মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান

জো ম্যাকারন: গত বছরটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ এবং ২০১৮ সালও এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাসের উদ্দেশ্যে যুদ্ধসমূহের সূচনা হলেও দ্বন্দ্ব সমাধানের চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।

পরবর্তী বছরটি সংজ্ঞায়িত করা হবে-যুদ্ধোত্তর রূপান্তরের জন্য শান্তি আলোচনা, ব্যালট বাক্স এবং পুনর্নির্মাণকে। কিন্তু এই ধারায় কেবল দুটি এলাকা ব্যতিক্রম। তার একটি হচ্ছে ইয়েমেন। একমাত্র দেশ হিসেবে পশ্চিম সিরীয় অঞ্চলের ইদলিব থেকে ডেরা পর্যন্ত শান্তি ও আঞ্চলিক বিরোধের রোডম্যাপ ছাড়াই নতুন বছর শুরু করবে ইয়েমেন এবং তা অব্যাহতভাবে চলবে।

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘর্ষের ফলে প্রধান রাজনৈতিক বিষয়গুলোর তীব্রতা হ্রাস করা কঠিন হবে। তবে, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে ২০১৮ সালে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

১। সিরিয়ার শরণার্থীরা কী নিজ দেশে ফিরে যাবে?
ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ৫.৪ মিলিয়ন সিরিয়ান শরণার্থী নিবন্ধিত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রতিবেশি দেশ তুরস্কে অবস্থান করছে ৩.৪ মিলিয়ন, লেবাননে ১.৫ মিলিয়ন এবং জর্ডান ৬৫০,০০০ জন।

২০১৭ সালে সিরিয়ায় শরণার্থীদের একটি ছোট অংশ নিজ দেশে ফিরতে শুরু করে এবং ২০১০৮ সালের মধ্যে এই প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হতে পারে কারণ এই দেশগুলো ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। সিরিয়ার সঙ্গে জর্ডান এবং তুরস্কের সীমান্তে বাফার জোন রয়েছে এবং এই সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার ক্ষেত্রে খুব বেশি সমস্যা দেখা দেবে না।

তবে, লেবাননের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করে সিরিয়ার সরকার এবং চ্যালেঞ্জ হল দামেস্ক নিয়ে লেবাননের পার্থক্যকে দূর করা। সিরিয়ার শরণার্থীদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন স্থগিত সিরিয়া শান্তি আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে পারে এবং সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রচেষ্টা ও স্থানীয় শাসনের উপর এর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।

২. জেরুজালেম এবং আঞ্চলিক জোটের পুনর্বিন্যাস
প্যালেস্টাইন আবারো আরব রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, কারণ জনগণের চাপ সরকারগুলোকে নিষ্পত্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য করছে এবং জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি উত্তেজনার মূল বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ফলস্বরূপ, ২০০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির পুনর্নির্মাণে জেরুজালেম অব্যাহতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আঙ্কারা ওয়াশিংটন থেকে আরো দূরে চলে যাচ্ছে, আম্মান রিয়াদ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে এবং তেহরান মিত্রদের সমাবেশের সুযোগ গ্রহণ করছে।

দিগন্ত রেখায় শান্তি প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা না যাওয়ায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আরো দুর্বল হয়ে পড়বেন এবং হামাসের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাকে তার অলঙ্কারশাস্ত্রীয় ভাষাকে উজ্জীবিত করতে হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ও ইসরাইলকে লেলিয়ে দেয়ার মার্কিন কৌশলটিও তেমন একটি সুবিধা করতে পারবে না, কারণ পশ্চিম তীরে সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে ফিলিস্তিনি সমস্যা নিয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য রিয়াদের ওপর দেশটির জনগণনের চাপ থাকবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জেরুজালেম তার পুরোনো মিত্রদের পরীক্ষা করবে এবং নতুনদের আকৃষ্ট করবে কারণ সিরিয়ার যুদ্ধ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

৩. রিয়াদে ঝাঁকুনি: স্থানীয় রাজনীতি বিদেশি নীতিকে তাড়িত করবে
২০১৭ সালে মোহাম্মদ বিন সালমানের বির্তকিত সব কর্মকাণ্ড সম্ভবত ২০১৮ সালে অব্যাহত থাকবে। ২০১৫ সালে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিন সালমান এক আশ্চর্যজনক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেছেন।

সৌদির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেশটির বৈদেশিক নীতিমালাকে নির্দেশ করছে এবং দেশটিতে বিরাজমান অশান্তিকে ভিন্নমুখী করা হচ্ছে। গত জুন মাসে সাবেক প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে যখন পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়, তখন সৌদি আরব কাতারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।

নভেম্বরে যখন সৌদি কয়েকজন যুবরাজ ও ব্যবসায়ীদের আটক করা হয়, তখন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে রিয়াদ সফরের সময় পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

ক্ষমতায় আরোহণের ক্ষেত্রে বিন সালমান আরো নিরাপদ হলে সৌদির বিদেশি নীতি একটি গতানুগতিক পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে। যাইহোক, অনিশ্চয়তা বিদেশে রিয়াদের বাগাড়ম্বরতাকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিতে পারে। ২০১৮ সালে বিন সালমানের সৌদি রোডম্যাপ অতিক্রম করতে পারে।

৪. ইরাক ও লিবিয়ার ব্যালট বাক্সে ফিরে যাওয়া
২০১৮ সাল সমগ্র অঞ্চল জুড়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ব্যালট বাক্সে ফিরে আসার সাক্ষী হবে। আগামী মার্চে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং মে মাসে লেবাননের সংসদীয় নির্বাচন নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই কিংবা এতে বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচন (২০১৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নির্ধারিত) এবং মে মাসে ইরাকের সংসদীয় নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে দুটি রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেছেন। একটি হচ্ছে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভান্ট (আইএসআইএল ) কে পরাজিত করা এবং অন্যটি হচ্ছে কুর্দি স্বাধীনতা গণভোটের অবসান ঘটানো। এই সাফল্য মিত্রদের সঙ্গে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অটুট রাখতে পারে।

ইরানপন্থী কোয়ালিশন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকিকে অনুমোদন দেওয়ায় নির্বাচনকে সামনে রেখে হায়দার আল-আবাদি দেশটিতে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইরানকে আটকাতে আবাদির ক্ষমতায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ সুযোগ। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের সময় তেহরান তার রাজনৈতিক পেশিসমূহকে প্রসারিত করবে কিনা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আবাদির বিজয়কে কঠিন করে তুলবে কিনা।

২০১৮ সালে লিবিয়ার নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে, কেননা এখনো পর্যন্ত নির্বাচনের বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে, রাষ্ট্রপতির দৌড়ে আমরা একটি আকর্ষণীয় মুখ দেখতে পারি। আর তিনি হচ্ছেন লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পুত্র সাইফ আল-ইসলাম। নির্বাচনে অন্য প্রার্থী হচ্ছেন লিবিয়ার সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনকারী জেনারেল খলিফা হাফতর।

জাতিসংঘ সমর্থিত ন্যাশনাল অ্যাকর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান হাফতর নির্বাচনে জয়ী হতে পারেন এবং প্রধানমন্ত্রী ফয়েজ আল-সাররাজই সম্ভবত তার পদ ধরে রাখছেন। তবে, দেশটি দেশব্যাপী নির্বাচনের জন্য নিরাপদ এবং সংগঠিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা তা দেখতে হবে।

আলজাজিরা অবলম্বনে