অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন চালুর উদ্যোগ, মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ক্যানবেরা: ইসলামিক বিরোধ নিষ্পত্তি নীতি হচ্ছে- আদালতের দারস্থ না হয়েই আপোষে বিরোধ সমূহের নিষ্পত্তি করে ফেলা, যা অনেকটা আধুনিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ধারণার মত।

সম্প্রতি ইসলামিক বিরোধ নিষ্পত্তির ধারণাকে অস্ট্রেলিয়ার আইনে প্রয়োগ করার জন্য ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে এবং দেশটির মুসলিমদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

আপোষের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি কেন এত সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে? আর অষ্ট্রেলিয়ায় এর প্রতিফলনের ক্ষেত্রে কি কি বিষয়ের অবতারণা করতে হবে?

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কি?
অষ্ট্রেলিয়ায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বলতে বোঝায় বিবদমান পক্ষসমূহ আদালতে দ্বারস্থ না হয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আপোষ রফায় আসা। আর বিকল্পভাবে, এটি অনেক সময় পক্ষসমূহ এবং তাদের আইনজীবীগণ আদালতে না গিয়ে আপোষের মাধ্যমে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার মত একটি বিষয়।

একে উৎসাহ দেয়া হয় কারণ এটি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর পন্থা। বিবদমান পক্ষ সমূহ এর মাধ্যমে তাদের অর্থ এবং সময় দুটোই বাঁচাতে পারেন।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি চুক্তি, মধ্যস্থতা, আপোষ এবং সালিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থা। যা একই সাথে আভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বীকৃত এবং এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পক্ষ সমূহের জন্য বাধ্যকর।

ইসলামি আইনে কি রয়েছে?
একইভাবে আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে আপোষে বিরোধ নিষ্পত্তি করে ফেলার জন্য ইসলামিক আইনে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

ইসলামে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয় ইসলামি আইনের আওতায় যা শরিয়া বা ইসলামি আইন নামে পরিচিত।

ইসলামি আইনের প্রাথমিক দুটো উৎস রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে পবিত্র কুরআন আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুহাম্মদ(সা.) এর কথা, কর্ম, অনুমোদন ইত্যাদি যা সুন্নাহ বা হাদিস নামে পরিচিত।

একই সাথে ইসলামিক আইন বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিদের ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে এবং ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এর ভিন্নতা দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক বিষয়ে ইসলামিক আইনের অধীনে সালিশ করা সম্ভব। The Asian International Arbitration Centre নামের সংস্থা ‘i-Arbitration’ নামের একটি সালিশের ধারণা তৈরী করেছে যা ইসলামিক আইনের আওতায় করা হয়েছে।

উদারহণ স্বরূপ, কোনো সালিশ কারক হয়ত ইসলামিক আইনের আওতায় শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে সুদের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবে না। যদিও ইসলামিক আইন ব্যবসা এবং মুনাফার স্বীকৃতি দেয় কিন্তু এটি সুদ নিষিদ্ধ করেছে।

‘i-Arbitration’ এর আওতায় তৈরী করা নীতি সমূহের মধ্যে ‘United Nations Commission on International Trade Law (UNCITRAL) Arbitration Rules’ প্রতিফলন হয়েছে।

বাধ্যবাধকতা সমূহ কি?
২০০৯ সালে অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করার আলোচনা শুরু হলে দেশটির মুসলিম সমাজের মধ্যে এ নিয়ে ভিন্নতা দেখা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া নামক রাজ্য থেকে এ ধারণার প্রতি সমর্থন জানানো হলেও স্থানীয় ‘Islamic Council of Victoria’ নামক একটি সংস্থা এর বিরোধিতা করে।

‘শরিয়া আইনের’ অপব্যাখ্যার মাধ্যমে একে কলুষিত করা হবে বলে সংগঠনটি সে সময় ভয়ের মধ্যে ছিল। একই সাথে ‘Islamic Women’s Welfare Council of Victoria’ নামক সংগঠন থেকে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করা হয় যে, শরিয়া আইনের অব্যাখ্যার মাধ্যমে হয়ত অযাচিত বিতর্ক শুরু হবে।

উদাহরণ স্বরূপ, যুক্তরাজ্যের এক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কিছু মামলায় পুরুষ সালিশ দারগণ নারীদের জন্য এক খুব কঠিন করে তোলেন।
তবে অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রণয়নের বিষয়ে দেশটির প্রধান আইন কর্মকর্তা রবার্ট মেককলেলান্ড পরিষ্কার করে বলেন, তার দেশে ইসলামিক আইনের কোনো স্থান নেই।

অস্ট্রেলিয়ান আইনের সাথে এটি কিভাবে কাজ করবে?
তথাপি, অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং এর সাথে নারীদের প্রতি বৈষম্যের সংযুক্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের তদন্ত করা হয় নি।

যদি অষ্ট্রেলিয়ায় ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতিফলন হয় তবে এটি ঠিক কিভাবে নারী অধিকারের বিরুদ্ধে যাবে এ সম্পর্কিত কোনো পরিষ্কার গবেষণা হয় নি।

একই সাথে এ বিষয়টিও পরিষ্কার নয় যে, অস্ট্রেলিয়ার বলবত আইনের সাথে ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ঠিক কিভাবে কাজ করবে। এটি কি অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত আইন থেকে আলাদা হবে? কিংবা এটি কি প্রথাগত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির একটি অংশ হবে নাকি এর থেকে আলাদা হবে তাও পরিষ্কার নয়।

আমরা যুক্তরাজ্য থেকে কি শিখতে পারি?
যুক্তরাজ্যে ‘Muslim Arbitral Tribunals’ নামে একটি ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কাজ করে এবং এটি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি যুক্তরাজ্যের প্রথাগত আইনের বাহিরে কোনো সমান্তরাল বিচার ব্যবস্থার অনুসরণ করে না। এর মাধ্যমে সেখানে ব্যবসায়ীক, দেওয়ানি, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত আইনি বিষয় সমূহের সমাধান দেয়া হয়।

২০০৮ সালে এসব মুসলিম সালিশ ট্রাইব্যুনালের কিছু প্রতিবেদন যুক্তরাজ্যের আইনসভায় উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনে মুসলিম সালিশ ট্রাইব্যুনাল সমূহের প্রতি নারীদের আরো সংযুক্ত করার জন্য সুপারিশ করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এবং মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করা হয়। এ গবেষণা উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কি নারীদের বিভিন্ন সমস্যা যেমন, গৃহ বিবাদ, নারী অধিকার এবং তালাকের মত বিষয় সমূহের সমাধান দিতে পারে কি না?

তবে গবেষণায় উঠে আসে যে, ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি অস্ট্রেলিয়ার আইনের সাথে যোগসূত্র রেখে নারীদের অধিকার সমুন্নত রাখতে সক্ষম।

একই সাথে ইসলামিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে দেখতে হবে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে যার উদ্দেশ্য নারীর ক্ষমতায়ন।

সূত্র: দ্যাকনভার্সেশন ডট কম।