পোপ ফ্রান্সিসকে রাজকীয় বিরল সংবর্ধনা, তিন দিন ঢাকায় যা করবেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: অনেক জল্পনা-কল্পনায় মায়ানমার সফরের পর পোপ ফ্রান্সিস তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান বিশ্বের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস।

বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অভ্যর্থনা জানান পোপ ফ্রান্সিসকে। এ সময় পোপকে গার্ড অব অনারও দেয়া হয়।

দুই পরিচয়ে পোপের এবারের এই সফর। প্রথমত, ৩১৯ একর আয়তনের ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যাবেন এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। প্রধানমন্ত্রীও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তবে পোপ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন না।

দ্বিতীয়ত, রোমান ক্যাথলিক গির্জার মহামহিম ও সর্বজনীন যাজক হিসেবেও পোপ ফ্রান্সিস এই সফরে আসছেন। ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় পোপ জন পলের সফরের সময় আর্মি স্টেডিয়ামে প্রায় ৫০ হাজার ক্যাথলিক খ্রিষ্টানের সমাগম ঘটেছিল। এবারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে ৮০ হাজার ক্যাথলিকের উপস্থিতির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ সব মানুষের কাছে তার এই আগমন জনগণের আত্মার প্রতি একধরনের তীর্থযাত্রা বলেও গণ্য হবে।

একজন আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তিনি আসবেন। দেশের খ্রিষ্টান ধর্মগুরু, যুবক ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের উদ্দেশে তিনি বক্তব্য দেবেন।

আগামী শনিবার বিকেলে পোপ ফ্রান্সিস ঢাকা ত্যাগ করবেন।

তবে তার এ সফর চলমান রোহিঙ্গা সংকটের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই সবার দৃষ্টি থাকবে। যদিও তিনি মায়ানমার সফরকালে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ করেননি, তবে ঢাকায় সফরকালে একদল রোহিঙ্গাকে পোপের সঙ্গে দেখা করতে আনা হচ্ছে। তিনি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত নিষ্ঠুরতার বর্ণনা সরাসরি তাদের কাছ থেকে শোনবেন।

পোপ মায়ানমার সফরকালে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিসহ দেশটির সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাংলাদেশে পোপের আগমন উপলক্ষে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় কাকরাইলে আর্চবিশপ হাউসকে পোপের ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠেয় প্রার্থনায় অংশ নিতেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। ঢাকায় নিযুক্ত ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত জর্জ কোচারিও বুধবার বলেন, ‘পোপের সফরের সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।’

এদিকে পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশে আগমন উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার ও স্থানীয় ক্যাথলিকমণ্ডলীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সফর করার কর্মসূচি গ্রহণ করায় আমি মহামান্য পোপের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

তার এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভ্যাটিকানের মধ্যকার সম্পর্ক আরও জোরদার ও ঘনিষ্ঠ হবে বলে আমার বিশ্বাস।

পোপের আগমন উপলক্ষে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পোপের বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থল এবং চলাচলের পথে থাকছে কয়েক স্তরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী। বিশেষ বিমানে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় ইয়াঙ্গুন থেকে সরাসরি হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

বিমানবন্দর থেকে তিনি সরাসরি সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তারপর তিনি বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সেখানে তিনি স্মৃতিগ্রন্থে স্বাক্ষর করেন।

পোপ প্রথম দিনেই বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সুশীল সমাজ ও কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে পোপ বক্তব্য রাখবেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে শুক্রবার সকাল ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খ্রিস্টধর্মীয় উপাসনা ও যাজক অভিষেক অনুষ্ঠানে পোপ বক্তব্য রাখবেন।

একই দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পোপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বিকালে ক্যাথিড্রাল পরিদর্শন করবেন এবং রমনায় প্রবীণ যাজক ভবনে পোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশপদের বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পোপ বক্তব্য রাখবেন। তারপর আর্চবিশপ হাউসের মাঠে শান্তির জন্য আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃমান্ডলিক সমাবেশে পোপ বক্তব্য রাখবেন।

পোপ তার সফরের শেষদিন শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে মাদার তেরেসা ভবন ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করবেন। তারপর তেজগাঁও গির্জায় যাজকবর্গ, ব্রাদার-সিস্টার, সেমিনারিয়ান ও নবিশদের সমাবেশে পোপ বক্তব্য রাখবেন। তিনি তেজগাঁওয়ে পুরনো গির্জা পরিদর্শন করবেন। বিকালে নটর ডেম কলেজে যুব সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখবেন। শনিবার ৫টার দিকে রোমের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন।

সফরকালে পোপ লা মেরিডিয়ান হোটেলে থাকবেন। ওই হোটেলে বিশাল মিডিয়া সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। পোপের সফর কভার করার জন্য প্রায় ৩০০ বিদেশি সাংবাদিক ঢাকায় আসছেন। রোহিঙ্গা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে পোপের এবারের ঢাকা সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ইতিপূর্বে ভ্যাটিকান থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা করেছিলেন পোপ ফ্রান্সিস। তখন তিনি রোহিঙ্গাদের ‘রোহিঙ্গা ভাই ও বোন’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। কিন্তু তিনি মায়ানমার সফরে যাওয়ার আগে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মায়ানমার সফরকালে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ করেন।

মায়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ উচ্চারণ না করলেও ঢাকায় এসে রোহিঙ্গা শব্দ আবার ব্যবহার করেন কিনা, সেদিকেই এখন আগ্রহ থাকবে। বাংলাদেশের খ্রিস্টান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি’রোজারিও বলেছেন, পোপ বাংলাদেশ সফরকালে রাখাইন থেকে বিতাড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর নিষ্ঠুর দমনপীড়নের নিন্দা জানাবেন।

প্রসঙ্গত, প্রাথমিকভাবে পোপ ভারত ও বাংলাদেশ সফর করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি তার সফরের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মায়ানমার ও বাংলাদেশ সফর করার সিদ্ধান্ত নেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।