সিনাইয়ে রক্তপাত, নতুন চ্যালেঞ্জে সিসি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিনাই: শুক্রবার মিশরের সিনাই উপত্যকায় আল-আরিশ নগরীর কাছে আল রাওদা মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের উপর সন্দেহভাজন জঙ্গিদের চালানো হামলায় এ পর্যন্ত ৩০৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭টি শিশু রয়েছে।হামলায় আরো ১২৮ জন আহত হয়েছেন।

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম এমইএনএ’র বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স শনিবার এ খবর দিয়েছে।

হামলাকারীদের হাতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) একটি পতাকা ছিল বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

হামলার পর মিশরে তিনদিনের শোক পালন করা হচ্ছে।

আধুনিক মিশরের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ওই হামলার পর ‘সর্বশক্তি দিয়ে’ জবাব দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি।

মিশরের পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে হামলাকারীদের সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক থাকার অনুমান করা হয়েছে।যদিও এ পর্যন্ত এ হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২৫ থেকে ৩০ জন হামলা চালিয়েছে, তাদের হাতে দায়েশের (আইএস) পতাকা ছিল। তারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে মসজিদের প্রধান দ্বার এবং ১২টি জানালায় অবস্থান নেয়।’

আহতদের বরাত দিয়ে তারা আরো জানায়, বন্দুকধারীদের কেউ কেউ মুখোশ পরে এবং কারো কারো গায়ে সামরিক পোশাকও ছিল। তারা মসজিদের দরজা ও জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়ে।

রয়টার্স জানায়, মিশরের সেনাবাহিনী শুক্রবার রাতভর আইএসের কয়েকটি আস্তানায় বিমান হামলা চালিয়েছে।

সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, জঙ্গিগোষ্ঠীটির মজুদ করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ধ্বংস করা হয়েছে। মসজিদে হামলায় ব্যবহৃত কয়েকটি গাড়ি চিহ্নিত করে সেগুলোর ওপরও বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি মুখপাত্রের।

মসজিদে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট সিসি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কায়রোর লড়াই থামিয়ে দিতেই জঙ্গিরা মসজিদে বোমা হামলা ও গুলি চালিয়েছে।

‘সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ শহীদের রক্তের বদলা নেবে। সর্বশক্তি দিয়ে আমরা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করবো,’ বলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে, রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদভ, আরব লিগ প্রধান আহমেদ আবদুল গেইতের পাশাপাশি ইরান, ফ্রান্স, ইসরায়েল ও সৌদি আরব এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন।

২০১৩ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই মিশরে জঙ্গি হামলার মাত্রা বেড়ে গেছে। একের পর এক জঙ্গি হামলায় শত শত পুলিশ, সেনা সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হচ্ছেন।

এসব ঘটনার অনেকগুলোর জন্যই আইএস-সংশ্লিষ্ট সিনাই প্রভিন্স জঙ্গি গোষ্ঠীকে দায়ী করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি হামলার লক্ষ্য ছিল মিশরের কপটিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় স্থাপনা।

স্থানীয়রা বলছেন, আল রাওদা মসজিদে সুফিবাদীরা নিয়মিত নামাজ পড়তে আসেন। আর আইএসসহ বিভিন্ন জিহাদি গ্রুপ সুফিবাদের বিরুদ্ধে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে মিশরের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, দুর্গম পথে চলতে সক্ষম- এমন চারটি বাহনে চড়ে হামলাকারীরা ওই মসজিদে আসে। জুমার নামাজ যখন শেষ হচ্ছে, তখন সেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

বিস্ফোরণের পর আতঙ্কিত মানুষ যখন পালানোর চেষ্টা করছিল, তখন তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় হামলাকারীরা।

ওই মসজিদের প্রবেশ পথ আটকে দেওয়ার জন্য বাইরে থাকা যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। প্রায় ৪০ জন অস্ত্রধারী এই হামলায় অংশ নেয় বলে তথ্য দিয়েছে রয়টার্স।

হতাহতদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর লোকজনও আছে।

মিশরের সেনাবাহিনী প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের লড়াইয়ে হারিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে বিবৃতি দিচ্ছে। কিন্তু যে মাত্রায় সেখানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটছে, তাতে সেনা অভিযানের সাফল্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

আধুনিক মিশর ও সিনাই উপদ্বীপের ইতিহাসে এই হামলাকে সবচেয়ে বর্বরতম হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

আফ্রিকা ও এশিয়ার মাঝে ত্রিকোনাকার সিনাই উপদ্বীপ সন্ত্রাসবাদের আখড়া হয়ে উঠছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। উপদ্বীপের উত্তরাংশে ইসলামিক স্টেটের(আইএস) শক্ত অবস্থান আছে বলে মনে করা হয়। সিনাইতে আইএস নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠিগুলোকেও উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে।

শুক্রবারের বর্বরতম হামলার দায়িত্ব এখনো কেউ স্বীকার করেনি। তবে এ হামলায় ইসলামিক স্টেটের ছাপ স্পষ্ট।

২০১১ সালে আরব বসন্তের উত্তাপে হুসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিনাইতে হঠাৎ করেই সন্ত্রাসবাদ বেশ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ২০১৩ সালে মোবারকের পর মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এ সন্ত্রাসবাদ আরেকদফা বৃদ্ধি পায়। সে সময় পুরো সিনাই উপদ্বীপে মারাত্মক নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরী হয়।

২০১৩ সালে মিসরের তৎকালীন সেনাপ্রধান আবদুল ফাত্তাহ আল সিসি সিনাইতে বড় ধরণের এক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালান। ইসলামিক স্টেট ও স্থানীয় অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠিগুলোর বিরুদ্ধে এ অভিযানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করে মিশরের সেনাবাহিনী।
এ অভিযান স্থানীয় মানুষদের ক্ষেপিয়ে তোলে। স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠি ‘দ্য উইলায়াত সিনাই‘আইএসের সাথে নিজেদের ঐক্য ঘোষণা করে। এ জঙ্গিগোষ্ঠিটি বহু হামলার পেছনের মূল কারিগর। তাদের হামলায় এ পর্যন্ত কয়েকশ’ মানুষ মারা গেছে।

সিসি পরে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে ২০১৪ সালে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানে মুরসিকে হটিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসেন। মুরসির রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে মিশরে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর সিনাইতে আরেক দফা সন্ত্রাসবাদের উত্থান হয়।

২০১৫ সালের অক্টোবরে একটি রুশ বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার দায় স্বীকার করে উইলায়াত সিনাই। ওই ঘটনায় বিমানটিতে থাকা ২২৪ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছিলেন।

এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠিটি সাধারণত কপটিক খ্রিস্টান, চার্চ ও নিরাপত্তাবাহিনীর উপর ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে আসছিল।

সিনাইয়ের স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠিগুলো স্থানীয় বেদুঈন উপজাতিগুলোকেও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। এ উপজাতিরা বহু বছর ধরে সরকারের নজরের বাইরে আছে। মিশর ধাপে ধাপে উন্নতি করলেও এসব উপজাতিদের জীবনমানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। অনেক বেদুঈন সম্প্রদায়ই বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করতে পারে না।

বেদুঈন সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করছে। কিন্তু এসব সম্প্রদায়ের কিছু কিছু মানুষ আবার জঙ্গিগোষ্ঠিগুলোতে যোগও দিচ্ছে। বেদুঈন সম্প্রদায়গুলো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। তাই তারা অবৈধ কর্মকাণ্ড, মাদক চোরাচালান ও নানা ধরণের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

সিনাইয়ের উত্তরাংশে নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রায় নেই। উইলায়াত সিনাই ওই অংশের নিয়ন্ত্রণে আছে। সিনাইয়ের উত্তরাংশে মরুভূমি এবং দক্ষিনাংশে পাহাড় থাকায় নিরাপত্তাবাহিনীর জন্যও সিনাইয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিসি কি এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে?
গত শুক্রবার সিনাইয়ের মসজিদে যেভাবে জঙ্গিরা এ ভয়াবহ হামলা করেছে তাতে নতুন করে আবারো প্রশ্ন উঠেছে, সিনাইয়ের পরিস্থিতি কি প্রেসিডেন্ট সিসি মোকাবেলা করতে পারবে? পুরো মিশরের জন্যই এটি এখন এক বিরাট প্রশ্ন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবারের জুম্মার নামাজ যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন জঙ্গিরা মসজিদটির উপর বোমা বর্ষণ করে। এরপর পলায়নরত মুসল্লীদের উপর অনবরত গুলিবর্ষণ করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পাহাড়ি পথে চলতে সক্ষম এমন অন্তত ৪০টি গাড়ি ও ভারী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে জঙ্গিরা এ হামলা চালায়।

শুক্রবারের হামলার পেছনে যদি ইসলামি স্টেটের হাত থাকে, তাহলে এটি বৃহত্তর পরিসরে ভাবনার খোরাক রাখে। গত কয়েক মাসে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস তাদের অনেক ভূমি হারিয়েছে।

এই হামলার পেছনে যদি আইএস থাকে, তাহলে তারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের সমর্থকদের এ বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা এখনো শক্তিমান, লড়াইয়ের মাঠে আছে এবং শত্রুদের উপর এমন বড় পরিসরে হামলা চালাতে সক্ষম। এ হামলা আইএস সমর্থক ও যোদ্ধাদের চাঙা করে তুলবে।

কিন্তু সিনাইয়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রেসিডেন্ট সিসি ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন, সেটি এখনো জানা যায়নি। কয়েক বছর ধরে তিনি সিনাইয়ে সেনা অভিযানের দিকেই বেশি জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু এসব অভিযান যে ব্যর্থ তা বারবার প্রমাণ হয়েছে।

এখন এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সিনাইয়ের জন্য সিসি নতুন কোনো দাওয়াই আনবেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে শুক্রবারের হামলার পর জাতির উদ্যেশ্যে দেওয়া এক টিভি ভাষণে প্রেসিডেন্ট সিসি বলেছেন, ‘সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করা হবে।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।