পাক-ভারত উত্তেজনা: মোদী কি ইমরান খানের আলোচনার প্রস্তাবে সাড়া দেবেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসলামাবাদ: পুলাওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত বিপজ্জনক চেহারা নিয়েছে।

মঙ্গলবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় বিমান হামলার জেরে গতকাল বুধবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয় বলে পাকিস্তান দাবি করেছে।

ভারতীয় বিমানবাহিনীর একজন পাইলট এখন পাকিস্তানীদের জিম্মায়, যা নিয়ে ভারতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সংঘর্ষ বাদ দিয়ে মীমাংসায় বসার জন্য ভারতের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানিয়েছেন।
ভারত সাড়া দিবে ইমরানের প্রস্তাবে?

ইমরান খানের আলোচনার জন্য যে প্রস্তাব তুলেছেন তাতে ভারতের সায় দেওয়ার সম্ভাবনা কতটা রয়েছে – জানতে চাইলে অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, ভারতের প্রত্যক্ষভাবে এখনই এই মুহূর্তে সায় দেয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও শেষপর্যন্ত এটা আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সমাপ্তি টানতে হবে।

কারণ দুপক্ষের কারো জন্যেই এই যুদ্ধ ইতিবাচক নয়। তার ওপর গোটা দক্ষিণ এশিয়া-জুড়ে ভারত ও পাকিস্তানের ভেতরেও যুদ্ধের বিরুদ্ধে যে মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে তাতে কোন পক্ষ খুব বেশি অগ্রসর হতে পারবে না, বলছেন রিয়াজ।

‘এর চেয়েও বড় বাস্তব বিষয় হলো ভারতের যে পাইলট পাকিস্তানে ইতোমধ্যে আটক আছে তাকে ছাড়াবার ব্যবস্থা করতে হলে আলোচনার পথ খুঁজতে হবে তাদের। সে আলাপ আলোচনা কিভাবে হবে – সেটা আমরা জানিনা।’

শুধু পাকিস্তানের প্রস্তাবের কারণে না, বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই আলাপ-আলোচনার পথ খুঁজে বের করে এর সমাধান করতে হবে বলে তিনি মনে করছেন।

ইমরানের সতর্কবাণী কতটা গ্রহণযোগ্য?
এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি তার বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে মি. খান সতর্ক করেছেন।

পরিস্থিতি যে কোনও সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে -পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই সাবধান বাণী কতটা গ্রহণযোগ্য?

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ মনে করেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যে হুঁশিয়ারির কথা বলেছেন সেটা এক অর্থে গুরুত্ব দয়েই বিবেচনা করতে হবে।

‘কারণ এই যুদ্ধাবস্থার যে প্রধান নির্ণায়ক সেটা রাজনৈতিক, দুপক্ষেই রাজনীতিটা প্রধান।’

আলী রিয়াজের মতে, ‘বিষয়টির একটি দিক হলো- ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি – সেখানে একধরনের রাজনীতিকরণ হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বে।’

‘সামনে নির্বাচন – সমস্ত পরিস্থিতি মিলে তাদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তা। সেটার কারণে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা নিয়ে ইমরান খানের আশঙ্কা ঠিক উড়িয়ে দেয়া যায় না,’ বলেন মি. রিয়াজ।

‘বিপরীত দিকে পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও একধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা আছে। ইমরান খান যেহেতু নতুন প্রধানমন্ত্রী, নতুন এই অর্থে যে পাকিস্তানে অতীতে যেসমস্ত দল ক্ষমতায় ছিল তাদের প্রতিনিধিত্ব তিনি করেন না।’

‘অভিযোগ বা ধারণা রয়েছে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে তার একধরনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সুতরাং তার পক্ষে আসলে সেনাবাহিনীর যে চাপ – এক ধরনের অবস্থান বজায় রাখার, সে কারণেও হয়তো ইমরান খান এ সমস্ত কথা বলছেন,’-বিশ্লেষণ অধ্যাপক রিয়াজের।

পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় হামলা: কতো দূর গড়াতে পারে উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আরটিএনএন
বালাকোট: বালাকোটে চালানো হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত আর পাকিস্তান যেন পুরোপুরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে সে জন্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তৎপর হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও চীনের পক্ষ থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে দুটো দেশের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু ভারত আর পাকিস্তান – পারমাণবিক শক্তিধর এই দুটি দেশের মধ্যকার এ উত্তেজনা কতো দূর গড়াতে পারে ? বালাকোটে হামলার জের ধরে দুটো দেশের সামরিক বাহিনী কি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে?

হামলার পর পরই ভারতীয় মুখপাত্র বলেছেন, এটা একটা নন-মিলিটারি আক্রমণ – অর্থাৎ এই হামলা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু এই কথাটির অর্থ কী? এর মধ্য দিয়ে ভারত কী বোঝাতে চাইছে?

কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ মাহমুদ আলী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে যে ভারত সরকার এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে যেতে আগ্রহী নয়।

‘ভারত শাসিত কাশ্মীরে ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর ওপর জইশ ই মোহাম্মদ নামের যে সন্ত্রাসী গ্রুপটি হামলা চালিয়েছে ভারত তার জবাব হিসেবে এই আক্রমণ চালিয়েছে। এটা ঠিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের হামলা নয় বলে ভারত বোঝাতে চাইছে।’

কিন্তু পাকিস্তানিরা কি এই হামলাকে সেভাবেই দেখবেন?

মি. আলী বলেন, ‘পাকিস্তানিরা একে জইশ ই মোহাম্মদের ওপর হামলা হিসেবে দেখবেন না। তারা এটিকে দেখবেন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাকিস্তানি সীমানা অতিক্রম করে পাকিস্তানের ভূকেন্দ্রে চালানো হামলা হিসেবে। কাজেই তারা এটিকে আগ্রাসন হিসেবে দেখবে এবং এর জবাব দেওয়ার কথা বলবে।’

কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুটো দেশের উত্তেজনা কতো দূর ছড়াতে পারে এই প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, অতীতের কিছু ঘটনা ব্যাখ্যা করে এ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

‘একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। আপনি একটা ঘটনা ঘটালেন এবং আমি তার পাল্টা জবাব দিলাম। আপনি আবার তার বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দিলেন। এভাবে ঘটনা ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দুটো দেশেরই পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। মূলত পাকিস্তানের পারমাণবিক সমরাস্ত্র ভারতের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার কাজে নিয়োজিত। ভারতের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয়, মূলত চীনের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রয়োজন হলে তারা এটা পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে প্রস্তুত থাকবেন।’

তিনি বলেন, দুটো দেশ কখনও একথা বলেনি যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। ফলে এই উত্তেজনা আরো বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তিনি জানান, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও বলেছিলেন উপমহাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতিকর এলাকা যেখানে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু এখনই তাদের কি এধরণের কোন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে?

নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মাহমুদ আলী বলেন, প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগ্রহ কোনো পক্ষেরই নেই।

‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দুজনই বারবার বলেছেন যে তাদের দেশের জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেষ্টাই হল তাদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু ঘটনাচক্রে জইশ ই মোহাম্মদের হামলা এবং তার আগে বালোচিস্তানে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর সমর্থনে পাকিস্তানের ওপর হামলা- পরস্পরের বিরুদ্ধে এই যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ চলে এসেছে এবং দুপক্ষের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে যে বৈরি ভাব ও যুদ্ধের ইতিহাস রয়েছে, সেকারণে কোন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, বিশেষ করে ভারতীয় নির্বাচনের আগে কোন পক্ষই নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করতে চাইবেন না।’

তিনি বলেন, ‘সেটা দেখানোর একমাত্র উপায় হলো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া। ভারত নিয়েছে। পাকিস্তানকে এখন একটা পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এভাবে ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার একটা আশঙ্কা থেকে যায়।’

তিনি মনে করেন বালাকোটের এই হামলার পর সেই আশঙ্কা কিছুটা ঘনীভূত হয়েছে।