খ্রিস্টান স্বামীকে তালাক নওমুসলিম হামিদার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দুবাই: সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসলামে ধর্মান্তরিতদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন ইসলামি ঐতিহ্যে দেশটিতে বসবাসরত অভিবাসীরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। তাদের কেউ কোরআন পড়ার মাধ্যমে কিংবা ঐতিহাসিক ধর্মীয় ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করার মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

দুবাইয়ের ‘কালিমাহ ইসলামিক সেন্টার’ জানিয়েছে, দেশটিতে ২০১৬ সালের জুন থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত ৩৪১ জন ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। ধর্মান্তরের পিছনে তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ‘অনন্য’ কারণ রয়েছে বলে জানানো হয়।

গত অক্টোবরে খালিজ টাইমসের একটি রিপোর্ট বলা হয়, ইসলাম হচ্ছে বিশ্বের দ্রুত ক্রমবর্ধমান ধর্ম। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় বলা হয়, ২০১০ সাল থেকে ২০৫০ সালের মধ্য মুসলমানদের সংখ্যা ৭৩ শতাংশে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সংখ্যা ১.৬ বিলিয়ন থেকে ২.৮ বিলিয়নে দাঁড়াবে।

সম্প্রতি খালিজ টাইমসের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণকারী চার আমিরাত অভিবাসীর কথা হয়।তাদের মধ্যে একজন ভারতীয় নারীও রয়েছে। ধর্মান্তরের বিষয়টি ওই নারীর স্বামী মেনে না নেয়ায় তিনি তার ২০ বছরের সম্পর্ক ত্যাগ করতে হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে তারা কেন ইসলামে ধর্মান্তরিত হন এবং এ নিয়ে পরিবারে তাদের সংগ্রাম সম্পর্কে কথা বলেন।

ভারতীয় নারী হামিদা
২০১৩ সালে হামিদা ইসলামে ধর্মান্তরিত হন এবং তার স্বামীকেও ইসলাম গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। কারণ ইসলামী শরিয়া আইন অনুযায়ী মুসলিম নারীরা অন্য ধর্মের পুরুষদের বিয়ে করতে পারে না। ইসলাম গ্রহণের আগে তার নাম ছিল অনিতা।

হামিদা বলেন, ‘আমি আমার জীবনে কখনোই ভাবিনি যে, আমি একজন মুসলমান হব।আমি আমার খ্রিস্টান ধর্মকেই কেবল অগ্রাধিকার দিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯৯ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস করছি এবং আমি সবসময় আজান ও শুক্রবারের খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পছন্দ করতাম এবং এটি আমার কাছে আধ্যাত্মিকতার এক মহান পরামর্শ বলে মনে হতো।’

হামিদা বলেন,‘আমি প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতভাবে গির্জায় যোগদান করতাম এবং একদিন আমি খুব তাড়াতাড়ি বের হই; যাতে আমি গির্জার প্রথম সারির আসনে বসতে পারি। কিন্তু আমি পার্কিং খুঁজে পাইনি এবং ধর্মোপদেশের শুরুটা মিস করি। আমি হতাশ হয়ে যাই এবং অনুষ্ঠান মাঝ পথে রেখেই বাড়িতে ফিরে আসি।’

‘পরের সপ্তাহে আমি গির্জার যাওয়ার মতো ইচ্ছা অনুভব করি নি এবং সময়ের ব্যবধানে আমি বাইবেল পড়া বন্ধ করে দেই; যা আমার মাঝে এই পরিবর্তনের অনুভূতি জন্মায়। আমার ছেলে আমার কাছে জানতে চাইত কেন আমি এমনটি করছি।,

‘আমার একজন ফিলিপাইনি সহকর্মী ছিল। যিনি নিজেও ধর্মান্তরিত হয়েছেন। আমি আমার ভিতরের পরিবর্তনগুলোর কথা তার সঙ্গে শেয়ার করি। তিনি আমাকে একটি ইমলামি মজলিসে নিয়ে যায়। সেখানে একজন ধর্মীয় নেতা আমাকে ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের শিক্ষা সম্পর্কে বলেন। পরে আমি আত্ম-বিশ্লেষণ করেছি এবং ইসলামের আধ্যাত্মিকতার পথে যাত্রা শুরু করি।’

পরে ২০১৩ সালে হামিদা ইসলামে ধর্মান্তরিত হন এবং শরিয়াহ আইন অনুযায়ী তিনি তার স্বামীকেও ইসলাম গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন কিন্তু তার স্বামী তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছিল। ফলে তিনি তার ২০ বছরের সম্পর্কের ইতি টানেন। যাই হোক, তার বোন, পরিবার এবং তার ছেলে তার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন দিয়েছিল।

ভারতীয় অভিবাসী ওমর
ভারতীয় অভিবাসী ওমর ২০১৪ সালে হিন্দুধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। ওই সময় কোরআন পড়ার পর ধর্মের ওপর তার বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই উপযুক্ত হিন্দু ছিলাম না। বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করার মাধ্যমে আমি সবসময় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতাম।’

‘আমি হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে অধ্যয়ন করেছি। তারপর আমি খ্রিস্টধর্ম নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করি। এরপর আমি ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করি। আমি কোরআনের মধ্য অনেক মিল খুঁজে পাই। কোরআন নিয়ে ভালভাবে অধ্যয়নের পর সবকিছুই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।’

‘যদিও আমার ধর্মান্তরিত হতে কিছুটা সময় লেগেছিল। কারণ আমি দুই বছর ধরে ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছি। কারণ আমি এটি সম্পর্কে খুব ভালভাবে জানতে চেয়েছি।’

ওমরের পরিবার তার ইসলামে ধর্মান্তরের সংবাদ জানতে পেরে তার বাবা তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করে। এই কারণে তার পরিবার তার বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল না।

‘শান্তি খোঁজে পাওয়ার অর্থ হচ্ছে ‘স্বর্গের পথের সন্ধান পাওয়া, একজন ভাল মানুষ হওয়া এবং আরো বেশি ধার্মিক হওয়া। এসব কিছুই হচ্ছে আমার ধর্মান্তরের কারণ এবং এসব কারণেই ২০০’র বেশি ইউএই বাসিন্দা ইসলামে ধর্মান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।’

দুবাইয়ে বসবাস করা একজন ফিলিপিনো প্রবাসী নারী; যিনি আগে একজন ক্যাথলিক ছিলেন। তিনি জানান, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে ও আযান শুনতেই তিনি ধর্মান্তরিত হন।

তিনি বলেন, ‘ফিলিপাইনে আমরা কখনো আযান শুনতে পাই না। এখানে এসে আমি আমি প্রথমবারের মতো আযানের সঙ্গে পরিচিত হই।’

একজন ইউক্রেনীয় নারী বলেন, আমি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসার পর মুসলিমদের একত্রে মসজিদে প্রার্থনা ও ধর্মের সঙ্গে তারা কতটা সম্মানজনক- এসব বিষয় আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করে।

আরেকজন ফিলিপিনো অভিবাসী বলেছিলেন, একজন মুসলমান বন্ধু একজন মুসলমান হওয়ার এক চমৎকার উদাহরণ এবং এই বন্ধুই ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার জন্য আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সন্তানেরা কিভাবে তাদের পিতামাতার সঙ্গে অত্যন্ত সম্মানজনক আচরণ করবে এবং পরিবার তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ- ইসলামের এসব শিক্ষা আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করে।’

তাদের যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে, ইসলামে ধর্মান্তরের পর তাদের ‘প্রধান সমস্যাগুলো কি ছিল? এই প্রশ্নে তাদের অধিকাংশই জানায় যে, তাদের নিজেদের পরিবারের মধ্য তাদেরকে অনেক সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে।

খালিজ টাইমস অবলম্বনে