রাজনীতিতে উত্তাপ: কোন পথে হাসিনা-খালেদা, নির্বাচন না আন্দোলন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: রাজনীতিতে ফের উত্তাপ ছড়াচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। লক্ষ্য একটাই পরস্পরকে ঘায়েল করে নিজেদের পক্ষে জনমত গঠন করা। প্রধান দুই দলের এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই ছোট ছোট দলগুলোও।সবমিলেই দেশের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

মঙ্গলবার রাতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগ এতই অপকর্ম করছে যে তারা এখন পালানোর রাস্তা খুঁজছে। কিন্তু এমন সময় সামনে আসছে যে তারা পালাতেও পারবে না।

ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘একটি দলের সাধারণ সম্পাদক যা বলেন, তা থেকে বুঝে নেওয়া যায় তিনি এমনি এমনি ওই কথা বলছেন না। তাদের পালানোর সময় হয়ে গেছে। এ জন্য তারা সম্পদ লুটানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা পালানোর জন্য তৈরি হোক, বিএনপি জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে।’

খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। তবে সে নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে, শেখ হাসিনার অধীনে নয়। তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, তার কোনোটাই সুষ্ঠু হয়নি। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলেই নির্বাচনে যাবে বিএনপি।

তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই এই বিদেশি তাবেদার জুলুমবাজ সরকারকে হটিয়ে গণতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনা হবে। সে জন্য প্রয়োজন সংগঠন। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই পুনর্গঠিত হয়েছে।

খালেদা জিয়া বলেন, লুটেরাদের জনগণ কখনো ভোট দেবে না। ৫ জানুয়ারি তারা ১৫৪টি আসন চুরি করে নিয়েছিল। এবার সেটা সম্ভব হবে না। গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাস করে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসে তাদের এটা মাথায় রাখা উচিত যে, জনগণ আবার ভোট দেবে।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আমি আমার দলের নেতাদের সতর্ক করেছিলাম, বলেছিলাম- খাই খাই ভালো না। কিন্তু তারা (বিএনপি) এখন আমার বক্তব্য নিয়ে পলিটিক্স শুরু করে দিয়েছে।

ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, আমি তিক্ততা বাড়াতে চাই না। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাওয়া ভবন আর খাওয়া ভবন তৈরির রেকর্ড নেই। ভবিষ্যতেও থাকবে না। এর আগে আমরাও ক্ষমতার বাইরে গেছি। কিন্তু আমাদের কোনো নেতা পালিয়ে যাননি। তার (খালেদা জিয়া) ছেলে রাজনীতি করবে না মুচলেকা দিয়ে পালিয়েছে। তিনি কি সে কথা ভুলে গেছেন?

বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবির বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনে সহায়ক সরকারের নিয়ম নেই। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হবে না। যে বা যারা নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা সেটা তাদের ব্যাপার।

কাদের বলেন, আমরা তো কোনো সুবিধা বা করুণা বিতরণ করছি না। নির্বাচনে অংশ নেওয়া তো তাদের অধিকার। আমরা চাই স্বচ্ছ নির্বাচন হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। আর এখন তারা হেরে যাওয়ার ভয়ে সমালোচনা করছে।

এর জবাবে বুধবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একতরফা কোনো নির্বাচনে যাবে না তার দল। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার নিয়ে সংলাপে বসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি এও বলেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে এদেশে আর কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না।

এদিকে সম্প্রতি গণভবনে হেফাজতে ইসলামের নেতা আল্লামা শফীসহ কওমী মাদ্রাসার আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বৈঠকই এখন দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছে বৈঠকটি।

এই বৈঠক এবং আগামী নির্বাচনের হিসেব-নিকেশ কষতেও শুরু করেছে রাজনৈতিকদলগুলো। এসব কারণেই ইসলামপন্থীদের গুরুত্ব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বৈঠকটি সরকার ও বিরোধী শিবিরকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। হঠাৎ এ ধরনের বৈঠক সর্বমহলকে নাড়া দিয়েছে। এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। পাশাপাশি দুই শিবিরেও সৃষ্টি হয়েছে চরম অস্বস্তি। খোদ সরকারি শিবিরে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিশেষ করে এতদিন যারা হেফাজত তথা ইসলামপন্থীদের কঠোর সমালোচনায় সরব ছিলেন তাদেরকে দারুণভাবে আঘাত করেছে।

আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকের কাছেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার নয়। তারা বলেছেন, এমন কোনো সখ্যতা হলে সেটা তাদের দল এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।

অন্যদিকে হেফাজত কোনো রাজনৈতিক না হলেও সারাদেশে তাদের একটা বিরাট জনসমর্থন রয়েছে। ফলে বিএনপিতেও এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রায় দেড় বছর বাকি থাকলেও এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী শক্তি বিএনপি। আগামী নির্বাচন যে ২০১৪ সালের মতো করা যাবে না সেটা অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে ক্ষমতাসীনরা।

ফলে বিএনপিসহ সকল দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনকে মাথায় রেখেই এগুচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। যে কারণে সাংগঠনিকভাবে শাক্তিশালী দল নিয়েই নির্বাচনী মাঠের লড়াইয়ে নামতে চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপিও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। দীর্ঘদিনের দলের দৈন্য গুছিয়ে এখন অনেকটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। নেতাকর্মিরাও মনোবল ফিরে পাচ্ছে।

জানা যাচ্ছে, দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০১৯ সালে। সংবিধান অনুয়ায়ী বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসেবে নির্বাচন ২০১৮ সালের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও এমনটা বলা হচ্ছে।

কী করবে বিএনপি?
আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে? নাকি আবারও জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পথে হাঁটছে দলটি? জাতীয় রাজনীতিতে এই প্রশ্নগুলো সামনে আসছে বারবার। এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যে যার মত দিচ্ছেন। তবে নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছেন না, কী করতে যাচ্ছে বিএনপি।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও আছে অনিশ্চয়তার দোলাচল। সবাই কথা বলছেন প্রায় একই সুরে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে তারা যাচ্ছে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরনো দাবি সামনে আসছে নতুন করে। এই দাবি আদায়ে আন্দোলনের খসড়াও তৈরি করছে দলটি। যেমনটা করেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে। তখন লাগাতার হরতাল-অবরোধ করেও নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি দলটি। নির্বাচন হয়েছে। আন্দোলন গতি হারিয়েছে। সেই গতি আজও ফেরেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি তাদের দাবির প্রতি অনড় রইলেও এ ব্যাপারে সরকারের কোনো নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে না। তাছাড়া বিএনপির দাবি মানতে হলে সংবিধানে আবারও সংশোধনী আনতে হবে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংবিধান সংশোধনীর কোনো দায়ভার সরকার নেবেন বলেও মনে হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে বিএনপিকেই এখন বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। তা না হলে আবারও প্রশ্ন আসবে বর্জনের। তবে এ সিদ্ধান্ত ভালো হবে না বলে মনে করেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ।

তারা বলছেন, টানা এগারো বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে এরই মধ্যে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে বিএনপি। নেতা-কর্মীরা উদ্দীপনা হারিয়েছে। মাঠের রাজনীতিতে দলটির অংশগ্রহণ নেই বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। এ পরিস্থিতিতে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া দলটির জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্য দলটির তথৈবচ অবস্থা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

এর বাইরেও নির্বাচনে না গেলে ঝুঁকি থাকছে একাধিকবার সরকারে থাকা দলটির। এই ঝুঁকি নিবন্ধনের। রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের একটি ধারায় বলা আছে, পর পর দুইবার নির্বাচন বর্জন করা দল নিবন্ধন হারাবে। নিবন্ধন বাঁচাতে হলে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার সুযোগ নেই বলেই মনে হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদে এবং আগের মেয়াদে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচন ছাড়া আর কোনো নির্বাচন আওয়ামী লীগের অধীনে করতে আপত্তি ছিল না বিএনপির। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সবকটিতেই তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সবকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও মেয়র পদে ধানের শীষের প্রার্থী ছিল। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও প্রচারণায় নেমেছিলেন। দলের শীর্ষ নেতারাও বিভিন্ন সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মাঠে ছিলেন। এসব নির্বাচনে জয়ও পেয়েছে দলটির প্রার্থীরা। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেলায় এসে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে অনড় থাকছে তারা।

আন্দোলন করে ২০১৪ সালের নির্বাচন ঠেকাতে না পারা এবং এক বছর পর সরকার পতনের আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর ধরে নেয়া হয়েছিল বিএনপি এবার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনবে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়ে নমনীয় হবে। দীর্ঘদিন দলীয় কর্মসূচির বাইরেও কেটেছে দলটি। তবে একাদশ নির্বাচন যত কাছে আসছে বিএনপি আবারও তাদের নির্দলীয় সরকারের দাবি জোরদার করছে।

সম্প্রতি দলের উপদেষ্টাদের নিয়ে বসেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ওই বৈঠকে তিনি বলেন, আর যাই হোক বর্তমান সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। প্রয়োজনে আন্দোলন গড়ে তুলবেন। এ জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন সবাইকে। পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য যার যার এলাকায় গণসংযোগ বাড়ানোর নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে আপত্তি থাকলেও নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা কেমন হবে সে ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো কিছু বলেনি। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বলেছেন যথা সময়ে নির্দলীয় সরকারের রূপরেখা দেবেন তারা।

কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ এই সুরেই কথা বলছেন। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি একাদশ জাতীয় নির্বাচন করবে এবং তা শেখ হাসিনার অধীনে নয়। আমাদের নেত্রী উপযুক্ত সময়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা দেবেন। এরপরে আমরা সরকারের আচরণ দেখব, তারা (সরকার) সেই রূপরেখায় আসে কি না। সেটা দেখে প্রয়োজনে আমরা জনগণের কাছে যাব।’ তবে ‘উপযুক্ত সময়’ কখন হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। কেউ কেউ বলছেন, নতুন রূপরেখা নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিই চূড়ান্ত।

বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, জনগণই আন্দোলনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করবে। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, জনগণের অধিকার জনগণই প্রতিষ্ঠা করবে, রাস্তায় নেমে প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা জনগণের সাথে থাকব। জনগণ তাদের ভোটের অধিকারের দাবি আদায় করেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবে।’

বর্তমান সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আস্থা পেলেও জাতীয় নির্বাচনে আস্থা পাচ্ছে না বিএনপি। কারণও বলছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ। বিএনপি ধরেই নিয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে গেলে ওই নির্বাচনে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কোনো ভূমিকা থাকবে না। কারণ প্রশাসন ছাড়া নির্বাচন কমিশনকে তারা দুর্বল ভাবছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনমুখী দল। আমরা নির্বাচনে যেতে আগ্রহী। কিন্তু দেশের যে অবস্থা তাতে পরিবর্তন আনতে হলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে প্রশাসনের মাধ্যমে যেভাবে প্রভাব বিস্তার করা হয়, বিনাভোটে নির্বাচিত হয় সেই নির্বাচন আমরা চাই না। জনগণও অতিষ্ঠ। তারাও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। আমরা সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছি, করে যাব। সরকার সরকারের কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি হবে সেটা পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। তবে এখন আমরা নির্বাচনের পাশাপাশি আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরাও বলছেন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এলোমেলো হয়ে পড়েছে। তাদের আগে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। তারপর আন্দোলন। গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘বিএনপিকে দল গোছানোর পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি তো নিতেই হবে। আন্দোলনের প্রস্তুতিও নিতে হবে। এর তো বিকল্প নেই। নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়া সেটা বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে তাদেরকে আরো বেশি জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের পালস বুঝতে হবে।’

বিএনপি দাবি আদায়ের আন্দোলনের কথা বললেও নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের আগ্রহের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গত ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভাতেও নির্বাচনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। ঘুরে ফিরে তিনি নির্বাচনের কথাই বলেছেন। নির্দলীয় সরকারের দাবিও তুলেছেন বক্তৃতায়। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন আসতে হবে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে। এজন্য মানুষকে ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। আর এই ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দরকার নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন।’

বিএনপি আন্দোলনের হুমকি দিলেও আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপি যাই বলুক, আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়া ছাড়া তাদের গতি নেই। দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বিএনপি নেতারা যতই কথা বলুক না কেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ নেই। আর বর্তমান সরকারের অধীনেই বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে হবে। তারা না আসলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।’ ২০১৪ সালের নির্বাচন বানচালের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের ক্ষমতা বিএনপির নেই। যারা নির্বাচন ঠেকানোর স্বপ্ন দেখেন তাদের সেই স্বপ্ন কোনো দিন পূরণ হবে না।’

বিএনপির আন্দোলনের হুমকির বিষয়ে তোফায়েল বলেন, ‘বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলছে দেশে গণঅভ্যুত্থান করে টেনে-হিঁচড়ে সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামাবে। যদি সাহস থাকে তাহলে সে চেষ্টা আপনারা করুন। আন্দোলনের নামে সন্ত্রাস করলে জেলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। বিএনপি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করেছে, একটি সন্ত্রাসী দল কখনই ভোট চাইতে পারে না।’

নিবন্ধনের ফের, বিএনপি নেতারা বলছে এ নিয়ে চিন্তা নেই
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ আইনের (আরপিও) ৯০ (এইচ) (১) দফায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের নির্দেশনা রয়েছে। ওই দফার (ই) উপ-দফায় বলা হয়েছে, নিবন্ধিত কোনো রাজনৈতিক দল পর পর দুইবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নিবন্ধন বাতিল হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে গেছে। সেই হিসাবে আরপিওর ওই বিশেষ বিধানের কারণে আগামী নির্বাচন বর্জন করলে ঝুঁকিতে থাকবে আসলে ২৭টি দল।

অবশ্য নির্বাচন বর্জন করলেই নিবন্ধন হারাবে দলগুলো বিষয়টি এমন নয়। আইনের ৯০ এইচ (২) দফায় বলা হয়েছে, ‘শর্ত থাকে যে দফা (১) এর (সি), (ডি) ও (ই) এর অধীন নিবন্ধন বাতিলের পূর্বে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে শুনানির সুযোগ প্রদান করবে।’ অর্থাৎ শুনানিতে সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবে পরপর দুইবার নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বিধান চালু হয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সেনাশাসনের সময়। এরপর ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আবারও চালু হয় একই বিধান। সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে সে সময় নিবন্ধনে আগ্রহী নেতারা নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন এবং এই আবেদনের পর শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধন দেয়া হয় দলগুলোকে। এর মধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। ২০১৫ সালের ২ জুন আইনমন্ত্রী সংসদকে জানান, দেশে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৪০টি।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার ছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা এম সাখাওয়াত হোসেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো দল যদি নিজেই নিজেকে বিলুপ্ত করে বা সরকার কোনো দলকে নিষিদ্ধ করলে সরাসরি কমিশন ওই দলের নিবন্ধন বাতিল করবে। কিন্তু নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণে বাতিলের প্রয়োজন হলে কমিশনকে অবশ্যই দলটির কথা ও নির্বাচনে না যাওয়ার যুক্তি শুনতে হবে।’

বিএনপি নেতাদের দাবি, দশম সংসদ নির্বাচনে তাদের অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল যুক্তিসঙ্গত। তাই সরকারের এমন বক্তব্য ধোপে টিকবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও জেলা পরিষদ ছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে সব কটি স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। নেতারা বলছেন, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা এবং দলকে সক্রিয় রাখতে এসব নির্বাচনে গেছেন তারা।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি না, না করলে কী হবে এটা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে বলা হচ্ছে। কেউ পছন্দ করুক বা না করুক এখন বিএনপি হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ও জনপ্রিয় দল। যখনই নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে তখনই বেশিরভাগ সময়ে বিএনপি নির্বাচিত হয়েছে। সুতরাং নিবন্ধন নিয়ে যাদের চিন্তা, ওনারা সেই চিন্তায় থাকুক। আমাদের নিবন্ধন নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তবে আমরা নির্বাচনে যেতে চাই। সরকারকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকার আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে এমন আশা করে তিনি বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে বলতে চাই বিএনপিকে নিবন্ধনের ভয় দেখিয়ে নির্বাচনে নিয়ে যাবেন, এটা যদি কেউ বিশ্বাস করে সে বোকার রাজ্যে বসবাস করে। নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার ছাড়া আমরা নির্বাচনে যাব না। বিএনপির মতো বৃহৎ ও জনপ্রিয় দলের নিবন্ধন নিয়ে কেউ হেলাফেলা করবে, আর দেশের জনগণ বসে বসে তামাশা দেখবে সেটাতো হবে না।’

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিএনপি
জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে বিএনপি। নির্বাচনে অংশ নিতে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১৮ নভেম্বর দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়া আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য সংগঠনকে সংগঠিত করার তাগিদ দেন। তৃণমূলে যোগাযোগ বাড়াতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দেন। খালেদা জিয়া বিভাগীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক সফরে যাবেন বলেও জানান।

বিএনপি নেতারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ওয়ার্মআপ হিসেবে দেখছেন তারা। এই নির্বাচনে ভালোমন্দের ওপর জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নির্ভর করবে বলেও জানান তারা। এই নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়া জেলা ও বিভাগ সফরে যাবেন। এর মধ্যদিয়ে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও শুরু হবে। গত ২১ নভেম্বর বৈঠকে খালেদা জিয়া দলের উপদেষ্টাদের বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হলে তারা আন্দোলনে যাবে। যে করেই হোক নির্দলীয় সরকারের দাবি তারা আদায় করবে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি মুখে আন্দোলনের কথা বললেও আদতে তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠিকই অংশ নেবে। ভেতরে ভেতরে দলটি সেই প্রস্তুতিই নিচ্ছে। কারণ পর পর দুটো জাতীয় নির্বাচন থেকে দূরে থাকা দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা বলে গণ্য হবে। জানতে চাইলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘পরপর দুইবার নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি নিশ্চয়ই বিএনপির মাথায় আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় দলের যে অবস্থা তাতে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও নির্বাচনে আসতে হবে। আমার বিশ্বাস নিঃসন্দেহে তারা নির্বাচনে যাবে।

কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে দেশব্যাপী আন্দোলন জমিয়ে সরকার পতন বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের অবস্থায় বিএনপি আসলে নেই। তাদেরকে সবকটি ইউনিটের কমিটিগুলো করে সংগঠন গোছানো উচিত। ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করা উচিত। সেক্ষেত্রে অতীতের মতো জ্বালাও-পোড়াও হলে জনগণ তা গ্রহণ করবে না। একইসঙ্গে দলটির নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।