১১ হাজার কত রানে হবে জানেন না দর্শক মাতানো ক্রিস গেইল

খেলা ডেস্ক
ঢাকা: ক্রিকেটে বিনোদনের নতুন এই ধারাই তৈরি করেছেন ক্রিস গেইল। ব্যাট হাতে তার বিধ্বংসী রূপ আর মাঠের বাইরের রসিকতা ক্রিকেটভক্তরা উপভোগ করেন প্রাণভরে। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমিদের মন রাঙিয়ে দিতে ক্যারিবিয়ান ‘ব্যাটিং দানব’ নামতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল)।

গেইল নিজেও জানেন তার কাছে ভক্তদের চাওয়া কী। সেই চাওয়া পূরণ করতে ব্যাটে ঝড় তুলতে প্রস্তুত রংপুর রাইডার্সের এই ব্যাটসম্যান।

বিপিএলের সঙ্গে গেইলের সম্পর্কটা সেই প্রথম আসর থেকে। বরিশাল বার্নারস, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস, চিটাগং ভাইকিংস হয়ে এবার তিনি মাঠ মাতানোর অপেক্ষায় রংপুরের জার্সিতে। নতুন দলে খেলতে নামার আগে শুক্রবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমু্খি হয়েছিলেন তিনি। যেখানে ভালো শুরুর অপেক্ষায় গেইল, ‘ভালো লাগছে আবার বাংলাদেশে ফিরে বিপিএলের অংশ হতে পেরে। আরেকটি নতুন দলের হয়ে শুরুর অপেক্ষা আছি, আগামীকাল (শনিবার) প্রথম ম্যাচ। আশা করছি ভালোভাবে শুরু করে আমরা জয়ের পথে ফিরতে পারব।’

এই মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলে খুব একটা ভালো জায়গায় নেই রংপুর। ৩ ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে ‍ষষ্ঠ স্থানে। এই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে তারা দলে গেইল ও ব্রেন্ডন ম্যাককালাম যোগ দেওয়ায়। দলের জয় তো বটেই, গেইলের কাছে অন্য চাওয়াও আছে দর্শকদের। চার-ছক্কার ফুলঝুরিতে গ্যালারিতে তিনি উত্তেজনার ঢেউ তুলবেন, ক্রিকেটপ্রেমিদের চাওয়া তো সেটাই। গেইল নিজেও জানেন বিষয়টি। জানেন বলেই বলতে পারলেন, ‘বাংলাদেশের সবাই বিনোদন পেতে চায় আমার ও ম্যাককালামের মতো বিনোদনকারীর কাছ থেকে। যে কারণে আমাদের ওপর চাপ থাকবে। যদিও আমরা জানতাম বিষয়টা এমন হবে।’

ভক্তদের সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রস্তুত গেইল, ‘খুব ভালো হবে যদি আমরা শুরুটা ভালো করতে পারি, অনেক বাউন্ডারি মারতে পারলে দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হবে। আমি প্রস্তুত।’ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘বেশিরভাগ সময় ব্যাট হাতে আমার মাঠে যাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে ভক্তদের বিনোদন দেওয়ার। তারা অনেক টাকা খরচ করে বিনোদন পাওয়ার জন্য আসে (মাঠে)। মাঝেমধ্যে আমাকে ভুগতে হয়, খুব বেশি ছক্কা মারতে পারি না। যখন এটা আসে, তখন সবাই খুশি হয়।’

১১ হাজার কত রানে হবে, জানেন না গেইল
‘টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ভাড়াটে সৈনিক’, এমন অভিধাই জুটে গেছে ক্রিস গেইলের। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি টি-টোয়েন্টি লিগেই যে সরব উপস্থিতি এই ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটারের। তাঁকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পোস্টার-বয় বললেও হয়তো বাড়িয়ে বলা হবে না। সব ধরনের টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটিও আছে বিধ্বংসী এই ব্যাটসম্যানের দখলে।

গেইলের সুবাদেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট চিনেছে নতুন এক মাইলফলক। প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত এই সংস্করণে ১০ হাজার রান করেছিলেন গেইল। এবার তাঁর সামনে আছে আরেকটি অনন্য মাইলফলকের হাতছানি। ১১ হাজার রান। কিন্তু গেইলের অত হিসাব-নিকাশে কোনো মনোযোগ নেই। বাংলাদেশের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা, বিপিএলে খেলতে এসে শুধু মাঠ মাতানোর দিকেই মনোযোগ বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানের।

রংপুর রাইডার্সের জার্সি গায়ে খেলার জন্য আজ শুক্রবার ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন গেইল। মাশরাফি বিন মুর্তজার অধিনায়কত্বে গেইল মাঠে নামতে পারেন আগামীকাল শনিবার, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বিপক্ষে। বিপিএলেই গেইল ১১ হাজার রানের মাইলফলকটা ছুঁয়ে ফেলবেন কি না, এমন প্রশ্নের মুখে অবধারিতভাবেই পড়তে হয়েছিল। গেইলের জবাব, ‘আর কত রান হলে ১১ হাজার পূর্ণ হবে আমার জানা নেই। কিন্তু এখানে নয়টা ম্যাচ আছে। এখন ছন্দে ফেরাটাই আসল ব্যাপার। আমি এই কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচিত। এখন আমি চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্যও প্রস্তুত।’

টি-টোয়েন্টিতে ১১ হাজার রান পূর্ণ হতে গেইলের প্রয়োজন আর ৪২৯ রান। ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে গেইল খেলেছেন ৩০৯টি ম্যাচ। মারমুখী ব্যাটিং দিয়ে সংগ্রহ করেছেন ১০৫৭১ রান। যার মধ্যে আছে সবচেয়ে বেশি, ১৮টি শতক। দেখা যাক গেইল বিপিএলেই নতুন আরেকটি মাইলফলক তৈরি করতে পারেন কি না।

ঝড়ের নাম ক্রিস গেইল
বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম দুটো ম্যাচে একেবারেই নিষ্প্রভ ছিলেন ক্রিস গেইল। এতটাই নিষ্প্রভ যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি কবে অবসর নেবেন, এ নিয়ে শুরু হয়েছিল জোর আলোচনা। গেইলকে কটাক্ষ করেই অবসর-আলোচনায় বাতাস দিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। ক্যানবেরায় জিম্বাবুয়েকে পেয়ে যাবতীয় সমালোচনা ও কটাক্ষের যন্ত্রণাই যেন মেটালেন এই ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে করলেন ডাবল সেঞ্চুরি। ২১৫ রানের দানবীয় ইনিংসটি খেলতে গিয়ে মারলেন ১৬টি সুবিশাল ছক্কা। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডটিও করে নিলেন নিজের।

মারলন স্যামুয়েলসকে সঙ্গে নিয়ে ৩৭২ রানের দুর্দান্ত এক জুটি গড়ে শামিল হলেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ যুগলবন্দীতে। একই সঙ্গে তাঁর এই ইনিংস জিম্বাবুয়েকে চাপা দিয়েছে ৩৭২ রানের পাহাড়ে। কিছু দিন আগে ব্রিসবেন উপকূলের ওপর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মার্সিয়া আর লামের মতোই আজ ক্যানবেরা যেন দেখল আরেক ঝড়ের প্রলয়। আবহাওয়াবিদেরা পরবর্তী সময়ে যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্দ্বিধায় রেখে দিতে পারেন ক্রিস গেইলের নামে। ঝড়ের নাম হিসেবে ক্রিস গেইলই বোধ হয় সবচেয়ে যথাযথ নাম।

ক্রিস গেইলের ইনিংসটি এসেছে মাত্র ১৪৭ বলে। ১০৫ বলে শতক পূর্ণ করা গেইল ২১৫ রানে পৌঁছে যেতে বল খেলেন আর মাত্র ৪২টি। চারের থেকে যে ইনিংসে ছয়ের মার বেশি, সে ইনিংসটি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা আজ খুব ভালোই বুঝতে পেরেছে জিম্বাবুয়ে। টেলিভিশনের সামনে বসা দর্শকদেরও এই ইনিংসটি দেখতে দেখতে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করেছে। বোলারদের প্রতি এতটা নির্দয় হওয়া যায় নাকি।

পুরো ইনিংসটিই ছিল গেইলের নানা ধরনের কীর্তিগাথায় ভরপুর। বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর, ছয় মারার সংখ্যা, জুটি ইত্যাদির রেকর্ড ছোঁয়ার আগেই গেইল আজ প্রবেশ করেছেন নয় হাজার রানের ঘরে। কেবল দ্বিতীয় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান হিসেবে এই মাইলফলক ছোঁয়া গেইল আজ প্রমাণ করে দিয়েছেন, যে যা-ই বলুক ক্যারিবীয় ক্রিকেট ইতিহাসের ভয়ংকরতম ব্যাটসম্যানের অভিধা দিতে হবে তাকেই।

ক্রিস গেইলের প্রলয়ে চাপা পড়ে গেছে মারলন স্যামুয়েলসের দারুণ শতরানটি। ১৩৩ রানে শেষ অবধি অপরাজিত থাকা স্যামুয়েলস গেইলের সঙ্গে ইতিহাসে অমর করে রেখেছেন বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ জুটিতে নিজের নাম লিখে। গেইল-স্যামুয়েলস ৩৭২ রানের জুটি পেছনে ফেলেছে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে টন্টনে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সৌরভ গাঙ্গুলি ও রাহুল দ্রাবিড়ের ৩১৮ রানের অনন্য জুটিটিকে।

স্যামুয়েলসের ১৩৩ রানের ইনিংসটিতে ছিল ১১ চার ও তিনটি ছয়ের মার। ১৫৬ বলে, ২০৯ মিনিট ধরে খেলা স্যামুয়েলসের ইনিংসটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয় এই কারণেই যে তাঁর এই ইনিংসটির কারণেই শেষ অবধি হাত খুলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন গেইল, ঝড় তুলে তোলপাড় ফেলেছিলেন ক্যানবেরার মানুকা ওভালে। সূত্র: এএফপি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।