তুরস্ক-পিকেকে’র সংঘাতের প্রভাব ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নিউ জার্সি: দুজন বিখ্যাত নৃ-তত্ত্ব গবেষক তুরস্কের ইস্তাম্বুলে কুর্দি অভিবাসী, সুফি এবং বিভিন্ন ইসলামি দল নিয়ে তাদের নিজেদের করা গবেষণা এবং এগুলোর মধ্যকার ভিন্নতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

এদের একজন হচ্ছেন মেকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস হুস্টন এবং অন্যজন হচ্ছেন উইলসন বিদ্যালয়ের গবেষক এবং বেশ কিছু ডকুমেন্টারি নির্মাতা ওনুর গুনাই। তারা দুজন ‘Drugs, Crime, Sex, and Sufis: Publiticizing Islam in Kurdish Istanbul’ এ শিরোনামে একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

হুস্টন এবং গুনাই ইস্তাম্বুল শহরের বসবাসরত কুর্দি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাদের মাঠ পর্যায়ের কাজ তুলে ধরনে। একই সাথে তুরস্ক এবং কুর্দিস্তান ওয়াকার্স পার্টির মধ্যকার চলমান যুদ্ধ ইস্তাম্বুলের কুর্দিদের সামাজিক অবস্থানে কতটা প্রভাবে ফেলেছে সে সম্পর্কে আলোচনা করেন।

ক্রিস হুস্টন বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে দু’বছর কাজ করার পরে আমি যা পেয়েছি তা হচ্ছে, মুসলিমরা তাদের সম্পর্কে যে সমস্ত আলোচনা করে এবং কুর্দি ইস্যু নিয়ে সরাসরি যে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলে তাতে ইসলামপন্থী দলগুলো তিনটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে।’

তার মতে এ তিনটি ইসলামি দল হচ্ছে যথাক্রমে- রাষ্ট্রীয় ইসলামপন্থী দল, ইসলাম পন্থী দল এবং কুর্দিস ইসলাম পন্থী দল।

রাষ্ট্রীয় ইসলাম পন্থী দলের মূলবোধের দিক থেকে চিন্তা করলে বলতে হয়, কুর্দি ইস্যু তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি বিরাট হুমকি।

হুস্টন বলেন, ‘যুক্তিযুক্তভাবে (রাষ্ট্রীয় ইসলাম পন্থীদের মতে) কুর্দি জনগণের নিজেদের মধ্যকার ধ্যান ধারণার পরিবর্তন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই এ সমস্যা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।’


A woman wipes the tears of an honor guard as he stands next to the coffin

হুস্টনের ভাষায়, ইসলামিস্ট বা ইসলাম পন্থীদের অবস্থান মুসলিম পরিচয়ের সাথে জড়িত। তিনি বলেন, ‘মুসলিম পরিচয়কে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই অন্যান্য পরিচয়সমূহ যেমন কুর্দি জাতীয়তাবাদকে উড়িয়ে দিতে হবে।’

অন্যদিকে কুর্দিস ইসলাম পন্থী দল বিভিন্ন ইসলামি দলসমূহের মধ্যে একতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে শরিয়া আইনের বাস্তবায়ন চায়। তবে একই সাথে কুর্দি এবং তুর্কি জনগণ উভয়েই চলমান সমস্যার সমাধানের জন্য ইসলামকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে থাকে।

গুয়ানি তার মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় চলমান সংঘাতের মধ্যে কুর্দিদের মধ্যকার মাদকের ব্যবহার, অপরাধ এবং আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো তুলে এনেছেন।

গুয়ানি ইস্তাম্বুল শহরের বেশ কয়েকজন যুবকের সাথে আলোচনা করেছেন। তারা গুয়ানির সাথে তাদের বিভিন্ন অপরাধ যেমন ট্যাক্সি ডাকাতি, যৌন অভিজ্ঞতা, ইস্তাম্বুলে মারিজুয়ানার আমদানি ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। একই সাথে অনেক কুর্দি তরুণ তাদের নিজের চোখের সামনে নিজেদের অনেক আত্মীয় যেমন চাচাতো ভাইদের খুন হতে দেখেছেন এমটিও তুলে ধরেছেন।

গুয়ানি বলেন, ‘কুর্দি যুবকেরা শুধুমাত্র তাদের চাচাতো ভাইদের মৃত দেহই দেখেনি বরং তারা পিকেকে এবং তুরস্কের মধ্যকার যুদ্ধে তাদের অনেক সহকর্মীর মৃত্যু দেখেছেন। অনেকে আমাকে বলেছেন যে, একই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে জড়িয়েছে এমনটি তারা এখনো দেখছেন এবং শুনছেন।’

গুয়ানির মতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই ইস্তাম্বুলের যুবগোষ্ঠী মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনজন কুর্দি যুবক গুয়ানিকে জানিয়েছেন, তারা মাদক ক্রয় করার জন্য একটি ট্যাক্সি গাড়িতে ডাকাটি করেন এবং পরবর্তীতে তারা একটি সুফি আস্তানায় তাদের পাপ মোচন করতে যান।

গুয়ানি বলেন, ‘বাস্তু-চ্যুত কুর্দিদের নিকটে সুফি আস্তানাগুলো একধরনের সামাজিক আশ্রয় কেন্দ্রের মত কাজ করে। তারা সেখানে গিয়ে একে অন্যের সাথে যুক্ত হয়, কাজ পায় এবং বিভিন্ন ধরনের খবর সংগ্রহ করে। শীতকালে সেখানে শুধুমাত্র আশ্রয়ই পাওয়া যায় না বরং একটু বিনোদনের জন্য তারা সুযোগ পেয়ে থাকেন।’

গুয়ানির মতে সুফি আস্তানাগুলো অনেক সময় আধ্যাত্মিক মুক্তি দাতা হিসেবে কাজ করে থাকে।

একজন যুবক গুয়ানিকে বলেছেন, ‘এটিই একমাত্র স্থান যেখানে আমরা সুখে থাকতে পারি। বাহিরে আমরা নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না, কারণ আমরা এখনো যুবক। বাহিরে আমরা পতিতাদের নিকটে যাই। আপনি এখানে যাদের দেখবেন তারা সবাই পাপী। উদাহরণ স্বরূপ, আমি বিভিন্ন পার্কে মাদক সেবন করতাম। এখানকার অনেকেই এ্যালকোহল সেবন করত। কেউ কেউ চুরি করত। কিন্তু এখানে সবাই শুদ্ধ হয়ে যায়।’

ক্রিস হুস্টন এবং ওনুর গুনাই’র আলোচনা সভাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরন বুর হলে গত বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ববিদ্যা বিভাগ আলোচনা সভাটির পৃষ্ঠপোষকতা করে।

সূত্রঃ ডেইলি প্রিন্সটনিয়ান ডট কম।