সিরিয়ায় তুরস্ক-সমর্থক বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ’

নিউজ ডেস্ক: উত্তর পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তুরস্ক-সমর্থিত বাহিনী যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মোবাইল ফোনে তোলা কিছু ভিডিও প্রকাশ পাবার পর এ অভিযোগ উঠেছে – যাতে সৈন্যদের বর্বরতার ছবি ধরা পড়েছে।

জাতিসংঘ তুরস্ককে সতর্ক করে দিয়েছে – তার মিত্রদের কর্মকান্ডের জন্য তুরস্ককেই দায়ী করা হতে পারে। তুরস্ক অবশ্য অঙ্গীকার করেছে যে তারা ব্যাপারটি তদন্ত করবে।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দাড়িওয়ালা লোকেরা আল্লাহু আকবর বলে শ্লোগান দিচ্ছে। কুর্দি যোদ্ধাদের কিছু মৃতদেহ মাটিতে পড়ে রয়েছে, আর একজন লোক তার স্মার্টফোন দিয়ে ভিডিও করতে করতে বলছে, ‘আমরা হচ্ছি ফায়লাক-আল-মাজদ্ ব্যাটালিয়নের মুজাহিদ।’

একটু দূরে এক নারীর রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে আছে, এবং একদল লোক পা দিয়ে দেহটি মাড়াচ্ছে। একজন বলছে, ‘ও একটা বেশ্যা।’

বীভৎস এসব ভিডিও ফুটেজের সাথে ইসলামিক স্টেট নামের উগ্র গোষ্ঠীর ভিডিওর অনেক মিল আছে।

কিন্তু এই ভিডিওটির লোকেরা আইএস জঙ্গী নয়, বরং সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি নামে একটি বিদ্রোহী জোটের যোদ্ধা। এদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বেতন দেয় তুরস্ক – একটি নেটো জোটভুক্ত দেশ। এই বিদ্রোহী জোটটির কার্যক্রমও চলে তুরস্কের সেনাবাহিনীর কমান্ডের অধীনে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ভিডিওতে যে কর্মকান্ড দেখা যাচ্ছে তা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে।

গত ২১শে অক্টোবর উত্তর সিরিয়ায় এই ভিডিওটি তোলা হয়।

যে মহিলাটির মৃতদেহ পায়ে মাড়ানো হচ্ছে, তার নাম আমারা রেনাস। কুর্দি যোদ্ধা বাহিনী ওয়াইপিজে’র নারী বাহিনীর একজন সদস্য। সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট বাহিনীকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রেখেছে।

সম্প্রতি সিরিয়ায় কুর্দি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুর্কি বাহিনীর অভিযানের সময় আমারা রেনাস নিহত হন।

গত ৯ই অক্টোবর তুরস্কের সেনাবাহিনী এবং তুরস্ক সমর্থিত সিরিয়ান বিদ্রোহীদের অভিযান শুরুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু ভিডিও বেরুতে থাকে। বলা হয় এসব ভিডিও, তুরস্ক-সমর্থিত বিদ্রোহীদের তোলা।

এরকম একটি ভিডিওতে একজন অজ্ঞাতনামা যোদ্ধাকে আরবি ভাষায় চিৎকার করে বলতে শোনা যায়: “অবিশ্বাসী আর ধর্মদ্রোহী – আমরা তোদের মাথা কাটতে এসেছি।”

আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কালো পোশাক পরা এবং মুখোশধারী এক বিদ্রোহী একজন আতংকিত মহিলাকে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে ঘিরে আছে অন্য বিদ্রোহীরা। তাদের একজন ভিডিও করছে। আরেকজন চিৎকার করছে, ‘শূয়োর’! আরেকজন বলছে, “ওকে শিরশ্ছেদ করার জন্য নিয়ে যাও।”

ধরা পড়া এই মহিলাটির নাম সিসেক কোবানে – একজন ওয়াইপিজে যোদ্ধা।

এ ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায় এবং তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এটি প্রকাশিত হবার কয়েকদিন পর তুরস্কের রাষ্ট্রীয় টিভিতে দেখানো হয়, দুরস্কের একটি হাসপাতালে সিসেক কোবানের চিকিৎসা চলছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এসব ভিডিওতে যে কর্মকান্ড দেখা যাচ্ছে তা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেবার পরপরই কুর্দি-নেতৃত্বাধীন এসডিএফের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে তুরস্ক। সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জেমস জেফরি বলেছেন, অনেক লোক পালিয়ে গেছে কারণ তুরস্ক-সমর্থিত সিরিয়ান বিদ্রোহীদের ব্যাপারে তাদের ভয় আছে।
জিহাদিদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয় নি তুরস্ক

তুরস্কের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ আছে যে তারা সিরিয়ার জিহাদিদের বিরুদ্ধে খুব কমই ব্যবস্থা নিয়েছে।

সাবেক মার্কিন বিশেষ দূত ব্রেট ম্যাকগার্ক বলছেন, “পৃথিবীর মোট ১১০টি দেশ থেকে ৪০ হাজার বিদেশী যোদ্ধা ইসলামিক স্টেটের হয়ে যুদ্ধ করতে সিরিয়া এসেছিল। তারা সবাই এসেছে তুরস্কের ভেতর দিয়ে।”

তিনি বলেন, তিনি তুরস্ককে চাপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন যেন আইএসকে ঠেকাতে তারা তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।

“তুরস্ক বলেছিল তারা এটা করতে পারবে না। কিন্তু যেই কুর্দিরা সীমান্ত এলাকার একটা অংশ দখল করলো, তারা এমনভাবে সীমান্ত বন্ধ করে দিল যেন এটা একটা দেয়াল।”

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ সম্পর্কে তুরস্কের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিন বলেছেন, তুরস্ক এরকম যে কোন অভিযোগ তদন্ত করবে।

তবে অনেক কুর্দি অধিকার কর্মীরই তুরস্কের তদন্তের প্রতিশ্রুতির ওপর কোন আস্থা নেই।

গত এক দশকে বিভিন্ন সময় এমন অনেক বিচলিত হবার মতো ছবি ও ভিডিও বের হয়েছে – যা দৃশ্যত তুর্কী সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনীর তোলা এবং এতে বন্দী কুর্দি ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যার দৃশ্য দেখা গেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।