ফের বিমান হামলা-গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত, বিক্ষোভ-সংঘর্ষ অব্যাহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পূর্ব জেরুজালেম: জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার পর গাজার পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং অপর একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। খবর দ্যা গার্ডিয়ানের।

এদিকে শুক্রবার রাতে ফের বিমান হামলা চালিয়ে ইসরাইল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনের জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পর এটা ইসরাইলের দ্বিতীয় দফা বিমান হামলা বলে জানা গেছে। শুক্রবার দিনভর বিক্ষোভের সময় ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা খুবই গুরুতর।

ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকেই পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ-ধর্মঘট করছে। তাদের ঠেকাতে শত শত অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে ইসরাইল।

বিক্ষোভকারীদের গাড়ির টায়ার জ্বালানো এবং পাথর ছুড়ে মারার জবাবে ইসরাইলি সেনারা টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়াসহ তাজা গুলিবর্ষণও করেছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি, গাজা থেকে ইসরাইলে দুটো রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে।

গাজায় ইসরাইলি সেনারা গুলিও করেছে। এ ঘটনায় ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের সীমান্ত বেষ্টনী এলাকায় সেনাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়েছে।

এছাড়া জেরুজালেমসহ বেথলেহেম, রামাল্লাহ ও অন্যান্য শহরগুলোতেও বিক্ষোভ-সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে দুই শতাধিক আহত হওয়ার খবর জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপি।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় শুক্রবার রাতে আবার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সামরিক বাহিনী নতুন করে বিমান ও ট্যাংক নিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস শহর নিয়ে যখন গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা চলছে তখন এই হামলার ঘটনা ঘটলো। ইহুদিবাদী সেনারা গাজা উপত্যকার বেইত হানুন শহরের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে কামানোর গোলা বর্ষণ করে। এ শহরের পূর্বাঞ্চলে কয়েকজন হামাস যোদ্ধার ওপরও বিমান হামলা চালায় ইসরাইল।

এছাড়া, গাজার বেইত লাহিয়া শহরে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে ইসরাইল। গাজা উপত্যকার উত্তরে শেখ জায়েদ এলাকায় ইসরাইলি বিমান থেকে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।

গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ছয় শিশুসহ প্রায় দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

এদিকে ইসরাইল দাবি করেছে, গাজা থেকে রকেট ছোঁড়ার পর এসব হামলা চালানো হয়। ইসরাইলের বিমান ও ট্যাংক হামলার কারণে আশংকা করা হচ্ছে-যেকোনো সময় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।

বৈঠক বাতিল না করতে ফিলিস্তিনকে মার্কিন হুঁশিয়ারি

জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বীকৃতি দেয়ার পর, গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সংঘর্ষে অনেক আহত হয়েছে।

মার্কিন এই ঘোষণার প্রতিবাদে, এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সাথে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের পূর্ব নির্ধারিত সাক্ষাতও বাতিল করে দেবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এ প্রেক্ষাপটে বৈঠক বাতিল না করতে ফিলিস্তিনকে সতর্ক করে দিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

ওদিকে জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকৃতি দেবার পর চারিদিকে নিন্দার ঝড় উঠেছে। আর এরই মধ্যে গাজা ও পশ্চিম তীরে ছড়িয়ে পড়েছে সংঘর্ষ।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে অন্তত ৩১ জন আহত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। আহতদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ফিলিস্তিনে লোকজন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এলে পশ্চিম তীরে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছে ইসরাইল। বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিক ইট-পাটকেল ছুঁড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে।

এদিকে, এসব ঘটনার মধ্যেই ফিলিস্তিনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে হোয়াইট হাউস। এই মাসের শেষের দিকে সেই অঞ্চলে এক সফরে যাবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। কিন্তু সেই সময়ে তাকে স্বাগত জানানো হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্যালেস্টাইনের একজন কর্মকর্তা জিব্রি রাজৌব।

কিন্তু নির্ধারিত বৈঠক ফিলিস্তিন যাতে বাতিল না করে সেই মর্মে আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে হোয়াইট হাউস বলেছে, এই ধরণের সিদ্ধান্ত বরং আরো উল্টো ফল বয়ে আনবে।

বিতর্কিত নগরী জেরুসালেমকে বুধবারে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন দূতাবাস সেখানে স্থানান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল।ড ট্রাম্প।

তার এই ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ।

এদিকে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই স্বীকৃতিকে অসহযোগিতামুলক বলেছে।

জেরুসালেম ইস্যুতে ক্ষোভে সামিল হয়েছে ১৫০ কোটি জনতা
আরবী সংবাদপত্র রাই আল-উয়ুমের সম্পাদক ও মধ্য প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আবদেল বারি আতওয়ানের ব্যক্তিগত মতামত যার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ভাষা বিভাগগুলোর সামজিক বিষয়ক সংবাদদাতা ভ্যালেরিয়া পেরাস্যো।

‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপ হয়ত আরব ও মুসলিম দুনিয়াকে নতুন করে সচেতন করে তুলতে পারে যে ওই এলাকায় শান্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমেরিকার যে ধ্যানধারণা তাদের হয়ত সে ব্যাপারে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।’

এখন যখন তারা বুঝতে পারছে যে আমেরিকা ইসরোইলেরই পক্ষ নিচ্ছে, তখন তাদের মনে হতে পারে যে তাদের অনুভূতি বা আবেগের তোয়াক্কা আমেরিকা করে না অথবা ওই এলাকার স্থিতিশীলতা নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথা নেই।

যে বিষয়টাতে মুসলিম বিশ্ব সবসময়েই অখণ্ড মনোভাব পোষণ করে এসেছে সেটা হল ফিলিস্তিনি ইস্যু। সিরিয়া নিয়ে তাদের মতভেদ থাকতে পারে, ইরাক নিয়ে তাদের মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু যখন ফিলিস্তিনের বিষয় আসে এবং বিশেষ করে পবিত্র স্থান জেরুসালেম প্রসঙ্গে তারা অভিন্ন অবস্থান নেয়।

সামনের দিকে তাকাতে হলে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যেতে পারে, যেখানে এই ইস্যুতে অভিন্নতা প্রধান হয়ে উঠতে পারে এবং একটা প্রতীকী পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের সংহতি আরও জোরালো করে তুলতে পারে।

বিশেষ করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, এবং তেল আভিভ থেকে জেরুসালেমে আমেরিকা দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

এটা অবশ্য নতুন কোন ইস্যু নয়। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে আরেকটা ইন্তিফাদা যে হবে এটা ভাবা অযৌক্তিক কিছু নয়। হামাস ইতিমধ্যেই অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে।

মুসলিম দুনিয়ায় একটা বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল যে একটা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে দিয়ে সমাধানের একটা পথ, একটা শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথ হয়ত তৈরি হয়েছে। কিন্তু অসলো চুক্তির ২৩ বছর পর আসলে কিছুই হয়নি। ওয়েস্ট ব্যাংক এবং জেরুসালেমে ৮ লক্ষ ইসরাইলি বসতি তৈরি হয়েছে।

কাজেই এই সিদ্ধান্তের ফলে শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের বদলে তার যে পুরোপুরিই মৃত্যু ঘটেছে এ ব্যাপারে এখন কারো মনেই যে আর সন্দেহ নেই সেটা বলা যায়।

আমাদের এখন মধ্য প্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ের মধ্যে থাকার কথা। এখন ট্রাম্প কীভাবে সেটা করবেন এবং একইসঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়াকে কীভাবে তিনি রক্ষা করবেন? এটা যে অসম্ভব এখন সে ধারণাটাই প্রকট হচ্ছে। জেরুসালেমের ভবিষ্যত রয়েছে এর মূলে। ইসরাইলিদের কথা ভেবে যদি জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে শান্তি আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের জন্য আলাপ করার জন্য কী বাকি থাকবে?

অদূর ভবিষ্যতে এর একটা পরিণাম দেখা যাবে। প্রতিবাদ বিক্ষোভ হবে, সহিংসতার হুমকি রয়েছে, আরেকটি ইন্তিফাদা হতে যাচ্ছে। এরপরেও কী ফল হবে তা স্পষ্ট নয়। শুধু যেটা স্পষ্ট সেটা হল মানুষ ক্ষুব্ধ।

এই ক্ষোভে সামিল হয়েছে ৫৬টি মুসলমান প্রধান দেশের ১৫০কোটি মানুষ, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ২২ শতাংশের বেশি। কারণ মক্কা আর মদিনার পর জেরুসালেম তাদের সবার জন্য পবিত্র একটি স্থান।

এটা একটা অপমান এবং এর পেছনে কোন যুক্তি নেই। আমেরিকা কেন তার দূতাবাস সরিয়ে নিতে চাইছে, আর সেটা এখন কেন চাইছে? আসলে একটা পরাশক্তি চাইছে ইসরাইলের যুক্তিকে স্বীকৃতি দিতে এবং সেই স্বীকৃতি তারা দিচ্ছে এমন একটা স্থানকে ঘিরে যেটা মুসলমানরা মনে করে পবিত্র এবং যেটা তাদের একান্ত নিজস্ব।

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কি অন্য মতানৈক্যকে জোড়া দেবে? ৫৬টি মুসলিম প্রধান দেশের মধ্যে বহু বড়ধরনের মতানৈক্য আছে। সেগুলো সূক্ষ্ম, ব্যাপক এবং জটিল। জেরুসালেম ইস্যুর থেকেও সেগুলো অনেক বড়।

বেশিরভাগ মুসলমান প্রধান দেশ জেরুসালেম প্রশ্নে তাদের মতভেদ দেখাবে না কারণ ওই শহর মুসলমানদের জন্য অভিন্ন গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু এসব বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে যা কাটিয়ে ওঠা যাবে না।

অন্য যে বিষয়ে বড়ধরনের পরস্পরবিরোধিতা তৈরি হল, সেটা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। পশ্চিমা দেশগুলো ইসলামী জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিলেন তা হল আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার এবং সবচেয়ে ভাল অস্ত্র।

এই দলগুলো এখন ভাবতেই পারে যে ‘দেখ, যে আমেরিকা আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা ইরাকে এবং সিরিয়ায় আমাদের শক্তি ধ্বংস করে দেবার পর এখন ইসরাইলিদের পুরস্কৃত করছে, আরবদের নয়।’ এর ফলে আমাদের এলাকায় সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তার ঢেউ ইউরোপ এবং আমেরিকায় গিয়েও পৌঁছতে পারে। জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেবার পরিণামে সেখানে ‘প্রতিশোধমূলক তৎপরতা’ চালানো হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত জঙ্গীদের অনুকূলে কাজ করতে পারে, মধ্য প্রাচ্যে আমেরিকার যারা মিত্র আছে, যেমন মিশর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমীরাত এই সিদ্ধান্ত তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। আমি মনে করি এই সিদ্ধান্তে হিতে বিপরীতই হতে পারে।

ফিলিস্তিনি ইস্যুতে এটা হয়ত মানুষকে মাঠের আন্দোলনে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবে। তবে একটা সংহতি গড়ে তোলার বদলে এর ফলে ওই অঞ্চল আরও অশান্ত হয়ে উঠবে।

এর বিপরীতমুখী দিকটা হল: এই পদক্ষেপ বিভিন্ন মুসলিম দেশের মানুষকে হয়ত একটা অভিন্ন জায়গায় নিয়ে আসতে সাহায্য করবে, কিন্তু একই সঙ্গে এই পদক্ষেপ উগ্রবাদ এবং জঙ্গী আদর্শকে আরও উদ্বুদ্ধ করতেও সাহায্য করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।