ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ

খেলা ডেস্ক
ঢাকা: সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। আজ দুপুরে টুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশ ১-০ গোলে হারায় ভারতকে। ম্যাচের একমাত্র গোলটি করে বাংলাদেশকে শিরোপা এনে দিয়েছেন শামসুন্নাহার।

কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে আত্মবিশ্বাসে টগবগে হয়ে ফাইনাল খেলতে নামে বাংলাদেশ। কারণ গত বৃহস্পতিবারই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ভারতকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশের কিশোরীরা। তাই শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের শুরু থেকেও ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করে খেলতে থাকে বাংলাদেশ।

তবে সময় গড়ানোর সাথে সাথে বাংলাদেশের সাথে সমানতালে লড়াই শুরু করে ভারত। কিন্তু এতে ভড়কে যায়নি বাংলাদেশ। কাঙ্খিত গোলের জন্য নিজেদের সেরাটা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলো স্বাগতিকরা।

অবশেষে কাঙ্খিত গোলের দেখা পায় বাংলাদেশই। ৪১ মিনিটে আনুচিং মারমার শট গোলরক্ষকের হাত থেকে ফিরে এলে ফিরতি বল বাঁ-পায়ের শটে ভারতের জালে পাঠিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম গোলের স্বাদ দেন শামসুন্নাহার। ফলে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকে ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ করে গোলাম রব্বানি ছোটনের দল।

১-০ গোলে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলো বাংলাদেশ। ম্যাচে সমতা আনতে গোলের জন্য মরিয়া ছিলো ভারতও। কিন্তু রক্ষণদূর্গের দক্ষতার কারণে বাংলাদেশকে বড় কোন পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি ভারত।

তবে ম্যাচের ব্যবধান দ্বিগুন করার ভালো একটি সুযোগ পরবর্তীতে পেয়েছিলো বাংলাদেশ। ৬১ মিনিটে মগিনী-মার্জিয়ার সহায়তায় বল পেয়ে একক প্রচেষ্টায় ভারতের সীমানায় ঢুকে পড়েন তহুরা। এরপর গোলরক্ষককে কাটাতে পারলেও বলের গতি বেশি থাকায় তা তহুরার নিয়ন্ত্রের বাইরে চলে যায়। ফলে এবার গোল বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।

গোল বঞ্চিত হলে আক্রমণের ধারা অব্যাহত রেখেছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর কোন গোলের দেখা পয়নি স্বাগতিকরা। ফলে ১-০ গোলের ব্যবধানে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশের কিশোরীরা।
চার দলের এবারের টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচই জিতেছিলো বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে নেপালকে ৬-০, ভুটানকে ৩-০ এবং ভারতকে ৩-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ভুটানকে ৩-০ গোলে হারানোর পর নেপালকে ১০-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারায় ভারত। তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের কাছে হেরে যায় ভারত।

পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ প্রতিপক্ষের জালে ১৩ গোল দিয়েছে। কিন্তু একটি গোলও হজম করতে হয়নি তাদের। তাই দলগত সাফল্যগুলো বাংলাদেশের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই রাখলো।

অভিনন্দন
রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপের প্রথম আসরের শিরোপা জেতায় বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত খেলায় বাংলাদেশ ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

পৃথক অভিনন্দন বার্তায় তারা বাংলাদেশ দল সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

তারা বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের খেলা ও দলগত নৈপুণ্য দেখে সারা জাতি গর্ববোধ করছে।’ বাংলাদেশ মহিলা ফুটবল দলের এই বিজয়ের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা

চ্যাম্পিয়ন অধিনায়কের গল্প
বাবা মারা গেছেন…। বিষয়টি বোঝার বয়সও তখন হয়নি ছোট মেয়েটির। স্বামীকে হারিয়ে জীবনের উত্তাল সাগরে নাও ভাসিয়েছেন মা এনাতো মান্দ্রা। সহায়-সম্বল বলে কিছু নেই বলে ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ নিলেন তিনি। আর যা-ই হোক, ছেলেমেয়েদের মুখে তো তুলে দিতে হবে দুমুঠো ভাত। টিকিয়ে রাখতে হবে তাদের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন।

সেই ছোট মেয়েটি আজকের বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা। যার হাত ধরেই ভারতকে হারিয়ে আজ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। কত বাধা পাড়ি দিয়ে এসে নিজেকে একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তৈরি করা যায়, তা মারিয়ার জীবনগল্পের প্রতিটি প্যারাতে লেখা।

বাবা বীরেন্দ্র মারাকের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে হা করে তাকিয়ে থাকে মারিয়া। বাবার কোনো স্মৃতিই যে নেই তার। মা এনাতো মান্দ্রাই একসঙ্গে তার ‌‘বাবা ও মা’। মারিয়াদের তিন বোন ও একমাত্র ভাইকে মানুষ করতে কী অমানুষিক কষ্টই না করেছেন এনাতো। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন, তা দিয়েই মারিয়াদের চার ভাইবোনের জুটত দুমুঠো ভাত। অনেক দিন তো মা ও বড় বোনের সঙ্গে কাজে হাত লাগাতে হয়েছে মারিয়াকেও। না হলে যে বাড়ির চুলোয় আগুন জ্বলে না। বাফুফের এস্টো টার্ফে সেই গল্প শুনতে গিয়ে আবিষ্কৃত হলো এক অচেনা মারিয়া; যে মারিয়ার ফুটবলের বাইরের জীবনটা কষ্টের কালো ডায়েরি।

ফুটবলটাই মারিয়ার জীবনে ফুটিয়েছে হাসি। ২০১১ সালে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট উপলক্ষে খালি পায়ে ফুটবলে হাতে খড়ি হয় ময়মনসিংহ জেলার মেয়েটির। ২০১৩ সালে ধোবাউড়ার বিখ্যাত কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলের সদস্য। এর পরেই তার পায়ে ওঠে বুট। আর বদলাতে থাকে মারিয়া মান্ডার পৃথিবী। হ্যাঁ, তখনো কিন্তু মারিয়াকে পাশের বাড়িতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে গৃহপরিচারিকার কাজে হাত লাগাতে হতো।

২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলে ডাক পায় মারিয়া। তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে তার সহ-অধিনায়কত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। গত বছর ঢাকায় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দলের সহ-অধিনায়কও ছিল মারিয়া। এরপরে জায়গা করে নেয় মূল জাতীয় দলে। শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত সাফে বাংলাদেশের রানার্সআপ হওয়ার পেছনে ছোট মারিয়ার অবদান কম নয়। যার ফল স্বরূপ অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে তার বাহুতেই বেঁধে দেওয়া হয় বাংলাদেশের আর্মব্যান্ড। এরপরের গল্পটা তো পুরো বাংলাদেশ দেখল। মারিয়ার হাত ধরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সাম্রাজ্য গেড়ে বসা ভারতকে একই টুর্নামেন্টে হারাল দুই-দুইবার।

মাঠে অধিনায়ক মারিয়ার খেলার ধরনটা পাক্কা রাঁধুনির মতো। তাকে কিছুটা মেলানো যায় স্পেন ও বার্সেলোনার মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে। পা থেকে বল কেড়ে নিতে হবে, সেখানে মারিয়া। আবার মাঝমাঠে বল দখলে রাখতে হবে, সেখানেও আছে খর্বাকৃতির মেয়েটি। বল পায়ে নাও, প্রয়োজন হলে হোল্ড কর, সুযোগ হলে দ্রুত উইংয়ে ভালো একটি পাস দাও। এক কথায় সাধারণ ফুটবল। কিন্তু কজনই-বা পারে এভাবে খেলতে? মারিয়া মান্ডা এত সহজভাবে দারুণ খেলতে পারে বলেই নাকি তাকে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানি, ‘মারিয়া সিনিয়র ও বয়সভিত্তিক সব দলেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। পায়ে বল রাখার ক্ষমতা ভালো। যেকোনো পরিস্থিতিতেই ভালো পাস দিতে পারে। মাঠের বাইরেও দারুণ ঠান্ডা মেজাজের, কোনো ঝামেলায় নেই।’

সতীর্থ সবাই মজে থাকে বাড়ির ছোট মেয়ে মারিয়ার গুণে। দরিদ্র ঘরে জন্ম, পরিবারের জন্য গৃহপরিচারিকার কাজে সহযোগিতা, তবুও সুশিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়নি মারিয়া। কত বাধা পেরিয়ে এখন বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। চ্যাম্পিয়নদের গল্পটা বুঝি এভাবেই লেখা হয়…।