হিটলার-ইমম্যাচিউর বলে পাল্টাপাল্টি গালি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ঢাকা: সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে ‘ইমম্যাচিউর বা অপরিণত’ বলে উল্লেখ করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনিকে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন হিটলার বলার পরই ইরানের তরফ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে তিক্ততা ও উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে। সৌদির ক্রাউন প্রিন্সের এমন মন্তব্য ঘিরে নতুন করে দুই দেশের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হলো।

নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সম্পর্কে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, ইউরোপে যা ঘটে গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নাৎসী নেতা হিটলারের সঙ্গে আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইরানকে প্রশমিত করা যাবে না। রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কতো গভীরে গেছে যুবরাজ সালমানের এই বক্তব্য থেকে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দুই দেশের পক্ষ থেকেই একে অপরের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে সৌদি যুবরাজ তার দেশে বর্তমানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, সে বিষয়েও কথা বলেন। তার বিরোধীদের ওপর এই অভিযান চালিয়ে তিনি তার ক্ষমতাকে আরো কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছেন এমন অভিযোগকে তিনি হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

সৌদি যুবরাজ বলেন, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের সৌদি রাষ্ট্রের কাছে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার ফিরিয়ে দিতে হবে। যুবরাজ বিন সালমান দেশটিতে ধর্মীয় আচার ও রীতি নীতি সংস্কারের ব্যাপারে তার কিছু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, আরো উদার ইসলামকে তিনি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তার ভাষায় নবী মোহাম্মদ যে ইসলামের কথা বলে গেছেন সেই ইসলাম তিনি ফিরিয়ে আনতে চান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি ক্রাউন প্রিন্সের আচরণকে শিশুসুলভ, হঠকারী, ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, আমি গুরুতরভাবে তাকে পরামর্শ দিচ্ছি যে, গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলের জনপ্রিয় শাসকদের পরিণতি কি হয়েছে তা ভেবে দেখতে। তিনিও নিজেকে ওইসব শাসকদের নীতি এবং আচরণকে গ্রহণ করছেন।

নতুন যুদ্ধের ইঙ্গিত!
ইরানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসরাইল এবং সৌদি আরব পুরোপুরি ঐকমত্যে অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরাইলের সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল গাদি ইসেঙ্কট। বৃহস্পতিবার সৌদি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া অভূতপূর্ব এই সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ইসরাইল ও সৌদি আরব কখনোই একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে না।

প্রথমবারের মতো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোনো সিনিয়র কর্মকর্তা সৌদি কোনো মিডিয়াকে এই ধরনের সাক্ষাৎকার দিলেন। যদিও ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।

সৌদি অনলাইন সংবাদপত্র ‘ইলাপ’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইসেঙ্কট ইরানকে ‘এই অঞ্চলের জন্য প্রকৃত ও বড় হুমকি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ইরানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসরাইল এবং সৌদি আরব পুরোপুরি ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

ইসরাইলের এই সেনাপ্রধান ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, অস্ত্র কারখানা নির্মাণ এবং মধ্যপ্রাচ্যেজুড়ে গেরিলা ও সন্ত্রাসী সংগঠনকে উন্নত অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে ইরান এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ‘লেবানন থেকে ইরান পর্যন্ত একটি শিয়া ক্রিসেন্ট তৈরির মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে চাচ্ছে এবং তারপর পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হতে চাইবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটি যাতে না ঘটে তার জন্য আমাদের অবশ্যই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’

ইসেঙ্কট বলেন, ‘লেবাননে হিজবুল্লাহর উপর হামলার পরিকল্পনা ইসরাইলের নেই। আমরা ইরানী প্রচেষ্টাকে উত্তেজনা বৃদ্ধির চেষ্টা হিসেবে দেখছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি তাদের জন্য খুব বেশি সুযোগ দেখতে পাচ্ছি না।’

তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘হঠাৎ করেই স্থানীয় বিস্ফোরণ ঘটলে তা ব্যাপক কৌশলগত সংঘাতের দিকে পরিচালিত করতে পারে।’

ওই সাক্ষাত্কারে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় ওঠে আসে। এরমধ্য রয়েছে দুই সপ্তাহ আগে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির দুঃখজনক পদত্যাগ এবং সৌদি আরবে রাজপুত্র, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার; সৌদি আরব কর্তৃক সরাসরি জনসাধারণকে হুমকি এবং ইরান ও হিজবুল্লাহকে নিয়ে ইসরাইলের লক্ষ্য ইত্যাদি বিষয় স্থান পায়।

এছাড়াও, মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে আমেরিকা এবং রাশিয়ান সরকারের মনোভাব নিয়েও ইসেঙ্কট মন্তব্য করেন।

ইরান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে তিনি স্বাগত জানান। ট্রাম্প তার ওই ঘোষণায় বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সমাপ্তিটানা এবং সিরিয়া ও ইরাকের ওপর ইরানের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবেলা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে এই অঞ্চলের জন্য একটি আশা হিসাবে দেখছি।’

ইসরাইলের শীর্ষ এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে এই অঞ্চলের জন্য একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠনের সুযোগ রয়েছে। ইরানের হুমকি রুখতে আমাদের একটি বড় এবং কৌশলগত পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

ইরানকে মোকাবেলা করার জন্য গোয়েন্দা তথ্যসহ মধ্যপন্থী আরব দেশগুলোর সঙ্গে আমরা তথ্য বিনিময় করতে ইচ্ছুক।’

সৌদি আরবের সঙ্গে ইতোমধ্যে এই ধরনের তথ্য বিনিময় হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে ইসেঙ্কট বলেন, ‘প্রয়োজন হলে তাদের (সৌদি) সঙ্গে আমরা তথ্য শেয়ার করতে ইচ্ছুক। আমাদের এই দুই দেশের মধ্যে অনেক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ইরান সম্পর্কে ইসরাইল এবং সৌদি আরবের মনোভাব একই রকম। আমি ওয়াশিংটনে চিফ অব স্টাফদের বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং সেখানে সৌদি রাষ্ট্রদূত যা বলেছিলেন তা আমি শুনেছি। ইরান বিষয়ে আমরা যা মনে করি তার ওই বক্তব্য ছিল তারই প্রতিধ্বনি। আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে তাদের (সৌদি) সঙ্গে চুক্তি করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি হচ্ছে হিজবুল্লাহসহ ইরান ও তার মিলিশিয়া বাহিনীকে সিরিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমরা খোলাখুলিভাবে, শান্তভাবে এবং গোপনে সবভাবেই বলেছি যে, আমরা সিরিয়ায় ইরানের একত্রীকরণকে কখনোই গ্রহণ করবো না এবং ইরানের মনোযোগ দামেস্কেসের পশ্চিমাঞ্চলের ‘সউদা রাড’; যেটি আমাদের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত।

আমরা ইরানের কোনো ধরনের উপস্থিতিকে অনুমোদন করবো না। কারখানা বা সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের বিরুদ্ধে আমরা তাদের সতর্ক করে দিয়েছি এবং আমরা তা অনুমোদন করবো না।’

লেবাননের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে ‘জটিল’ হিসাবে বর্ণনা করেন তিনি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রিয়াদ থেকে হারিরির পদত্যাগের পদক্ষেপটি ছিল বিস্ময়কর। তবে আমি দেখতে পাচ্ছি যে হিজবুল্লাহ এখন আর্থিক চাপ অনুভব করতে শুরু করেছে। তারা এখন গুরুতর সমস্যার মধ্যে পতিত হয়েছে। এছাড়াও, আমরা হিজবুল্লাহর সমর্থনে ভাটা পড়ার বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি এবং হিজবুল্লাহকে সমর্থনকারী জনগণ ও দাহিয়ায় (বৈরুতের একটি শিয়া আশ্রয়কেন্দ্র) বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী জনগণের মধ্যেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এটা এমন কিছু যা আমরা অতীতে দেখিনি।’

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আমেরিকা ও রাশিয়ার নীতিমালাকে ইসরাইল কিভাবে দেখে সে বিষয়েও তিনি মত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, ‘আমেরিকান সৈন্যদের এই অঞ্চলে নিয়ে আসা কিংবা কোনো স্থল যুদ্ধ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের সুন্নি অক্ষকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে এবং তাদের সমর্থণ দিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রাশিয়ারও একটি নীতি রয়েছে। আর তা হলো কেবল সিরিয়ার মধ্যে রাশিয়ান স্বার্থ দেখা।’

তিনি আরো বলেন, ‘সব পক্ষের সঙ্গে মিল রেখে কিভাবে চলতে হয় রাশিয়ানরা তা ভাল করেই জানে। তারা এক দিকে আসাদ, ইরান এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে জোট তৈরি করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।’

তিনি বলেন, ‘আইএসকে গুরুতরভাবে পেটানো হয়েছে এবং সংগঠনটি খুব শিগগিরই নির্মূল হয়ে যাবে। তবে সিরিয়া ও এই অঞ্চলের অন্যান্য অংশে তাদের আদর্শ ও ধারণা ভিন্ন কোনো নামে আবারো ফিরে আসতে পারে।’

তিনি সিরিয়ার যুদ্ধে ইসরাইলের না জড়ানোর দীর্ঘমেয়াদী নীতিও ব্যাখ্যা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি পরিষ্কার নীতি রয়েছে। যতক্ষণ না আমাদের ‘ডুরজ’ ভাইদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সিরিয়ার যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করব না। আমরা ‘খাদেরে’ হস্তক্ষেপ করেছি। আমরা হারমন পর্বতে আমাদের ট্যাংক প্রস্তুত রেখেছি এবং আল-নুসরা ফ্রন্টকে সতর্ক করে দিয়েছি যে, তারা যদি খাদেরে প্রবেশ করে, তবে আমরা তাদের আক্রমণ করব। এই হুমকি কাজে দিয়েছে।’

ইসরাইল আল-নুসরাকে সহায়তা দিচ্ছে কিনা- জিজ্ঞাসা করা হলে ইসেঙ্কট এই দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, ‘আইএসের মতোই আল-নুসরা এবং তার সমর্থকরা আমাদের শত্রু। আমরা তাদের উপর একাধিকবার আক্রমন করেছি। আমরা গোলানের গ্রামবাসীকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছি এবং আমরা আমাদের ডুরজ ভাইদের সাহায্য করেছি। আমরা শুধুমাত্র মানবিক উপায়ে সাহায্য করি।’

বিবিসি ও হারেৎজ অবলম্বনে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।