বসিনায়ার কসাইয়ের যাবজ্জীবন, সেখানে কী ঘটেছিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হেগ: বিশ্বের বহুল আলোচিত দুই দশক আগে বলকান সংঘর্ষের সময় মুসলিম গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাবেক বসনিয়ান-সার্বিয়ান কমান্ডার রাটকো ম্লাদিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার সাবেক যুগোস্লাভিয়া (আইসিটিইবি) -এর জন্য গঠিত হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রিজাইডিং বিচারক এই রায় দেন।

৭৪ বছর বয়সী এই কসাই জেনারেল স্রেব্রেনিচায় সংঘটিত গণহত্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্রেব্রেনিচায় সংঘটিত গণহত্যায় প্রায় ৮ হাজার মুসলিম পুরুষ ও তরুণকে হত্যা করা হয়েছিল; যেটি পূর্ববর্তী রায়ে বলা হয়েছিল।

বিচারক অলফোনস অরিয়ে তার রায়ে বলেন, স্রেব্রেনিচায় বসবাসরত মুসলমানদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অপরাধীরা এই অপরাধ সংঘটিত করেছিল।

বিচারক তার রায়ে আরো বলেন যে সারজেভোতে ভয়াবহ গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার বিষয়টি রাটকো ম্লাদিক ব্যক্তিগতভাবে তদারক করতেন।

‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে খ্যাত রাটকো ম্লাদিকের বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ আনা হয়েছিল। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ার এই যুদ্ধে রাটকোর নেতৃত্বে তার বাহিনী এসব অপরাধ সংঘটিত করেন।

তবে, আদালত তার রায়ে বলেছে যে আগের রায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে অন্য ছয় শহরে গণহত্যা অভিযানের বিষয়টি ‘বিশ্বাসযোগ্য নয়’।

রায় ঘোষণার সময় সাবেক এই জেনারেলকে শুরুতে উদ্বেগহীন দেখা গেলেও পরে তিনি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করতে শুরু করেন। পরে তাকে আদালত থেকে সরিয়ে নেয়া হয়ে।

তার আইনজীবী জানান, উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য রাটকোকে সাময়িক মুক্তি দেয়া প্রয়োজন।

সাবেক যুগোস্লাভিয়াজুড়ে হাজার হাজার মানুষের কাছে বুধবার রায়টি ছিল বহুল প্রত্যাশিত। এই রায় ঘোষণা উপলক্ষ্যে হেগে আদালতের বাইরে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তাদের অনেকে গণহত্যায় নিহত প্রিয়জনদের ছবি প্রদর্শন করে ন্যায় বিচার দাবি করেন। এই ঘটনায় এখনো ৭ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

গণহত্যার দায়ে কারাদিচের ৪০ বছর কারাদণ্ড
এর আগে গত বছরের ২৪ মার্চ বসনিয়ার অপর কসাই খ্যাত সার্বীয় নেতা রদোভান কারাদিচের ৪০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আনা বসনিয়া যুদ্ধে (১৯৯২-৯৫) গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বসনীয়-সার্বীয় নেতা কারাদিচ ১৯৯৫ সালে স্রেবেরেনিকা শহরে চালানো গণহত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তা ছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধও আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অধীন জাতিসংঘ ওয়ার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে বৃহস্পতিবার দেশটির স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় রায় ঘোষণা করেন বিচারকরা। কারাদিচের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে কারাদিচের বিচার চলে।

৭০ বছর বয়সি কারাদিচের বিরুদ্ধে ১ লাখ লোক হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

রায় পড়ার সময় আদালতে ১৫০ ভুক্তভোগী উপস্থিত ছিলেন। এই ১৫০ জনের মধ্যে বসিনয়া যুদ্ধের সময় কারাদিচের নির্দেশে যাদের হত্যা করা হয় তাদের স্বজন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েও বেঁচে থাকা যুদ্ধাহতরা অন্যতম। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও বেশ কয়েকজন কূটনীতিক আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আধুনিক ইউরোপের কলঙ্ক স্রেব্রেনিচা গণহত্যা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণহত্যার প্রসঙ্গ উঠলে এক বাক্যে সবার মুখে চলে আসবে স্রেব্রেনিচা গণহত্যার কথা। আধুনিক ইউরোপের কলঙ্ক বলে পরিচিত এই গণহত্যা। চলতি বছর চলছে এ গণহত্যার ২২তম বার্ষিকী।

বসনিয়া যুদ্ধ চলাকালে ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশটির স্রেব্রেনিচা শহরে যে হত্যাকান্ড পরিচালিত হয়, তা-ই ইতিহাসে স্রেব্রেনিচা হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। সেবছর এই তিন দিনে ৮ হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যা করা হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ ও কিশোর।

১৯৯৫ সালের পর একে একে পার হয়ে গেছে ২০টি বছর। এখনও এ হত্যাকান্ডে নিহত হতভাগ্যদের দেহাবশেষের সন্ধান মেলে ওই এলাকায়। এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৭৬টি স্থানে অন্তত দেড়শ গণকবরের সন্ধান মিলেছে।
স্রেব্রেনিচা হত্যাকান্ডের ২০তম বাষির্কীতে এ গণহত্যায় নিহত হতভাগ্যদের স্মরণের উদ্যোগ নিয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সরকার।

১৯৯৫ সালের জুলাইতে স্রেব্রেনিচার অধিবাসীদের অনেকে বাঁচার তাগিদে ও আশ্রয়ের আশায় একশ কিলোমিটারেরও বেশি পথ হেঁটে বসনিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুজলিনে পাড়ি জমায়। এই পদযাত্রা ইতিহাসে ‘মৃত্যুর দিকে পদযাত্রা’ বলে পরিচিত। স্রেব্রেনিচাবাসীদের এ পদযাত্রাকে স্মরণ করতে ‘শান্তির জন্য পদযাত্রা’র আয়োজন করেছে একদল শান্তিকামী মানুষ।

‘ডাচদের মদদেই বসনিয়ার ৮০০০ মুসলিমকে হত্যা
চলতি বছরের ১৫ মার্চ তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান বসনিয়ার আলোচিত স্রেব্রেনিচা গণহত্যার মতো কুকর্মের জন্য নেদারল্যান্ডসকে অভিযুক্ত করেবলেছেন,‘স্রেব্রেনিচা হত্যাজ্ঞ থেকেই আমরা নেদারল্যান্ডস এবং ডাচদের ভাল করেই জানি।’

১৯৯৫ সালের সেই হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় সেখানে ডাচদের মদদেই ৮ হাজারেরও বেশি বসনিয়ান মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা বিশ্বের সবাই কমবেশি জানে।

এরদোগান বলেন, ‘আমরা জানি তারা কতটা মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ ও নীচু মানসিকতার হিসেবে ৮ হাজারেরও বেশি বসনিয়ান মুসলিমকে হত্যাযজ্ঞে মদদ দিয়েছিল।’

মঙ্গলবার বিকেলে আঙ্কারায় আগামী ১৬ এপ্রিল তুরস্কের সাংবিধানিক রেফারেন্ডামের পক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

আঙ্কারায় ওই অনুষ্ঠানে এরদোগান আরো বলেন, ‘সভ্যতা সম্পর্কে কেউ কেউ আমাদের পাঠ দিতে চেষ্টা করছেন, এটা তাদের উচিত নয়। কেননা, তাদের পেছনের ইতিহাস খুবই অন্ধকার কিন্তু আমাদের ইতিহাস খুবই উজ্জ্বল।’

প্রসঙ্গত, এই গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল পূর্ব বসনীয় শহরে, এটা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা সবচেয়ে নিষ্ঠুর গণহত্যা। আর এটা ঘটেছিল মূলত: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের একটি ডাচ ব্যাটেলিয়ন বসনীয় সার্ব বাহিনী থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।