মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে হঠাৎ নাটকীয় পরিবর্তন

এসএম ফরিদ মিরবাগিরি: গত মাসে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির দুঃখজনক ঘটনার উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ছোড়া দুটি ক্ষেপনাস্ত্র আঘাত হানার ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি নিজের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এবং তারপর হঠাৎ দুর্নীতির অভিযোগে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য এবং দেশটির একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

সমান্তরালভাবে, সিরিয়ার কূটনৈতিক ফ্রন্টেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ছিল। সিরিয়ার চলমান গৃহযুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য রাশিয়ার সোচিতে একত্রিত হন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট রোহানি।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মস্কো সফর এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মধ্যেকার দীর্ঘ টেলিফোনে আলাপের পর এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাশার আল আসাদের সঙ্গে বৈঠকের ফলাফল ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে প্রদানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পুতিন নেতানিয়াহুকে সক্রিয় রাখে।

লেবাননের রাষ্ট্রপতির অনুরোধে বর্তমানে হারিরি তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এই পদক্ষেপটি দেশটির রাজনৈতিক এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী হিজবুল্লাহর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। গ্রুপটির নেতা হাসান নাসরুল্লা তার সংগঠনকে রক্ষা করতে ও তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছেন আর তা হচ্ছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া।

রাজনৈতিকভাবে খারাপ সময়ে রিয়াদের লক্ষ্যবস্তুতে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তাদের বিরুদ্ধে সৌদির অব্যাহত লড়াইকে রাজনৈতিকভাবে আরো তীব্র করতে উসকে দিয়েছে।

সৌদি আরবের অভিজাত শ্রেণির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে পরিচালিত শুদ্ধি অভিযান দেশটির রাজনীতিতে নতুন সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণের জন্য তরুণ প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সাহায্য করতে পারে।

নারীদেরকে অধিকতর স্বাধীনতা প্রদানে নতুন প্রণীত আইনসমূহের মাধ্যমে প্রিন্স সম্ভবত দেশটির অগ্রগামী ও শক্তিশালী নেতা হিসেবে বাদশা সালমানকে সফল করার পথ প্রশস্ত করেছেন।

আপাতদৃষ্টিতে সিরিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ভূমিকা কিছুটা হ্রাস করেছেন। এর পিছনে কারণ হতে পারে ওয়াশিংটন এবং মস্কোর মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। মার্কিন নেতা তার রাশিয়ান কাউন্টারপার্ট পুতিনের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তিতে পৌঁছানোর রাস্তা খুঁজে পেতে পারেন।

তবে, এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে ‘অনভিপ্রেত’ মিডিয়াগুলো। ট্রাম্প প্রশাসনকে উত্তেজিত করতে এসব মিডিয়ার আগ্রহ ক্রেমলিন সম্পর্কিত গোলাবারুদের খোঁজ করা।

ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্সি মেয়াদের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই অঞ্চলের একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে আইএসকে নির্মূলের অনুভূতি অনুভব করতে পারেন। সিরিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক শক্তিগুলোর পুনরায় প্রান্তিককরণে নিরব স্থানান্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে রাশিয়ার ভূমিকা গ্রহণের সময় মার্কিন নীতিনির্ধারকরাও তাদের সংরক্ষিত নগ্ন চেহারা নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন। যদিও সিরিয়ার ট্র্যাজেডি একটি কূটনৈতিক সমাধানের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এধরনের চুক্তিতে তারা যদি কখনো পৌঁছে যায়, তবে ইরানীদের স্বার্থে তা স্বাগত জানানো হবে না। দামেস্কাসের বর্তমান সরকারকে বজায় রাখার জন্য ইরান সঙ্কটের শুরু থেকেই বাশার সরকারকে ব্যাপক সাহায্য ও সমর্থন করছে।

অন্যদিকে, সমগ্র অঞ্চলের মিরর হিসেবে তীব্রমাত্রার উত্তেজনা অনুভব করাসহ লেবানন সম্ভবত একটি পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারে। যে যুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকবে ইসরাইল এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলো।

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর রিপোর্টের অগ্রগতি আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য হিংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লেবাননের আকাশসীমা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠতে পারে। তেল আবিব তার সুরক্ষা এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে।

লেবাননের সংঘাত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে এবং রিপোর্ট অনুযায়ী, সিরিয়ার উন্নয়ন তেহরানের জন্য প্রতিকূল হলে, সেক্ষেত্রে ইরান সরকারও ভিন্ন উপায় অবলম্বন করতে পারে।

নিঃসন্দেহে এসব ঘটনা এই অঞ্চলকে তার ইতিহাসের একটি নাটকীয় পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি অনিশ্চিত ফলাফলের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য স্থানান্তরের প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের প্রতি হোয়াইট হাউসের পূর্ণ সমর্থন আছে বলেই মনে হচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী এই দেশটি ক্রেমলিনের সঙ্গে একটি নিরব বোঝা-পড়ায় পৌঁছেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। দেশটির সঙ্কটে এক কাতার বাদে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো তার অবস্থানকে সমর্থন করবে বলেই মনে হচ্ছে।

অন্যদিকে, ইরান মস্কোর সমর্থন উপভোগ করবে বলে মনে হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই দেশটি ওয়াশিংটন প্রশাসনের শত্রুতার শিকারে পরিণত হতে পারে। কাতার, তুরস্ক ও ইরাক এই তিনটি দেশের কাছ থেকে তেহরান বিভিন্ন মাত্রার সমর্থন আশা করতে পারে, তবে তা দ্রুত পরিবর্তিত অবস্থার ওপর নির্ভর করছে।

ভূমধ্যসাগরীয় সমুদ্রে একটি করিডোর পাওয়ার প্রত্যাশা ইরানের দীর্ঘদিনের। উত্তর ইরাক, সিরিয়া ও লেবানন জুড়ে বিস্তৃত ভূমধ্যসাগর এখনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক চার্টের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাইপ্রাস মেইল অনলাইন অবলম্বনে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।