ট্রাম্পের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন ওরা দুইজন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট সিনেটর তুলসি গাব্বার্ডের পর এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর কমলা হ্যারিস। তার বাবা আফ্রিকার জ্যামাইকার অধিবাসী আর মা ভারতীয়।

এর আগে চলতি মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন তুলসি গাব্বার্ড।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে কমলা হ্যারিসের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ঘোষণা কথা বলা হয়েছে। কমলা হ্যারিস সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে এ ঘোষণা দেন। ই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

সোমবার ওই ভিডিওটি প্রকাশ করার সময়ে তিনি এবিসি’র ‘গুড মর্নিং আমেরিকা’ প্রোগামে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি দেশকে ভালবাসি। আর তাই দেশের সর্বোচ্চ কল্যাণের জন্য লড়াই করার দায়িত্ববোধ থেকেই আমার এ নির্বাচন।’

তিনি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘ন্যায়বিচার, সততা, সমতা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এগুলো শুধু একেকটা শব্দই নয়। এগুলো হল এমন মূল্যবোধ যা আমেরিকানরা লালন করে। কিন্তু এসব এখন হুমকির মুখে।’ এসময় সমর্থকদেরকে তার এই ভবিষ্যত গড়ার কাজে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কমলা হ্যারিসের আগে ভারতীয়-বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট তুলসি গব্বার্ড প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কমলা ও তুলিস ছাড়াও মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন আরও তিনজন। তারা হলেন, এলিজাবেথ ওয়ারেন, ক্রিস্টেন গিলিব্র্যান্ড ও জন ডিলানি।

কমলা হ্যারিসের মা ভারতীয় আর বাবা জ্যামাইকান। হ্যারিস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পেলে তিনিই হবেন এ পদের লড়াইয়ে নামা প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান ও একই সঙ্গে প্রথম এশীয় নারী।

সকালের সূর্য যদি দিনের পূর্বাভাস দেয় তবে তুলসি গাব্বার্ডের শুরুটা বলে দিচ্ছিল তিনি অনেকদূর যাবেন। ২০০২ এ মাত্র ২১ বছর বয়সে হাওয়াই রাজ্য সভায় সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। কেবল রাজ্যে নয় সারা যুক্তরাষ্ট্রে স্টেট অফিসে নির্বাচিত সর্বকনিষ্ঠ নারীর রেকর্ডও তার।

আর মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়ে চমকে দিয়েছেন রাজনৈতিক বোদ্ধাদের। এই তরুণের উত্থানে চমক থাকলেও মেধা এবং যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। ২১ বছর বয়সে রাজ্যসভার সদস্য হয়ে যে যাত্রা শুরু, ৩৭ পা দিয়েও কংগ্রেস সদস্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নির্বাহী অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট পদটির দিকে এগিয়ে চলেছেন অপ্রতিহত গতিতে।

বর্তমানে হাওয়াই থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হয়ে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের নির্বাচিত সদস্য তুলসি নিজের অবস্থানে সব সময় ছিলেন দৃঢ়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে তিনিই প্রথম কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী কংগ্রেস সদস্য।

২০১৬ তে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির ভাইস চেয়ারের দায়িত্বে থাকার পরেও বার্নি স্যান্ডার্সের বিরুদ্ধে পরিচালিত অনৈতিক কার্যকলাপের প্রতিবাদে পদত্যাগ করে দলের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে বার্নি স্যান্ডার্সকে সমর্থন প্রদান করেন। তার এই সিদ্ধান্ত হিলারি ও তার ক্ষমতাবান মিত্রদের অসন্তুষ্ট করলেও সেবার তিনি জিতে নিয়েছিলেন বাম, মধ্যবাম ও সচেতন নাগরিকের হৃদয়।

আবার সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার-আল আসাদকে সমর্থন যুগিয়ে সমালোচিতও হয়েছেন যথেষ্ট। মাইকেল রি’র পর তিনি দ্বিতীয় ডেমোক্র্যাটিক দলীয় কংগ্রেস সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন ২১ নবেম্বর ২০১৬। সে সময় এ নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়লেও সব মিথ্যে প্রমাণ করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতে সময় নেননি মোটেও। এছাড়াও সমর্থন করেন গর্ভপাতের অধিকার, গ্লাস-স্টেগ্যাল এ্যাক্ট। আলোচনায় এসেছেন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপির বিরোধিতা করে। তুলসি গাব্বার্ডের জন্ম ১২ এপ্রিল ১৯৮১। পিতা মাইক গাব্বার্ড, মা ক্যারল গাব্বার্ড। ৫ ভাই বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। ২ বছর বয়সে তার পরিবার হাওয়াইতে বসতি গড়ে। মিশ্র সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় পরিম-লে তুলসি বেড়ে ওঠে।

তার পিতা যেমন ক্যাথলিক চার্চেও সক্রিয় সদস্য ছিলেন তেমনি কীর্তন ও চর্চা করতেন। মা ইউরোপীয় সংস্কৃতির উত্তরাধীকারী হলেও পালন করেন হিন্দুধর্ম। টিনএজার থাকা অবস্থায় তুলসি ধর্ম হিসেবে হিন্দুইজম গ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িতেই। মাঝে দুই বছর কাটিয়েছেন ফিলিপিন্সে মিশনারি একাডেমিতে। হাওয়াই প্যাসিফিক ইউসির্ভাসিটি থেকে স্নাতক।

২০০৪-৫ সময়কালে হাওয়াই আর্মি ন্যাশনাল গার্ডের মেডিক্যাল ইউনিটের সদস্য হিসেবে সরাসরি কাজ করেছেন ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখান থেকে ফিরে ২০০৬ এ কাজ করেছেন সিনেটর ড্যানিয়েল আকাকার সহকারী হিসেবে। এরপর কিছুদিন কাজ করেন কুয়েতে। দ্বিতীয় মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে হনুলুনু সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন।

হাউস অব রিপ্রেজেনটিটিভে তিনি আর্মস সার্ভিসেস এবং ফরেন এ্যাফিয়ার্স কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি আরব বিষয়ক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। সব মিলিয়ে ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার নামটা উঠে আসে জোরেশোরে। গাব্বার্ড নিজে স্বীকার না করলেও ইতোমধ্যে তার পক্ষে বার্নি স্যান্ডার্সের ডেপুটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজার রানিয়া ব্যাট্রিসের নিয়োগ প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রানিয়া নিজে তার মতো করে তুলসির পক্ষে দল সাজাচ্ছেন। উদ্দেশ্য একটাই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রেসিডেন্সিয়াল রেসে বিজয়ী হওয়া।

সম্প্রতি আইওয়া রাজ্য পরিদর্শনকালে সেখানকার সাধারণ নাগরিকরা প্রেসেডেন্ট পদে তুলসির প্রতিদ্বন্দ্বিতার পক্ষে জোরালো দাবি জানান। বিভিন্ন সময়ে তুলসির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলেও তিনি কখনই নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। ধারণা করা হচ্ছে ২০২০-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি শক্ত প্রার্থীরূপে আবির্ভূত হবেন। আর আমেরিকা পেয়ে যাবে তাদের তরুণতম প্রেসিডেন্ট। সেটি হয়ত একটি সম্ভাবনা। কিন্তু এ পর্যন্ত তার অর্জনের কারণে সারা বিশ্বের তরুণদের কাছে এখন তিনি রোল মডেল।