি।”
কাঁচা ধান কাটার অভিযোগ:

এর আগে টাঙ্গাইলের একটি এলাকায় একজন সংসদ সদস্য দলবল নিয়ে একজন কৃষকের কাঁচা ধান কেটে ফেলেছিলেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন অনেক ফেসবুক ব্যবহারকারী।

এমন একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরালও হয় যেখানে টাঙ্গাইল-২ আসনের সংসদ সদস্য তানভীর আহমেদ ছোট মনিরকে দেখা যায় সঙ্গীদের নিয়ে যে ধান কাটছেন তার রং সবুজ সোনালী নয়।

পরে অবশ্য তিনি বিবিসিকে বলেন, ধানগুলো পাকাই ছিল। ওই ক্ষেতের মালিক তিনি যাওয়ার আগেই ক্ষেতের অধিকাংশ ধান কেটে ফেলেছিলেন।

তার শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ ছিল না তাই সাহায্য করতে গিয়েছিলেন।

পরে টাঙ্গাইলের একজন কৃষি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, বোরো মৌসুমের এই ধানগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে পেকে গেলেও রং বদলায় না।

তাতে অবশ্য সমালোচনা থামেনি।

প্রতিদিনই ধান কেটে সাহায্য করার নানা ভঙ্গিমার ছবি ফেসবুকে আসছে আর সমালোচনা বাড়ছেই।
কেন এই সাহায্য?

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধান কাটা না হলে বৃষ্টিতে সেখানে পানি উঠে ব্যাপক ক্ষতি হয় ফসলের।

এ’সময়ে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিকরা হাওর এলাকায় ধান কাটার জন্য এসে থাকে। তবে এবছর করোনাভাইরাস প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে কার্যত ‘লকডাউন’ থাকায় সময়মতো শ্রমিকরা যেতে পারেনি ধান কাটতে।

তবে এই শ্রমিকরা যেন তাদের নিজ এলাকা থেকে ধান কাটতে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে কিছুদিন আগে সরকার বিশেষ পরিবহণের ব্যবস্থা করে।

পাশাপাশি শ্রমিকরা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাওর এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করে নোটিশ জারি করা হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

তবে বাংলাদেশের কৃষিখাতে প্রয়োজন অনুপাতে শ্রমিকের ঘাটতি থাকায় এবং সব এলাকায় সময়মতো শ্রমিক না পৌঁছানোয় বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের কৃষকদের ধান কাটায় সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়।

দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় ছাত্রলীগের কর্মীরা কৃষকদের ধান কাটতে সহায়তা করলেও অনেক জায়গাতেই ছাত্রলীগের কর্মীরা শুধু ‘ফটোসেশন’ করেই দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকদের অনেকে।

এই প্রসঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, “কেউ কেউ হয়তো নিছক মজা করতে অথবা ছবি তুলতে গিয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগ, কৃষকলীগের কর্মীদের অনেকে কৃষকদের ধান কাটায় সাহায্য করেছে, এটাও সত্যি।”

“করোনাভাইরাসে লকডাউন থাকায় এবার শ্রমিক পাওয়া যাবে না, এই আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল। তাই অনেক জায়গায় ছাত্রলীগ, কৃষকলীগের ছেলেমেয়েরা স্বপ্রণোদিত হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।”

তিনি মন্তব্য করেন কোথাও কোথাও শুধু দেখানোর জন্য ধান কাটার অনুষ্ঠান করা হলেও অনেক জায়গাতেই ‘প্রতীকী’ ধান কাটার অনুষ্ঠানের ছবি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

‘অগ্রাধিকার’ ভিত্তিতে কাজ করা উচিত দায়িত্বশীলদের

সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামিনা লুতফা মনে করেন বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে মূলধারার গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া নিজেকে প্রকাশের মঞ্চ হিসেবে কাজ করায় রাজনৈতিক কর্মীরা মিডিয়াকে ব্যবহার করে নিজের প্রচারের নিশ্চয়তা চায় বলে ক্রমাগত এই ধরণের ঘটনা ঘটছে।

তিনি বলেন, “অনেকে মিলে একজনকে ত্রাণ দিচ্ছে বা ত্রাণ দিয়ে ছবি তোলার পর ত্রাণ আবার ফেরত নিয়ে নিচ্ছে – এমন ঘটনাও আমরা শুনেছি।”

“সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্বশীলরা সময়মতো তাদের আসল কাজটি করেননি, তাই এখন তাদের ব্যর্থতাটা প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। আর নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এখন এরকম লোক দেখানো কাজকর্ম করছেন তারা।”

সুষ্ঠু সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ধান কাটার মত কার্যক্রমের সুফল ভোগ করা সম্ভব হবে না বলে সামিনা লুতফা মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, “কৃষকের ধান কেটে দেয়ার চেয়ে তারা ধানের সঠিক দাম পায় কিনা, তা নিশ্চিত করা উচিত।”

“লকডাউনের সময় বহু এলাকায় লাখ লাখ মানুষের ঘরে খাবার নেই। এই ধান কেটে কী লাভ যদি তা মানুষের ঘরে পৌঁছেই দেয়া না যায়?”

সুষ্ঠু সরবরাহ পদ্ধতি থাকলে বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদিত পচনশীল পণ্য – দুধ, ডিম, সবজি – সময়মত বাজারজাত করলে এই লকডাউনের মধ্যে আরো কম সংখ্যক মানুষ খাদ্যাভাবে পড়তো বলে মনে করেন তিনি।

“সত্যিকারের সদিচ্ছা এবং প্রস্তুতি থাকলে কৃষি মন্ত্রণালয় তার আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজার পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারতো।”

“এখন তাদের ব্যর্থতা সামনে আসায় নানা ধরনের কাজকর্ম করে তারা মানুষের মনোযোগ ঘুরানোর চেষ্টা করছেন,” বলেন সামিনা লুতফা।