পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের অবস্থান ও বাস্তব পরিস্থিতি, একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: প্রতি শুক্রবার মধ্যাহ্নভোজনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজের নিকটবর্তী খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটন চার্চ অফ দ্যা ইপিপহানি একটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। শত শত মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রতি শুক্রবার চার্চটিতে জুমার সালাত আদায় করার জন্য জমায়েত হন এবং কেবলা মুখী হয়ে সালাত আদায় করেন।

এই মিলন মেলায় মুসলিমরা ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের কর্মকর্তা, এফবিআই গোয়েন্দা, সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশটির বিচার বিভাগের আইনজীবীরা অংশগ্রহণ করেন।

শুক্রবারের জুমার সালাতের ইমাম হিসেবে থাকেন দেশটির একজন রাজস্ব বিভাগের একজন মুসলিম কর্মকর্তা।

আমেরিকার মুসলিমরা এই দেশে আসেন দীর্ঘ ইতিহাস পাড়ি দিয়ে, আর তাদের অনেকের পূর্বসূরি ১৬তম শতাব্দীতে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে এখানে এসেছেন। আর ১৯ শতাব্দী থেকে ১৯২০ সাল অবধি আরবদের দেশটিতে আগমন বাড়তে থাকে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসেবে এখানে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেয়ারব্রন, মিশিগান ইত্যাদি রাজ্য ছাড়া দেশটির অন্যান্য অঞ্চলে মুসলিমরা তেমন একটি বসতি গড়েনি, আর বর্তমানে দেশটিতে মুসলিমদের সংখ্যা অন্তত ৩.৫ মিলিয়ন যা দেশটির মোট জনসংখ্যার ১.১ শতাংশ।

ইউরোপের সাথে ইসলামের সম্পর্ক অনেক দীর্ঘ, গভীর এবং বিতর্কিত। ইসলাম ধর্ম প্রথমে ইউরোপে আগমন করে ৮তম শতাব্দীতে খিলাফতের অংশ হিসেবে স্পেন জয়ের মাধ্যমে। আর এর পর ১৪তম শতকের শুরুতে অটোমানদের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইউরোপে প্রবেশের মাধ্যমে।

আর ২০ শতকে ইউরোপের মুসলিমরা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমদের থেকে অনেকাংশেই ভিন্ন। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরেও মিলিয়ন মিলিয়ন মুসলিম ইউরোপে থেকে যান এবং তারা এখানে দক্ষ কর্মী এবং সৈন্য হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন।

আর দুই দশকের মধ্যেই ১৯৪৫ সালের পরে ইউরোপের সরকারসমূহ হাজার হাজার দিন মজুরদের নিজেদের দেশে নিয়ে আসতে থাকেন। যুক্তরাজ্য পাকিস্তানের কাশ্মীরি পাহাড় এবং বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল থেকে, ফ্রান্স আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এবং জার্মানি তুরস্কের আনাতোলিয়ান নামক পাহাড়ি অঞ্চল থেকে কর্মীদের দেশে ভেড়াতে থাকে।

ইউরোপে আগত এসব কর্মীদের তাদের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও তারা সেখানে স্থায়ী হন এবং এসব দেশের নাগরিকত্ব পান। আর অতি সম্প্রতি ২০১৪ এবং ২০১৬ সালে ইউরোপে যেসব অভিবাসীরা আসেন তাদের বেশীর ভাগই আরব দেশের নাগরিক। জার্মানি তাদের অধিকাংশকেই গ্রহণ করে।

তারা কর্মী চায় আর লোকজন এখানে এসে ভিড় জমায়
রাশিয়া এবং তুরস্ককে বাদ দিলে বর্তমানে ইউরোপে অন্তত ২৬ মিলিয়ন মুসলিমের বসবাস, যারা এখানকার মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ এবং তাদের অধিকাংশই ইউরোপিয়ানদের চাইতে তরুণ বয়সের। আর ইউরোপের অনেক দেশেই শিশুর নাম হিসেবে মুহাম্মদ নামটি ব্যাপক জনপ্রিয়।

তবে সংখ্যার দিক থেকে মিল হলেও মুসলিমরা সমজাতীয় নয়। তারা ধর্মীয় চর্চা, সংস্কৃতি, জাতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে পৃথক। যদিও যুক্তরাজ্য সকল ধর্মের লোকজনের জন্য ধর্ম চর্চা স্বাধীন করেছে কিন্তু ফ্রান্স মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতীক নারীদের পর্দার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

অনেক দিক থেকেই ২০শতকে পশ্চিমে মুসলিমদের আগমন সুখকর ছিল। তাদের অধিকাংশ এসেছিল বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে এবং তারা এখানে এসে বংশ বৃদ্ধি করে আর স্থানীয়দের সাথে মিশে যায়।

আর মুসলিমদের তৃতীয় প্রজন্মের অধিকাংশই একই সাথে তাদের পশ্চিমা এবং ইসলামী পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করে।

পশ্চিমের রাজনীতিতে দিন দিন মুসলিমদের আধিপত্য বেড়ে চলেছে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাশিদা তালিব এবং ইলহান ওমার নামের দুজন মুসলিম নারী দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মত মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেসওম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।

অন্যদিকে ইউরোপের সবচেয়ে বড় শহর লন্ডনের মেয়র হিসেবে সাদিক খান নামের একজন মুসলিম নির্বাচিত হন। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দর রোটের্ডামের মেয়র হচ্ছেন মরক্কোর বংশোদ্ভূত আহমেদ আবু তালেব।

কিন্তু ইউরোপের মুসলিম ইতিহাসের গত দু দশক ছিল একই সাথে ভয় এবং সংঘাতের। ২০০০ সালের পর থেকে আজ অবধি পশ্চিমে জিহাদিদের আক্রমণে অন্তত ৩,৬৭০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২,৯৯৬ জন নিহত হয়েছিল ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার মধ্যমে।

অন্যদিকে একই সময়ে মুসলিম বিরোধী বিভিন্ন আক্রমণে এসব দেশে অন্তত ১৯৯ জন মানুষ নিহত হয়েছিলেন। যদিও সংঘাতের পরিমাণ অতোটা ভয়াবহ নয় তবুও পশ্চিমের দেশসমূহের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক একেবারেই বাজে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিমরা ইউরোপে বসবাসরত মুসলিমদের চাইতে ভালো অবস্থানে রয়েছেন। তারা এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর, অনেক বেশী একতাবদ্ধ এবং দেশটিতে তাদের সম্পর্ক মোটামুটি সুখকর অবস্থানে রয়েছে।

তবে ২০১৭ সালে করা এক পরিসংখ্যান জানায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়সমূহের মুসলিম শিক্ষার্থীদের মোট ৪২ শতাংশ তাদের ধর্ম বিশ্বাসের কারণে আক্রমণের শিকার হয়েছেন। প্রতি পাঁচ জনের একজন আমেরিকান মুসলিমদের ভোটাধিকার দেয়ার বিপক্ষে। আর দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এধরনের বিরূপ মনোভাব আরো উস্কে দেন।

পশ্চিমে প্রথম মুসলিম প্রজন্ম সমূহকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে এসব দেশে আগত মুসলিমরা এখানে তাদের ধর্মীয় প্রথা সমূহের বিস্তার করতে শুরু করে। তুরস্ক, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে মুসলিম ইমামেরা ইউরোপে আসতে থাকেন। কিছু মুসলিম দেশ এখানে ধর্মীয় ভবন এবং মসজিদ নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছে।

একই সাথে পশ্চিমাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠার সাথে সাথে এসব দেশে আগত অভিবাসীরা তাদের নিজেদের অতীত সম্পর্কে ভুলে যেতে বসেছেন। আর এখানে তাদের জাতিগত পরিচয়ের চাইতেও তাদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকট আকার ধারণ করেছে।

আর পশ্চিমারা দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিমদের মোটামুটি অগ্রাহ্য করে চলেছে এবং তারা এখানে শুধুমাত্র তাদেরকেই স্বাগত জানায় যারা পশ্চিমের ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্ক জ্ঞাত আছে।

অন্যদিকে তৃতীয় প্রজন্মের মুসলিমেরা এখানে একই সাথে তাদের পশ্চিমা এবং ইসলামি পরিচয় নিয়ে গর্বিত। তাদের হাতে স্থানীয় রাজনীতি এবং বিচার ব্যবস্থার সাথে আপোষ করার মত প্রয়োজনীয় রসদ রয়েছে।

পশ্চিমের দেশ সমূহে অবস্থিত ১০,০০০ হাজারেরও অধিক মসজিদ এখানকার ইসলামিক বিশ্বাসের বর্ণিল দিকটাই তুলে ধরে এবং এসব মসজিদ যেমন দক্ষিণ এশিয়ার দেওবন্দ অনুসারীরা নেতৃত্ব দেয় একই সাথে এখানে নারী নেতৃত্বের মসজিদও রয়েছে।

অতীত এবং সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কারণে এখানকার মুসলিমগণ পশ্চিমে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত। কিন্তু যদি মুসলিমদের মূল ধারাকে সামনে নিয়ে আসা হয় তবে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

পশ্চিমে তৃতীয় প্রজন্মের মুসলিমদের আগমনের পরে তারা এখানকার অতি বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ এবং ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থায় যেখানে ইসলামপন্থীদের হাতে তেমন একটা শক্তি নেই সেখানে তত্ত্বীয়ভাবে টিকে থাকার দীক্ষা নিচ্ছে। আর মোদ্দাকথা হচ্ছে, তারা এখানে একটি পশ্চিমা ইসলাম গড়ে তুলছে।

সূত্র: ইকোনোমিস্ট ডট কম।