চীনের দমনপীড়নে দিশেহারা মুসলিমরা, রেহাই পাচ্ছেন না কাজাখরাও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জিনজিয়াং: প্রায় সময় রাতের মধ্য ভাগে চীনা নাগরিক যাহারকেনবেক ওটান তার স্ত্রী শেইনার কেলেশেভার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। কাজাখস্তানের বাসিন্দা শেইনার কেলেশেভা জানান, তার স্বামী স্মৃতিভ্রম হয়েছে এবং মাঝে মধ্যে তিনি কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় শহর আলমাটির রাজপথে দৌড়ে বেরিয়ে যান।

যখন যাহারকেনবেক ওটানের পরিবার তাকে খুঁজে পায়, তখন তিনি তাদের কাউকে চিনতে পারেন নি এবং নিজ গৃহে ফেরত আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

যাহারকেনবেক ওটান নামের ৩১ বছর বয়সী এই রন্ধনশিল্পী কাজাখস্তানের পার্শ্ববর্তী দেশ চীনের জিয়ানজিয়াং প্রদেশে তথাকথিত রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে অন্তত দু’বছর আটক ছিলেন।

আর যখন ২০১৮ সালে যাহারকেনবেক ওটান মুক্তি পেয়ে তার স্ত্রীর সাথে সীমান্ত পার হচ্ছিলেন তখনই তার স্ত্রী বুঝতে পারেন যে, তার স্বামী আর পূর্বের মানুষটি নেই।

আর চীন নামক দেশটিতে যাহারকেনবেক ওটানের মত অনেকেই এরকম নির্যাতনের শিকার। বেইজিং দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেই এরকমটি ঘটে চলেছে।

কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি আরো বেশী বদলে গিয়েছে। এর পূর্বে চীন এবং কাজাখস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষজন দুদেশে যাতায়াত করতেন এবং এর ফলে তাদের অনেকেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

বর্তমানে হাজার হাজার কাজাখ চীনা কর্তৃপক্ষ দ্বারা আটকের শিকার হয়েছেন এবং এদের মধ্যে অনেকেই ওটানের মত করে কাজাখস্তানের অনেক নারীকে বিয়ে করে দেশটিতে বৈধ বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করছিলেন।

২০১৬ সালে ওটান তার দেশ চীনে গিয়েছিলেন কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে যাতে করে তিনি কাজাখস্তানের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে এবং তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করে এবং তাকে ২০১৭ সালে রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে প্রেরণ করে।

এসব দীক্ষা দান কেন্দ্রে আটক সবাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী এবং সেখানে তাদেরকে জোর পূর্বক ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। চীন এর পূর্বে নিজ দেশের মুসলিমদের এখানে আটক করে রাখত আর বর্তমানে এখানে অনেক কাজাখ নাগরিককেও আটক রাখা হয়েছে এবং তা কাজাখস্তানের স্বাধীনতার প্রতি মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ঠিক কতজন মুসলিম জিয়ানজিয়াং এর আটক কেন্দ্রে আটক রয়েছেন তা পুরোপুরি পরিষ্কার নয় কিন্তু কিছু বেসরকারি হিসেবে মতে সেখানে আট লাখ থেকে ২মিলিয়ন মুসলিম আটক রয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জিনজিয়াং বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিয়ান থুম বলেন, চীনের আটক কেন্দ্রে উইঘুর মুসলিমদের সাথে কাজাখ মুসলিমদের আটকাবস্থা দেখে তিনি অবাক হয়েছেন। কারণ ইতোপূর্বে চীন কাজাখ মুসলিমদের তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচনা করতো না এবং দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির নিকট কাজাখ মুসলিমদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল।

চীনের জিয়ানজিয়াং প্রদেশে অন্তত ১.৫ মিলিয়ন কাজাখ বাস করে যারা সেখানকার উইঘুর জনগোষ্ঠীর পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী। থুম বলেন, কাজাখদের উপর বর্তমানের দমন পীড়ন উইঘুরদের উপর দমন পীড়নের মতই এবং তা ‘ইসলাম-ভীতি দ্বারা’ প্রভাবিত।

জিনজিয়াং এ আটক ছিলেন এমন ৬০ জন বন্দীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সেখানকার ভয়ানক পরিস্থিতির কিছুটা আঁচ করা যায়।

একই সময়ে উগ্র জাতীয়তাবাদের ধারণা চীনাদেরকে আরো বেশি আগ্রাসী করে তুলেছে। এর ফলে দেশটির সংখ্যালঘুদের সংস্কৃতির উপর দমন পীড়ন চালানো হচ্ছে বিশেষত ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের উপর।

এসব রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে আটক মুসলিমদের জোর পূর্বক ম্যান্ডারিন ভাষা শেখানো হয়, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গীত শেখানো হয় এবং তাদেরকে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করা হয়।

চীনে ধর্ম বিশেষত ইসলাম ধর্মকে তাদের জাতীয় পরিচয়ের সাথে বৈরী বলে মনে করা হয় এবং দেশটির কর্মকর্তাগণ অনেক খোলাখুলিই ইসলাম ধর্মকে চীনের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে এক করার ঘোষণা দেন। একই সাথে তারা ইসলাম ধর্মকে সমাজতন্ত্রের সাথে এক করার পক্ষে মত দেন।

গুলজারিয়া অউয়েলখানকেইজ নামের চীনা নাগরিক যিনি তার স্বামীর সাথে কাজাখস্তানে বসবাস করেন তিনি রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে ১৫ মাস আটক ছিলেন। তিনি বলেন- ‘তারা বলেছিলো যে, আমি একজন বিশ্বাসঘাতক কারণ আমি কাজাখস্তানে বসবাস করি।’

গুলজারিয়া অউয়েলখানকেইজ এখনো দীক্ষা দান কেন্দ্রে আটক থাকার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি বলেন- ‘সেখানে আটক অনেকেরই আমার মত সন্তান রয়েছে। কিন্তু আমরা আটক থাকা অবস্থায় আমাদের সন্তানদের দেখতে পারতাম না এবং তাদের কে খেয়াল রাখবে এমন চিন্তা করে অস্থির থাকতাম।’

তিনি আরো বলেন- ‘জিনজিয়াং একটি এতিমদের শহরে পরিণত হয়েছে।’

চীনে বসবাসরত কাজাখ গণ এর পূর্বে চীন এবং কাজাখস্তানের মধ্যে আসা যাওয়া করত। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এবং ১৯৯১ সালে কাজাখস্তানের স্বাধীনতার পর অন্তত ১৮ মিলিয়ন চীনা নাগরিক দেশটির স্বাধীনতা লাভ করে।
কিন্তু চীনে তাদের আত্মীয়দের কাছে যাওয়ার জন্য সীমান্তে আসা যাওয়ার কারণে তাদের এখন বৈষম্যের চোখে দেখা হয়। Human Rights Watch এর মতে, জিনজিয়াং এর মুসলিম অধিবাসীদের সাথে বিদেশীদের সাথে যোগাযোগ রাখাকে এখন শাস্তি যোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।

গেনে বুনিন নামের রাশিয়ান-আমেরিকান লেখক এবং অনুবাদক যিনি ‘Xinjiang Victims Database’ নামের একটি সংগঠন পরিচালনা করেন তিনি বলেন, জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ ২৬টি বিদেশী রাষ্ট্রের একটি তালিকা করেছে আর এর মধ্যে কাজখাস্তান অন্যতম।

হাজার হাজার কাজাখ বংশোদ্ভূত চীনা নাগরিক এমনকি কাজাখস্তানের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি প্রাপ্ত অনেক চীনা নাগরিক তথাকথিত এসব রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্রে আটক রয়েছে এবং তাদের ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। অন্যদিকে গুলজারিয়া অউয়েলখানকেইজ এবং যাহারকেনবেক ওটানের মত কিছু সংখ্যক বন্দীর মুক্তি পাওয়া কিছুটা ব্যতিক্রমী ব্যাপার।

ওরাল জাহানবিল নামের একজন বলেন, তার পিতা তুরান মুখামেতকেন একজন চীনা নাগরিক যিনি কাজাখস্তানে বসবাস করেন এবং তিনি ২০১৭ সালে জিনজিয়াং এ তার পেনশনের অর্থ উত্তোলন করতে গেলে চীনা কর্তৃপক্ষের দ্বারা আটক হন।

জাহানবিল এখনো তার পিতার আটক হওয়ার কারণ জানেন না তবে আটক থাকার এক বছর পর মুখামেতকেন মুক্তি পান কিন্তু তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয় এবং তিনি এখনো চীন থেকে কাজাখস্তানে ফেরত আসতে পারেন নি।

আসকার আজাতবেক যিনি জিনজিয়াং প্রদেশের সাবেক একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি কাজাখস্তানের নাগরিক। তাকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজাখস্তানের চীনা সীমান্তবর্তী একটি মুক্ত বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে আটক করা হয়।

সেসময় আজাতবেক তার একজন বন্ধুর সাথে ছিলেন এবং চীন সীমান্ত থেকে দুটো গাড়ি এসে তাদের আটক করে নিয়ে যায়। যদিও আজাতবেকের বন্ধু মুক্তি পেয়েছেন কিন্তু তিনি এখনো বন্দি অবস্থায় রয়েছেন আর তার পরিবার এখনো তার কোনো খোজ খবর জানে না।

তবে এতকিছু স্বত্বেও কাজাখস্তানের সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। চীন কাজাখস্তানের অন্যতম বিনিয়োগকারী এবং একই সাথে ‘ওয়ান বেল্ট এন্ড রোডের’ অন্যতম কৌশলগত মিত্র।

যদিও কূটনীতিকরা চীনের জিনজিয়াং এ আটক কাজাখ নাগরিকদের পরিবার সমূহকে তাদের আটক স্বজনদের সাথে দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য উৎসাহ দেন কিন্তু কাজাখ কর্তৃপক্ষ চীনে আটক তাদের নাগরিকদের মুক্তির ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে একেবারে বল শূন্য বলে মনে হচ্ছে।

কাজাখস্তানের সরকার এ বিষয়টি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা চীনা কর্তৃপক্ষ জিনজিয়াং এর মুসলিম কমিউনিটির সদস্যদের মুসলিম পরিচয় মুছে দেয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছে সে পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না।

কিন্তু যেসব রাজনৈতিক দীক্ষা দান কেন্দ্র কাজাখস্তানের পাশের দরজায় স্থাপন করা হয়েছে এবং সেখানে কাজাখ নাগরিক, উইঘুর মুসলিমদের আটক করে রাখা হয়েছে তাতে করে সত্যিটা হচ্ছে যে, জিনজিয়াং হয়ত ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো সমস্যার তৈরী করবে যাকে এখন উপেক্ষা করা হচ্ছে।

সূত্র: ওয়াশিংটনপোস্ট ডট কম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।