যে কারণে রাজধানীতে আ.লীগের দু’গ্রুপে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি-অগ্নিসংযোগ, দিনভর মহড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা অন্তর্দ্বন্দ্বের জেরে বৃহস্পতিবার রাজধানী আজিমপুরে দিনভর দুপক্ষে ব্যাপক মহড়া, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মেয়র নির্বাচনের সময় থেকেই বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন ও ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।

তবে দক্ষিণ আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে এ বিরোধ চূড়ান্ত আকার ধারণ করে, যা গত ২৫ অক্টোবর মৌচাক ফ্লাইওভার উদ্বোধনের সময়ে প্রকাশ্যে চলে আসে। সেদিন প্রধানমন্ত্রীকে ভিডিও কনফারেন্সে রেখেই দুই পক্ষ হাতাহাতিতে জড়ায়। এর জের ধরে পরবর্তীতে গত ১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতেও দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ওই দুই ঘটনায় লাঞ্ছিত হন ৩৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফি।

এদিকে বৃহস্পতিবার আজিমপুরের পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারে এক সভার আয়োজন করে ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এ কর্মসূচীতে অংশ নিতে এসে সকালে কমিউনিটি সেন্টারের সামনের রাস্তায় ময়লার স্তুপ পড়ে থাকতে দেখেন নেতাকর্মীরা। আর স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ভোরেই তারা ময়লার স্তুপ দেখেছেন, রাতে তা ফেলা হয়েছে বলে ধারণা তাদের।

শাহে আলম মুরাদের অনুসারীরা বলছেন, কর্মসূচী বাধাগ্রস্ত করতেই সিটি কর্পোরেশনের ৩-৪ গাড়ি ময়লা কর্মসূচীস্থলে ফেলা হয়েছে। এর পিছনে সাঈদ খোকন জড়িত বলে তাদের দাবি।

এ বিষয়ে শাহে আলম মুরাদ বলেন, এটা সিটি কর্পোরেশনের কাজ-কারবার। আওয়ামী লীগের কর্মসূচীকে বাধাগ্রস্ত করতেই তারা এভাবে ময়লা ফেলেছে।

পরে ময়লা সরিয়েই সভায় অংশ নেয় মুরাদের অনুসারীরা। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দিপু মনির অংশগ্রহণের কথা থাকলেও তিনি অংশ নেননি।

অন্যদিকে বেলা ১১টার দিকে আবু আহমেদ মুন্নাফীকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে ‘মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিক কমিটির’ ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল বের করে সাঈদ খোকনের অনুসারীরা। মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ এনে তারা মুরাদের পদত্যগ চেয়ে পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারের দিকে যেতে চান।

পরে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে পূর্বঘোষিত এ কর্মসূচীতে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় তারা বাসস্ট্যান্ডেই অবস্থান নেন। এ খবর পেয়ে বেলা ১টার দিকে মুরাদের অনুসারীরাও পাল্টা মিছিল নিয়ে আজিমপুরের দিক আসেন।

এসময় পুলিশ সাঈদ খোকনের অনুসারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পরে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ৩টি মোটরসাইকেলে (ঢাকা মেট্রো ল-১১-১২৬৮, ঢাকা মেট্রো ছ- ৪৯-৭৯১০, ঢাকা মেট্রো ল- ১৪-৬৭৬৭) আগুন ধরিয়ে দেন। এছাড়া ভাংচুর করে বেশ কয়েকটি মোটর সাইকেল।

এসময় উভয় পক্ষই ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল ছুড়ে। এছাড়া আটক করে ১৩ জনকে।

এ বিষয়ে সাঈদ খোকনের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত আবু আহমেদ মুন্নাফী নিজেদের দিকে আসা ময়লার স্তুপ রাস্তায় ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। তারা মুরাদের পদত্যাগ চায়। কিন্তু মুরাদ পুলিশের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধাদের ব্যানার কেড়ে নিয়েছে। তাদের প্রতি গুলি করিয়েছে।

এ বিষয়ে লালবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, দুই পক্ষের ঝামেলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে। ওরা দুই পক্ষ একটু ঝামেলা করছিল।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুরে পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারে ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের এক বর্ধিত সভায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আজ যেভাবে অনৈক্য দেখাচ্ছেন, তা কখনো শুভকর নয়। এভাবে চললে আগামীতে আমাদের সরকার ক্ষমতায় আসবে না।’

খাদ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চলমান দ্বন্দ্ব শুভকর নয়।’

প্রসঙ্গত, ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় আজিমপুরে পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারে বর্ধিত সভা আয়োজন করা হয়। ১৮ নভেম্বর আওয়ামী লীগের নাগরিক সমাবেশ সফল করা এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্যই এই সভা ডাকা হয়। কিন্তু এই সভা বাধা দেওয়ার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কমিউনিটি সেন্টারের গেটে ময়লা ফেলে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ময়লা কিছুটা সরিয়ে কমিউনিটি সেন্টারে প্রবেশ করে নির্ধারিত সভা আরম্ভ করে দক্ষিণের নেতাকর্মীরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।