ধর্মান্তরিত সাংবাদিক মারজিয়াহকে হয়রানির পেছনে যেসব কূটকৌশল মার্কিনিদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তেহরান: চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের ২৩ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে ১০ দিন আটক থাকার পর বিতর্কের মুখে দেশটির কর্তৃপক্ষ ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব টেলিভিশনের একজন উপস্থাপিকাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আর তার মুক্তিতে উল্লাসিত সমর্থকগণ ব্যাপক আনন্দ প্রকাশ করে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমসমূহের তুমুল সমালোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র তাকে মুক্তি দিতে একপ্রকার বাধ্য হয়।

মারজিয়াহ হাসেমি নামের এই উপস্থাপিকা ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভির ইংরেজি মাধ্যমে কর্মরত ছিলেন এবং তার মুক্তির দৃশ্য বিমানবন্দর থেকে সরাসরি লাইভ করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদেরকে ইরানের পতাকা উড়াতে দেখা যায়।

মারজিয়াহ হাসেমি নামের ৫৯ বছর বয়সী এই উপস্থাপিকার আটক ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলেন’স এ জন্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ইরানের একজন নাগরিককে বিবাহ করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন আর এ বিবাহের মাধ্যমে তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব লাভ করেন।

আটকের পূর্বে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণরত ছিলেন। মারজিয়াহ হাসেমি একটি ফৌজদারী মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ ফাঁস করে দিয়েছেন এই অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দেশটির ফেডেরাল আদালত জানায়।

যদিও তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারী আইনে অভিযোগ গঠন করা হয়নি, কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞগণ এবং মুসলিম নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত কর্মীগণ এ ধরনের আটকাদেশের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই বলে প্রশ্ন তুলেছেন।

মারজিয়াহ হাসেমি মুক্তির পরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘তাকে যে আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সে আইনটি পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে কৃষ্ণাঙ্গ এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়।’

মারজিয়াহ হাসেমি বলেন, ‘আমার সাথে যা হয়েছে তা একই সাথে ইরান এবং পশ্চিমের গল্প বলে। আমাদের এখন প্রয়োজন হচ্ছে একসাথে মানুষের মানবাধিকার রক্ষার জন্য চাপ প্রয়োগ করা, কিন্তু আমেরিকার মত ভুল পন্থায় নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রে গণমাধ্যম কর্মীদের সম্মান করা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে অসম্মান এবং হুমকির প্রচারণা দেখেছি।’

যুক্তরাষ্ট্রে আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে মুসলিম এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের হয়রানি করছে বলে ইরান সরকার থেকে মন্তব্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নার্গেস বাজোগলি বলেন, ‘ইরান সরকারের এসব প্রচারণা মারজিয়াহ হাসেমির পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে।’

Atlantic Council’s Future of Iran initiative এর একজন ইরান বিশেষজ্ঞ বারবারা স্লাভিন বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল তারা ইরানে আটক আমেরিকানদের মুক্তির জন্য কাজ করছে এবং মারজিহ হাসেমির আটক তাদের এসব কাজের সাথে সংযুক্ত হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আটক আমেরিকানদের মুক্তির ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। সুতরাং এটি একধরনের মানসিক যুদ্ধের মত বিষয়।’

এদিকে ইরানে বিভিন্ন দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সাংবাদিকগণ দেশটিতে দীর্ঘ মেয়াদী আটকের মুখোমুখি হন। বার্তা সংস্থা নিউজউইকের সাংবাদিক মাজিয়ার বাহারি নামের একজন ইরানি-কানাডিয়ান সাংবাদিককে ইরান সরকার ১১৮ দিন আটক করে রেখেছিল। তিনি প্রেস টিভির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, চ্যানেলটি ২০১২ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ করে রেখেছে।

২০০৯ সালে ইরানের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের সময় দেশটির গণমাধ্যমসমূহকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মারজিয়াহ হাসেমি কাজ করেছিলেন। তবে এসব গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ইহুদি বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। এদিকে মারজিয়াহ হাসেমি এবং প্রেস টিভির কোনো কর্মকর্তার সাথে এ বিষয়ে আলাপ করার জন্য চেষ্টা করা হলে তা সফল হয় নি।

মারজিয়াহ হাসেমিকে আটকের পরে ‘Committee to Protect Journalists’ নামের সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তবে সংস্থাটি এও জানিয়েছে যে, গত বছর বিশ্বব্যাপী অন্তত ২৫১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল এবং তার একটিও যুক্তরাষ্ট্রের ঘটেনি, অন্যদিকে ইরানে ৮ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, মারজিয়াহ হাসেমির আটকের পর তার সহকর্মীরা ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থিত জাতিসংঘের ভবনের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে আটক সাংবাদিকের স্বাধীনতা দাবি করেছিল।

বার্তা সংস্থা ওয়াশিংটন পোস্টের বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, মারজিয়াহ হাসেমির আটকের পর ইরানের একটি কট্টরপন্থী সংবাদপত্র তার আটককে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডের সাথে তুলনা করেছিল।

হাসমির আটকের পরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাভেদ যারিফ এক টুইটার বার্তায় হাসমিকে মুক্তি দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। তিনি একটি রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসেমির আটককে ‘রাজনীতির খেলা’ বলে উল্লেখ করে আমেরিকার বর্ণবাদ বন্ধের আহ্বান জানান।

সূত্র: cjr.org এ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক শাইয়া তায়েফে মোহাজেরের কলাম থেকে।