ইসলাম, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বারাক ওবামার একটি অপ্রত্যাশিত ভাষণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ওয়াশিংটন: বারাক ওবামা প্রথমবারের মত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে জুন মাসে মিশরের কায়রো শহরে একটি অপ্রত্যাশিত ভাষণ প্রদান করেন। তার ভাষণে তিনি কোনো দেশ, কোনো আইনসভা অথবা কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠনের কথা উল্লেখ না করে তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা একটি ধর্মের অনুসারীদের কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার একটি নতুন সম্পর্ক শুরু করতে কায়রোয় এসেছি।’

তার ওই ভাষণটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, কেননা প্রথমবারের মত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট তার ভাষণে একটি একক ধর্ম অনুসারীদের তার দর্শক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

বারাক ওবামার ভাষণ দেয়ার অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল ইসলামের সবচেয়ে পুরনো এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় যেখান থেকে তিনি বিশ্বের সকল মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তার বার্তা পৌঁছিয়েছিলেন।

কেন বারাক ওবামা অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে এমন একটি ভাষণ দিলেন? এর পূর্বে তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় ইরাক এবং আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

সত্যিকারভাবে ওবামার পূর্বসূরি জর্জ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের সকল শক্তি দিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং তার ভাষায় তা ছিল উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, যাকে তিনি ‘একটি শান্তির ধর্ম’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

এর পরে বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তার ভাষণে বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে চলমান একটি উত্তেজনার মধ্যেই একে অন্যের সাথে সাক্ষাত করতে যাচ্ছি। আমেরিকা কখনো ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’

বারক ওবামা তার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সাথে চলমান উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা সামনে নিয়ে এসেছিলেন।

আর গত শতাব্দীর ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ‘International Religious Freedom Act’ নামে একটি আইন পাস করে যাতে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করবে।

বারাক ওবামা ঠিক কি বোঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার নয় যেখানে পশ্চিমা সমাজ ইসলামের উপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। তার কায়রোতে দেয়া ভাষণে তিনি ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়ে খুবই উষ্ণভাবে এবং জোর দিয়ে বলেছেন। এবং এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নিকট প্রিয় একটি বিষয় বলেও উপস্থাপন করে বলেন, ‘যখন ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে চলে আসে তখন আমেরিকার স্বাধীনতা উহ্য হয়ে যায়।’

বারাক ওবামা সঠিক ছিলেন যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি বৈশ্বিকনীতি এবং তা মানুষের সম্মানের সাথে জড়িত যদিও তা পশ্চিমাদের নিকট অতোটা সমাদৃত নয়।

ইসলাম ধর্ম কি ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে? এ প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে তিনটি বিষয় বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে।

প্রথমত, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পরে ইসলাম সম্পর্কে তুমুল বিতর্ক শুরু হয় এবং এর ফলাফল স্বরূপ পশ্চিমা দেশসমূহের সাথে মুসলিম বিশ্বের দূরত্ব তৈরি হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা কি তা এই বিতর্ক দ্বারা নির্ণয় করা যাবে না কিন্তু যখন এই নীতির প্রয়োগ করা হবে তখন দেখা যাবে যে, তা পশ্চিমের সাথে মুসলিম বিশ্বের উত্তেজনামূলক সম্পর্ককেই নির্দেশ করে।

দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি একটি ‘প্রয়োগ মূলক গুনক’ যা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকের নির্দেশ করে যার অভাব বর্তমানের মুসলিম বিশ্বে প্রত্যক্ষ করা যায়। তবে এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক সমূহ বৃদ্ধি করার মাধ্যমেই পশ্চিমের সাথে মুসলিম বিশ্বের সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।

আর এসব গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে, স্থিতিশীল গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারী অধিকার, বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসী মানুষের স্বাধীনতা এবং গৃহযুদ্ধ আর আন্তর্জাতিক যুদ্ধ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

তৃতীয়ত, ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বাভাবিক সুবিচারের উপর নির্ভর করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশন সমূহের মাধ্যমে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সুবিচার অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যালঘু দেশসমূহে মুসলিমদের ধর্ম নিরপেক্ষ একনায়কের মুখোমুখি হতে হয় যাকে কোনো কোনো সময় পশ্চিমা সরকারসমূহ সমর্থন দিয়ে থাকে।

বাস্তবিকভাবে বৃহৎ অর্থে মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়া যায়। বিতর্কের মধ্যেও ইসলাম ধর্মে সন্তোষজনকভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতার অস্তিত্ব রয়েছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রসারের দিক থেকে বইটিতে পশ্চিমা গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

সূত্র: রেসন ডট কমে প্রকাশিত হওয়া ডেনিয়েল ফিলপটের লিখা ‘Religious Freedom in Islam: The Fate of a Universal Human Right in the Muslim World Today’ নামে বইয়ের বিশ্লেষণ ধর্মী প্রতিবেদন থেকে।