অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার নারীদের দুঃসহ কষ্টগাঁথা জীবনসংগ্রামের গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পশ্চিম তীর: হানান আল-খাওদারি যখন তার তিন বছরের অসুস্থ সন্তান লাওয়াকে নিয়ে পূর্ব জেরুজালেমে কেমোথেরাপির চিকিৎসা নিতে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাকে সেখানে প্রবেশে বাধা দান করে। আর এ বিষয়ের বর্ণনা তুলে ধরে তিনি ফেইসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

তিনি বাধা দানকারী ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে জানান যে- ‘তার সন্তান সংযোজক কোষের মারাত্মক টিউমারে ভুগছে’, কিন্তু ইসরাইলি কর্মকর্তাগণ তাদের চিরাচরিত ভুয়া দাবি করে বলেন যে হানানের কিছু আত্মীয় স্বজন হামাসের সক্রিয় সদস্য।

কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ‘Gisha’ এর মতে ইসরাইল সরকার ‘হামাসের সক্রিয় সদস্য’ বলতে ঠিক কি বোঝায় বা এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি তা পরিষ্কার করে কিছুই জানায়নি।

এরকম ক্ষেত্র ভুক্তভোগীরা যদিও কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন কিন্তু তথাপিও ইসরাইল সরকার তাদেরকে ‘হামাসের সক্রিয় সদস্য’ তকমা দিয়ে তাদের চিকিৎসার জন্য ইসরাইলে প্রবেশ করাকে অবৈধ বলে থাকে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘Gisha’ এর কর্মী মুনা হাদ্দাদ বলেন, ‘ইসরাইল আবেদনকারীদের মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে থাকে।’ তিনি ‘আবেদনকারী’ শব্দটি দিয়ে মূলত সাতজন গাজাবাসী নারীকে বুঝিয়েছেন যাদেরকে জরুরি চিকিৎসা সেবা দিতে ইসরাইল সরকার বাধা দিয়েছিল এবং অস্বীকার করেছিল।

গাজায় বসবাসকারী নারীদের কষ্টের কথা খুব কমই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যখন ফিলিস্তিনি নারীগণ পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে একেবারে হারিয়ে যাননি, কিন্তু তাদেরকে দেখা হয় অসুখী ভুক্তভোগী হিসেবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা যাদের প্রতিকূলে রয়েছে।

সত্যিকার অর্থে, ফিলিস্তিনের নারীগণ ভুক্তভোগী হওয়ার ক্ষেত্রে একেবারেই নীরব দর্শক হয়ে থাকতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদেরকে ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনের সীমান্তের বাস্তবতায় পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসা সময়ের দাবী।

সাতজন ফিলিস্তিনি নারী যারা ইসরাইলের আদালতে আবেদন করেছিলেন এবং একই সাথে হানান আল-খাওদারির গল্প গাজায় বসবাসকারী হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারীকেই প্রতিনিধিত্ব করে যাদের জন্য আইনি লড়াই করার বা গণমাধ্যমের খবর করার লোকের বড়ই অভাব রয়েছে।
এরকমই একজন ফিলিস্তিনি নারী ১৯ বছর বয়সী শায়মা তাইসির যিনি গাজা উপত্যকার রাফা নামক স্থানে বসবাস করেন। মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার কারণে তিনি চলাচলের এবং কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন।

কিন্তু তিনি দক্ষিণ গাজা উপত্যকার আল-কুদস ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে সাধারণ শিক্ষার উপর ডিগ্রি নিতে বদ্ধপরিকর।

১৯ বছর বয়সী এই নারীর কষ্ট অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার জন্য অনন্য সাধারণ ঘটনা। তিনি তার পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বড় এবং ইসরাইলি অবরোধের পর থেকে তার পরিবার নিদারুণ অভাবের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। তার পিতা অবসরপ্রাপ্ত এবং তার পরিবার অভাবের সাথে সংগ্রাম করছে, তথাপি শায়মা তার শিক্ষা অর্জন চালিয়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অবসানের পর একজনের সাথে বিবাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এবং অনেক আশায় ছিলেন যে, তার পরিবারের সুদিন আবার ফিরে আসবে।

কিন্তু গত বছরের মার্চ মাসের ১২ তারিখ সব কিছু উল্টে পাল্টে দিল।

সেদিন শায়মা মারাত্মক মস্তিষ্কের ক্যান্সার নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার প্রথম অপারেশনের পূর্বে তার বাগদত্তা তাদের বিবাহ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন।

অস্ত্রোপচারের পরে শায়মা আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, গাজার একটি হাসপাতালে কিছু পরীক্ষার পরে দেখা যায় যে তার মস্তিষ্কের টিউমার পুরোপুরি অপসারণ করা হয়নি এবং এটি বেড়ে উঠার পূর্বেই তা অপসারণ করতে হবে।

এর সাথে যুক্ত হলো গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ঘোষণা, তারা জানান দিল যে, ২০১৮ সালের ১২ অগাস্ট ইসরাইলের অবরোধের কারণে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে তারা অপারগ।

অনেক গাজাবাসী এ পর্যায়ে এসে হাল ছেড়ে দেয়, কিন্তু শায়মা এতেও দমে যান নি। তিনি এবং তার পরিবার এখনো আশায় আছেন যে, তিনি ক্যান্সারের সাথে লড়ে টিকে থাকবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

অন্যদিকে গাজা উপত্যকায় বসবাসকারী ৩৩ বছর বয়সী দোলাতা ফাউজি ইউনিসের গল্পও শায়মার গল্পের সাথে মিলে যায়।

তার ৫৫ বছর বয়সী পিতা যখন কিডনি রোগে আক্রান্ত হন তখন তিনি তার ১১ জনের পরিবারের জীবিকা অর্জনের একমাত্র মানুষ হয়ে দাঁড়ান।

একজন চুল পরিচর্যাকারী হিসেবে তিনি যা আয় করেন তার সবটুকুই তিনি তার পরিবারের জন্য ব্যয় করেন।

দোলাতা ফাউজি একজন শক্ত মনের অধিকারী ব্যক্তি। কিন্তু ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসের ৩ তারিখ তার সমস্ত হিসেব নিকেশ উল্টে যায়। সেদিন ঐতিহাসিক আল-নসর মসজিদে হামলার জন্য তিনি আরো অনেক ফিলিস্তিনি নারীর সাথে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিতে গেলে একজন ইসরাইলি সেনা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই দুজন নারী মারা যান আর দোলাতা ফাউজি তার যৌনাঙ্গের কিছুটা নিকটে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন।

এর পরে অবস্থা আরো গুরুতর হয়। ২০১৮ সালের মে মাসের ১৪ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা দিলে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অন্তত ৬০ ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং অন্তত ৩,০০০ হাজার গাজাবাসী আহত হন। আর দোলাতা ফাউজি তার ডান উরুতে গুলিবিদ্ধ হন।

আর এতে করে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং তিনি বর্তমানে কোনো ধরনের কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এত কিছু সত্বেও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জেরুজালেমে চিকিৎসা নেয়ার জন্য অনুমতি দানের আবেদন গ্রহণ করেনি।

বাস্তবিকভাবে এসকল নারী অবরুদ্ধ পশ্চিম তীর এবং গাজার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

তারা এত বড় মূল্য দেয়া সত্ত্বেও সহ্য করে যাচ্ছেন এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আর একই সাথে সকল ফিলিস্তিনি নারীদের সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন যারা তাদের সামনে থেকে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত রয়েছেন।

সূত্র: মিডেলইস্টমনিটর ডট কম।